বিপুলসংখ্যক বিদেশি প্রতিনিধি, উচ্চপর্যায়ের অতিথি এবং নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংককে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে থাই সরকার। সরকারি কর্মীদের নির্দিষ্ট কয়েক দিন বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সভাস্থল, প্রতিনিধিদের থাকার জন্য নির্ধারিত হোটেল এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক এ আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে পরিবহন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নিরাপত্তা তদারকি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নিচ্ছে থাইল্যান্ড। একই সঙ্গে প্রতিনিধিদের যাতায়াতের পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যানজট এড়াতে সরকারি কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজের নির্দেশ
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে ব্যাংককের সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশি প্রতিনিধি, তাঁদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মী এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে তাই কর্মদিবসেও সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ১২, ১৪ ও ১৫ অক্টোবর ব্যাংককের সরকারি দপ্তরের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে। ১৩ অক্টোবর আগে থেকেই সরকারি ছুটি রয়েছে। এ ছাড়া ১৬ অক্টোবর বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ওই দিন ব্যাংকও বন্ধ থাকবে।
যানজট নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগের আওতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলোকেও প্রয়োজন অনুযায়ী একই ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, অফিসগামী মানুষের যাতায়াত কমানো গেলে সভাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে চাপ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিনিধিদের চলাচল এবং নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নেও সুবিধা হবে।
২১ হোটেলে নিরাপত্তা, দায়িত্বে ৫০০ পর্যটন পুলিশ
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে থাই সরকার। ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে সভার মূল স্থান এবং প্রতিনিধিদের থাকার জন্য নির্ধারিত ২১টি হোটেলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
থাইল্যান্ডের পর্যটন পুলিশ ব্যুরোর প্রধান ফংসিয়াম মিখানথং জানিয়েছেন, সভাস্থল, প্রতিনিধিদের হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তায় প্রায় ৫০০ পর্যটন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন।
নিরাপত্তা কার্যক্রমে সাদা পোশাকে নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের গাড়িবহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
এ কাজে প্রায় ৩৯টি দেশের দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অংশ নেবেন সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক সভায় অংশ নিতে আসা বিদেশি নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গি পারমেলিন এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম।
২২ বছর পর সুইজারল্যান্ডের কোনো প্রেসিডেন্ট সরকারি সফরে থাইল্যান্ডে যাচ্ছেন। ফলে এবারের সভা দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সাধারণত বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের অংশগ্রহণের কারণে এ ধরনের সভা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এবারের সভায়ও বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি ও বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে ২২৫ কোটি বাথ
আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের কারণে থাইল্যান্ডের স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করছে দেশটির সরকার। থাইল্যান্ডের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সভায় অংশ নিতে আসা প্রতিনিধিদের ব্যয়ের ফলে দেশটির অর্থনীতিতে ১০৫ কোটি থেকে ২২৫ কোটি বাথ যুক্ত হতে পারে।
প্রতিনিধিদের হোটেলে থাকা, খাবার, পরিবহন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবায় ব্যয়ের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসা ও সেবা খাতে অর্থ প্রবাহ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক এ আয়োজনের ফলে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতও উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি যানজট, নিরাপত্তা এবং নগর ব্যবস্থাপনার চাপ সামাল দেওয়াও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে প্রতিনিধিদের যাতায়াতে ৩২০টির বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে থাই সরকার। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সম্মেলনের পরিবেশগত প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাসে বাড়তি উদ্বেগ
সম্মেলনের প্রস্তুতির মধ্যেই ব্যাংকক ও আশপাশের প্রদেশগুলোতে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১০ ও ১১ অক্টোবর বৃষ্টির কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে ব্যাংকক মহানগর প্রশাসন।
এর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে টানা তিন দিনে ৩২০ মিলিমিটার বা ১২ দশমিক ৬ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতের পর ব্যাংককের কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। সে সময় শহরের কিছু অংশকে দুর্যোগকবলিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।
এবারও ভারি বৃষ্টি হলে সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রতিনিধিদের বিমানবন্দর থেকে হোটেল কিংবা সভাস্থলে যাতায়াতেও সমস্যা হতে পারে।
এ কারণে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার পাশাপাশি আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি মোকাবিলাও কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে ঘিরে ব্যাংককে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে থাইল্যান্ড। একদিকে ১৯১টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে, অন্যদিকে যানজট, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য বন্যার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে আয়োজকদের। সম্মেলনটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানোই এখন থাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array