মাত্র ৩৪ বছরেই চলে গেলেন ‘ব্রেকিং ব্যাড’ তারকা আরজে মিতে
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় মার্কিন টেলিভিশন সিরিজ ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পাওয়া অভিনেতা ওয়াল্টার জুনিয়রওয়াল্টার জুনিয়র আর নেই। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মারা গেছেন এই মার্কিন অভিনেতা, সমাজসেবক ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন প্রতিনিধিরা। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে অভিনেতার প্রতিনিধিরা তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। শন রেইলির দেওয়া এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে জানানো হয়, প্রিয় অভিনেতা, সমাজসেবক ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী আরজে মিতের মৃত্যুতে তাঁরা শোকাহত।
তাঁর অকালমৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিনোদনজগতে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে যাঁরা তাঁকে চিনেছিলেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন স্মরণীয় এক মুখ। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করেও আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ ওয়াল্টার জুনিয়র চরিত্রে পরিচিতি
২০০৮ সালে প্রচার শুরু হওয়া ‘ব্রেকিং ব্যাড’ সিরিজের মাধ্যমে দর্শকদের নজরে আসেন আরজে মিতে। সিরিজটিতে তিনি ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রে অভিনয় করেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ওয়াল্টার হোয়াইটের ছেলের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিতি পায়।
সিরিজটিতে রসায়নের শিক্ষক ওয়াল্টার হোয়াইটের অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ে মাদকসম্রাট হয়ে ওঠার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন ব্রায়ান ক্র্যানস্টন। তবে পারিবারিক সম্পর্ক, সংকট ও আবেগের বিভিন্ন মুহূর্তে ওয়াল্টার জুনিয়র চরিত্রটির উপস্থিতিও সিরিজের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আরজে মিতে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রটিকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। সিরিজটির জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অভিনয়ও আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই একটি চরিত্রই তাঁকে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
সেরিব্রাল পালসি নিয়েও গড়েছিলেন অভিনয়ের স্বতন্ত্র পরিচয়
আরজে মিতে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ছিলেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর অভিনয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সেরিব্রাল পালসি এমন একটি স্নায়বিক অবস্থা, যা ব্যক্তির চলাফেরা, পেশির নিয়ন্ত্রণ ও শরীরের সমন্বয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এই অভিজ্ঞতা নিয়েই বিনোদনজগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন মিতে।
তবে অভিনয়জীবনের সাফল্যের বাইরেও তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা। সমাজে প্রতিবন্ধিতাকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির পক্ষে কাজ করেছেন তিনি।
সমাজসেবা ও প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে সক্রিয় ছিলেন
অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন আরজে মিতে। শন রেইলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইউনাইটেড সেরিব্রাল পালসি এবং শ্রাইনার্স চিলড্রেনসের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া মিতে ফাউন্ডেশনের সভাপতি হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই অভিনেতা।
নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। অভিনয়জগতের পরিচিতি তাঁকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছিল, আর সেই পরিচিতিকে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
ফলে আরজে মিতের পরিচয় কেবল একজন টেলিভিশন অভিনেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিনোদনজগতে কাজ করার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক উদ্যোগে তাঁর সম্পৃক্ততাও তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।
টেলিভিশন ইতিহাসে আলোচিত সিরিজ ‘ব্রেকিং ব্যাড’
২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচটি মৌসুমে প্রচারিত হয় ‘ব্রেকিং ব্যাড’। অপরাধ, পারিবারিক টানাপোড়েন, নৈতিক সংকট ও মানুষের পরিবর্তনের জটিল গল্পের কারণে সিরিজটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
সিরিজটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ওয়াল্টার হোয়াইটের জীবনের নাটকীয় পরিবর্তন এবং তাঁর পরিবারের ওপর সেই পরিবর্তনের প্রভাব কাহিনিটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়। ব্রায়ান ক্র্যানস্টনের অভিনয়ের পাশাপাশি অন্যান্য অভিনয়শিল্পীর কাজও সিরিজটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস একবিংশ শতাব্দীর সেরা টেলিভিশন সিরিজের তালিকায় ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর নাম উল্লেখ করেছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সিরিজটি টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও প্রশংসিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
অকালমৃত্যুতে শোক, অজানা রয়ে গেল কারণ
মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আরজে মিতের মৃত্যু তাঁর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য বেদনাদায়ক সংবাদ। যে অভিনেতা পর্দায় একটি পরিচিত চরিত্রের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তাঁর অকালপ্রয়াণে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর অভিনয়জীবন ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড।
তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই এ বিষয়ে অনুমাননির্ভর কোনো তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
অভিনয় ও প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজের মধ্য দিয়ে আরজে মিতে যে পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর সেই কাজই তাঁকে দর্শকদের স্মৃতিতে ধরে রাখবে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array