সিজেপির দুই নেতাকে ৫ দিনের জেল হেফাজত
ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিজেপি নেতাদের আটক ও জেল হেফাজতে পাঠানোর ঘটনায় সরব হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। শান্তিপূর্ণভাবে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর কারণে তরুণদের কারাগারে পাঠানোকে তিনি কাপুরুষতা বলে মন্তব্য করেছেন।
যেভাবে যন্তর মন্তরে ঢোকেন সিজেপি নেতারা
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও অজিঙ্ক শিন্ডে পুলিশের নজর এড়িয়ে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করেন। ওই এলাকায় প্রবেশের সড়কগুলোতে ব্যারিকেড ও পুলিশি পাহারা ছিল। এর মধ্যেই লোহার ফটক টপকে সিজেপি নেতারা তাঁদের ১০ থেকে ১২ জন সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
যন্তর মন্তরে প্রবেশের পর তাঁরা জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারবিরোধী স্লোগানও দেওয়া হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ পরে তাঁদের আটক করে। দিনভর আটক রাখার পর গভীর রাতে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সিজেপির অভিযোগ, আটক অবস্থায় দীর্ঘ সময় নেতাদের সঙ্গে আইনজীবীদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের মুঠোফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের যুক্তি, শর্ত ভেঙেছেন নেতারা
সিজেপির আইনজীবী অভীষ্ট হেলা গণমাধ্যমকে জানান, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দিল্লি পুলিশ অভিযোগ করেছে, নেতারা ফোন করে যন্তর মন্তরে লোকজন জড়ো করেন এবং অনুমোদিত বিক্ষোভস্থল নয়—এমন একটি এলাকায় বেআইনিভাবে প্রবেশ করেন। তাঁদের মুক্তি দেওয়া হলে ভবিষ্যতে আবারও অশান্তির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও পুলিশ যুক্তি দেয়।
পুলিশের দাবি, এর আগেও ওই নেতাদের আটক করা হয়েছিল। সে সময় শান্তি ভঙ্গ না করার মুচলেকা দিয়ে তাঁরা মুক্তি পান। কিন্তু যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে বিক্ষোভ দেখানোর মাধ্যমে তাঁরা আগের শর্ত ভঙ্গ করেছেন।
এসব যুক্তির ভিত্তিতে আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে পাঁচ দিনের জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অজিঙ্ক শিন্ডেকে শান্তি ভঙ্গ না করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
‘ভিন্নমত দমন করতে চাইলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করুন’
দুই নেতাকে জেল হেফাজতে পাঠানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁর বক্তব্য, নেতারা যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর কারণে কারাবন্দী হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ওদের কী অপরাধ? ওরা তো যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা উড়িয়েছে?’ এরপর ভিন্নমত দমনের সমালোচনা করে তিনি জরুরি অবস্থা প্রকাশ্যে ঘোষণা করার চ্যালেঞ্জ জানান এবং সরকারের বিরুদ্ধে কাপুরুষোচিত কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
রাহুল গান্ধীর প্রতিক্রিয়া
সিজেপি নেতাদের জেল হেফাজতে পাঠানোর ঘটনায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, শান্তিপূর্ণভাবে যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। এ কারণে তরুণদের কারাগারে পাঠানোকে তিনি কাপুরুষতার লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাহুল গান্ধী আরও বলেন, ছাত্র, যুবক, সাংবাদিক কিংবা ইন্ডিয়া জোট—আন্দোলনের ব্যানার আলাদা হলেও উদ্দেশ্য অভিন্ন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নাগরিকেরা নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার দাবি করছেন। যন্তর মন্তর দেশের জনগণের জায়গা উল্লেখ করে তিনি সেটি আবারও জনগণের জন্য ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সিজেপি ও ইন্ডিয়া জোটের আন্দোলন কি এক পথে?
সিজেপি ও বিরোধী জোট ইন্ডিয়া একই ধরনের দাবিতে আন্দোলন করলেও পৃথক কর্মসূচি পালন করায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। দুই পক্ষের মধ্যে কোনো বিরোধ রয়েছে কি না, কিংবা তারা কেন একসঙ্গে আন্দোলন করছে না—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল।
গত মঙ্গলবার রাহুল গান্ধী তাঁর বাসভবনে আয়োজিত চা-চক্রের আমন্ত্রণপত্র এবং পরে গণমাধ্যমের সামনে এ নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেন। বুধবারের এক্স পোস্টেও তিনি জানান, ব্যানার আলাদা হলেও আন্দোলনের উদ্দেশ্য এক।
সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। নাগপুরে দুই পক্ষের বিরোধ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিজেপি একটি স্বাধীন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বা ‘প্রেশার গ্রুপ’। দলটি নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা ইন্ডিয়া জোটের বিরোধী।
অভিজিতের অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন চুরির মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁরা আন্দোলন করছেন বলে জানান তিনি। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ; এর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল হবে সিজেপি?
সিজেপি ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। জবাবে অভিজিৎ দিপক জানান, আপাতত এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিজেপি স্বাধীন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবেই কাজ করতে চায়।
যন্তর মন্তরে প্রবেশের ঘটনায় দুই নেতার জেল হেফাজত, রাহুল গান্ধীর প্রতিবাদ এবং সিজেপি-ইন্ডিয়া জোটের আন্দোলন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য—সব মিলিয়ে ভারতের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array