বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নদী ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর প্রভাব পড়ছে বনের জলজ প্রাণীর ওপরও। গবেষণায় শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের পশুর নদের তিন প্রজাতির মাছ—পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটায় ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এসব মাছের শরীরে সিসা, নিকেল, তামা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতু পাওয়া গেছে। প্লাস্টিক দূষণ ও মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, নদী ও পলিমাটিতে জমে থাকা দূষিত উপাদান জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব উপাদান অন্য প্রাণী এবং মানুষের শরীরেও পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশন গবেষণা পরিচালনা করেছে। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণাটির খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গবেষক দল ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের তিনটি নদীর পানি ও মাটির নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদী, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া নদী এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদী।
পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৫৭০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। ভোলা নদীর পানিতে প্রতি ঘনমিটারে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি কণা শনাক্ত করেন গবেষকেরা। নদীর পলিমাটিতেও পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সুন্দরবনের পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জলজ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। এসব কণা দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যচক্রকে প্রভাবিত করতে পারে।
শিলা কাঁকড়ার ফুলকা ও অন্ত্রে প্লাস্টিক
খোলপেটুয়া নদী থেকে সংগ্রহ করা শিলা কাঁকড়ার নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকেরা এর ফুলকায় গড়ে ১৮টি এবং অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন। কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো প্লাস্টিকের উপাদানও শনাক্ত করা হয়েছে। এসব উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করতে পারে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব কণা বড় প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারাও বিভিন্ন জটিলতার শিকার হতে পারে। তিনি আরও বলেন, নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অণুজীব ও তলদেশে বসবাসকারী প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র নষ্ট করতে পারে। এ কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে শুধু পানির সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এর প্রভাব পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে।
পশুর নদের মাছে সিসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম
সুন্দরবনের নদীগুলোতে প্লাস্টিক দূষণের পাশাপাশি ভারী ধাতুর উপস্থিতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পশুর নদের মাছ নিয়ে গবেষণাটি করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গবেষণার নিবন্ধ গত বছরের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট-এ প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা পশুর নদের ছয়টি স্থান থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা সংগ্রহের স্থানগুলোর মধ্যে ছিল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
পরীক্ষায় মাছের শরীরে গড়ে প্রতি কেজিতে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ০৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাছের অন্ত্রে এসব ধাতুর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল; এরপর ছিল ফুলকায়। গবেষণায় উদ্ধৃত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহনশীল মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ধাতুর গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণে মাছের প্রজাতি, নমুনার ধরন ও পরিমাপের একক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব ফলাফলের ব্যাখ্যায় গবেষণায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ড বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিল্পবর্জ্যকে দূষণের অন্যতম উৎস বলছেন গবেষকেরা
গবেষণা দলের প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটিকে দূষিত করছে। একপর্যায়ে এসব দূষিত উপাদান মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় নদীর তীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাও জরুরি।
অন্যদিকে ‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে পৌঁছায়। তাঁর মতে, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
উজান থেকে প্লাস্টিক আসা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
অতীতের বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান-পরবর্তী ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমেও বনের ভেতরে ৫৬ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, উজান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আসা বন্ধ করতে যৌথ নদী কমিশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এর চারপাশের ১০ কিলোমিটার পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণে প্লাস্টিকের মোড়ক নিয়ন্ত্রণ, মোংলা বন্দর ও পরিবেশগত সংকটপূর্ণ এলাকার কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেলবর্জ্য ফেলা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সুন্দরবনে প্লাস্টিক প্রবেশ বন্ধে উদ্যোগের কথা বন বিভাগের
সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বন বিভাগের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই বনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের চারপাশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]