ট্রাম্পকে চাপে রাখতে হরমুজে নতুন কৌশল ইরানের
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার করছে তেহরান
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে উৎপাদিত মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরানের হুমকি ও হামলার কারণে বর্তমানে এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। কিছু জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল অব্যাহত রাখলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, বিমার উচ্চ ব্যয় এবং হামলার আশঙ্কা স্বাভাবিক নৌপরিবহনকে জটিল করে তুলেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ দিন আগে থেকে ইরান বিধিনিষেধ অমান্যকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে নতুন ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে। এর ফলে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের দুই কর্মকর্তা।
তবে নতুন কৌশলের সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করতে রাজি হননি তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার ধরন ও গতি—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই তৎপরতার অন্যতম লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলা।
তেলের দাম কমানোর মার্কিন প্রচেষ্টা বানচাল করতে চায় ইরান
ইরানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোর প্রচেষ্টা নস্যাৎ করাই তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তেলের দাম কমানোর সুযোগ দিতে চায় না তেহরান।
ওই কর্মকর্তা পরিস্থিতিকে দাবার চালের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখনই তেলের দাম কমার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে করবে, তখনই ইরান এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে সেই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়।
ইরানের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি জ্বালানির বাজারকেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে তেহরান। তেলের দাম বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ের জ্বালানি খরচ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ বাড়তে পারে। এতে মার্কিন প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফলে ইরানের কৌশল কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। জ্বালানির দাম ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যু নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নজরদারিতে ছোট নৌকা, ব্যবহার হচ্ছে ‘স্পটার’
ইরানের নতুন কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছোট নৌযান ব্যবহার করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করে দেওয়ার পর ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ছোট নৌকায় ‘স্পটার’ ব্যবহার শুরু করেছে।
স্পটার বলতে এমন ব্যক্তি বা দলকে বোঝানো হচ্ছে, যারা সরাসরি হামলা না চালিয়ে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে অন্য বাহিনীকে তথ্য দেয়। মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ছোট নৌকায় অস্ত্র থাকে না। সেগুলো থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজসহ অন্যান্য সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গত সপ্তাহে এমন একটি ঘটনার কথা জানতে পারে মার্কিন সামরিক বাহিনী। কর্মকর্তার দাবি, ইরানের কয়েকজন স্পটার একটি ঐতিহ্যবাহী ‘ধাও’ নৌযানে অবস্থান করে আইআরজিসিকে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছিলেন। পরে মার্কিন বাহিনী ওই নৌযানটির মুখোমুখি হয় এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের চলে যেতে বলে। এরপর নৌযানটি ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি বলে জানান ওই মার্কিন কর্মকর্তা।
ধাও হলো আরব সাগর, পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌযান। মাছ ধরা, পণ্য পরিবহন ও উপকূলীয় চলাচলে এসব নৌযান ব্যবহার করা হয়।
হরমুজের বাইরেও হামলার পরিধি বাড়ানোর আশঙ্কা
ইরানের নতুন কৌশল শুধু হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ না থাকার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান ওমান উপসাগরসহ আরও দূরের জলসীমায় তৎপরতা বাড়াতে পারে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন সূত্র, যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালির বাইরের এলাকাতেও বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলসংলগ্ন জলসীমাও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালির আশপাশে তেলবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচটি হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে ড্রোন হামলাও রয়েছে।
জাতিসংঘের নৌপরিবহন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, হামলার এই হার ৩ থেকে ৫ অক্টোবরের সময়কার পরিস্থিতির কাছাকাছি। একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের মতে, হামলার গতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ইচ্ছাকৃত তৎপরতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে এসব হামলার সব কটির জন্য ইরানের দায় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনের সব তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়। ফলে হামলার সংখ্যা ও দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সূত্রগুলোর তথ্যের পাশাপাশি স্বাধীন যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ।
নভেম্বরের নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে ভাবছেন। তবে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে আর হামলা চালাবেন না।
অন্যদিকে সংঘাতের অবসানে সমঝোতায় পৌঁছাতে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। এ লক্ষ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধ জোরদার এবং নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পাল্টাপাল্টি চাপের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে ইরানের হামলার আশঙ্কা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা—দুইয়ের প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক বাণিজ্যে।
পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি
ইরানের দুই কর্মকর্তাই বলেছেন, তেহরান এমন পরিস্থিতি তৈরির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে তাদের আরোপিত বিধিনিষেধ অমান্য করে কোনো জাহাজই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না। তাঁদের একজনের ভাষ্য, প্রণালিটি শিগগিরই পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার গত রোববারের প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিকে ‘তীব্র’ পর্যায়ে রেখেছে। এটি ঝুঁকির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, আইআরজিসির হামলা, হামলার চেষ্টা ও হয়রানিমূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বা সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও বিমা ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপরও।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত এখন শুধু সামরিক মোকাবিলার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। তেহরান যদি জাহাজে হামলা ও নৌপথে বিধিনিষেধ আরও বাড়ায়, আর ওয়াশিংটন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে, তাহলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array