ইরানে যুদ্ধ নাকি কূটনীতি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার হাতে?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে ইরানের সরকারপন্থী মধ্যপন্থী ও উদারপন্থী শিবির। তবে দেশটির কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো কোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসা উচিত নয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ নিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠরা সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছেন, অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে। ফলে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলায় ইরানসহ আরব দেশগুলোর অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
রাজপথে কট্টরপন্থীদের ‘আপস নয়, লড়াই চাই’ স্লোগান
ইরানের বড় শহরগুলোতে প্রায় ২০০ দিন ধরে রাতের বেলায় সমাবেশ করছেন কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থকেরা। শুরুতে এসব সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ এবং সরকারের প্রতি সমর্থন জানানো হলেও সময়ের সঙ্গে তা সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নিয়েছে। এখন এসব সমাবেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগের বিরোধিতা করা হচ্ছে।
কট্টরপন্থীদের স্লোগানের মধ্যে রয়েছে, ‘আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়—আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই চাই’ এবং ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’।
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তেহরানে ফেরার সময়ও বিক্ষোভ করেন তাঁদের সমর্থকেরা। ওই অধিবেশনে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছে আলোচনাবিরোধী অবস্থান জানানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই ওই বিক্ষোভকে দেখা হয়।
রাজপথের কর্মসূচির বাইরেও ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় কট্টরপন্থীদের প্রভাব রয়েছে। তেহরানের নগর প্রশাসন ও পার্লামেন্টে তাঁদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। ধর্মীয় বক্তা, শোকগাথা পাঠকারী, শিক্ষাঙ্গন ও গণমাধ্যমেও তাঁদের প্রভাব বিস্তৃত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিশংসনের উদ্যোগ
কট্টরপন্থী পায়দারি ফ্রন্টের ঘনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য আমির হোসেন সাবেতি বলেছেন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা উচিত নয়।
সাবেতির ভাষ্য, ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসেনি। বরং দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানোর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন। তাঁর মতে, যারা আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ ঠেকানো বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশা করেছিলেন, তাঁরা আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বুঝতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব শুধু একটি ভাষাই বোঝে। তা হলো শক্তির ভাষা।’
এ অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইরানের পার্লামেন্টেও। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে অভিশংসনের প্রস্তাব জমা দিয়েছেন কট্টরপন্থী সদস্যরা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আরাগচির নিউইয়র্ক সফরের পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিদেশি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটি প্রস্তাবও পার্লামেন্টে বিবেচনাধীন রয়েছে। এমন আইন কার্যকর হলে তা কট্টরপন্থীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে অভিশংসনের উদ্যোগের মধ্যেও সরকারপন্থী রাজনৈতিক শিবির যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে।
আলোচনার পথ এখনো খোলা দেখছেন পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠরা
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক দাভুদ হেশমতির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তাঁর ধারণা, ইরানের সরকার উৎখাতের বড় লক্ষ্য থেকে সরে এসে ওয়াশিংটন তুলনামূলক সীমিত কিছু লক্ষ্য অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। এতে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হেশমতি বলেন, কট্টরপন্থীরা মনে করেন, কয়েক দফা সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র নিজে থেকেই যুদ্ধ থেকে সরে যাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাঁদের সেই ধারণাকে সমর্থন করে না।
তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা যুদ্ধের অবসান নিয়ে যাঁরা আপত্তি তুলছেন, তাঁদের অবস্থান কার্যত সংঘাত দীর্ঘায়িত করার পক্ষে। অথচ যুদ্ধ থেকে কী অর্জন করা সম্ভব, সে বিষয়ে তাঁদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
হেশমতি আরও বলেন, ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোই হতে পারে সংঘাত অবসানের পথ। সামরিক শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; কূটনৈতিক আলোচনা ও চুক্তিও বিকল্প হতে পারে।
তবে অতীতের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া অবিশ্বাসের বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেছেন।
কট্টরপন্থীরা প্রভাবশালী, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁদের হাতে নয়
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরানের কট্টরপন্থীরা কোনো প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তি নন। তাঁরা সুসংগঠিত এবং দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর গভীরে তাঁদের অবস্থান। সমর্থকদের সংগঠিত করা, রাজনৈতিক বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণ এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে তাঁদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেই যুদ্ধ ও শান্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাওয়া যায় না বলে মনে করেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পর্যায়ে।
মোর্তাজাভির ভাষ্য, কট্টরপন্থীরা আলোচনার উদ্যোগকে জটিল করে তুলতে পারেন। আলোচনাপন্থী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অভিশংসনের হুমকি দিতে পারেন এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সমর্থন দিলে তাঁদের পক্ষে কোনো চুক্তি পুরোপুরি ঠেকিয়ে দেওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, যুদ্ধের পুরো সময়েই তেহরান কূটনীতির দরজা খোলা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই এসেছে। কট্টরপন্থীরা এখন পর্যন্ত সেই উদ্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেননি।
মোর্তাজাভির মতে, অতীতেও পারমাণবিক চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়ে কট্টরপন্থীদের বিরোধিতা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাঁদের ঊর্ধ্বতন ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে।
সংঘাতের অবসানে কোন পথে যাবে তেহরান
ইরানে কট্টরপন্থীদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দাবি এবং মধ্যপন্থীদের কূটনৈতিক উদ্যোগ—দুই ধারার রাজনৈতিক তৎপরতাই অব্যাহত রয়েছে। রাজপথের সমাবেশ ও টেলিভিশন আলোচনায় যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান জোরালো হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতিতে বিলম্ব এবং মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকার বিষয়টি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কট্টরপন্থীরা আলোচনার পথে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অবস্থানের ওপর। ফলে দেশটির সরকার শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত করবে, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতার পথে এগোবে—তা নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]