বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং পরিচালকদের মেয়াদ সীমিত করার প্রস্তাবে অনড় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক মালিকদের আপত্তি সত্ত্বেও একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা কমানো, পরিচালকদের টানা দায়িত্ব পালনের সময়সীমা হ্রাস এবং পুনর্নিয়োগের আগে বাধ্যতামূলক বিরতি রাখার প্রস্তাব বহাল রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এসব পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের গঠন, স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা এবং ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা নিয়েও নতুন বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সংশোধনীগুলোর লক্ষ্য ব্যাংকের পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়ানো এবং ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো।
এক পরিবারের সদস্য তিনজন থেকে কমে দুজন করার প্রস্তাব
গত সপ্তাহে অর্থ বিভাগে পাঠানো ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া সংশোধনীতে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা সর্বোচ্চ তিনজন থেকে কমিয়ে দুজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে একটি পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে পর্ষদে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সীমিত হতে পারে। এ ছাড়া পরিচালকদের টানা দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ছয় বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর পুনর্নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালককে তিন বছর বিরতি দিতে হবে।
সংস্কার প্রস্তাবে আগের অবস্থানেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য নেওয়া প্রস্তাবেও পরিচালকদের মেয়াদ কমানো এবং একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা সীমিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ব্যাংকও নতুন খসড়ায় সেই অবস্থান ধরে রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অবস্থানের ফলে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত রয়েছে। মালিকপক্ষ পর্ষদে পরিবারের সদস্যসংখ্যা সর্বোচ্চ তিনজন রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছরের পরিবর্তে নয় বছর করার দাবি জানিয়েছে তারা।
পর্ষদে সর্বোচ্চ ২০ সদস্য, স্বতন্ত্র পরিচালক পাঁচজন করার প্রস্তাব
ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী খসড়ায় পরিচালনা পর্ষদের আকার ও স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা নিয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সর্বোচ্চ ২০ জন সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা দুইজন থেকে বাড়িয়ে পাঁচজন করার প্রস্তাব রয়েছে। এর আগে প্রস্তাবিত সংস্কারে পর্ষদের সদস্যসংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫ জনে সীমিত রাখার পাশাপাশি অন্তত অর্ধেক আসন স্বতন্ত্র পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছিল।
নতুন খসড়ায় পর্ষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হলেও স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন মতামত, তদারকি এবং জবাবদিহি জোরদার করার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এমপি-মন্ত্রীর ব্যাংক পরিচালক হওয়ার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব
ব্যাংকের ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর লক্ষ্যেও নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক পদধারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ সীমিত হবে। এর মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন ও ব্যাংকের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্কার উদ্যোগের লক্ষ্য। এ ছাড়া কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ১০ শতাংশ সীমা শিথিল করার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। এতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের সীমা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকবে।
মন্ত্রিসভায় তোলার আগে আন্তমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের আগে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া সংশোধনী পর্যালোচনা করা হবে। আসন্ন সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন ও পাস করাই সরকারের লক্ষ্য। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। আইন সংশোধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সংসদে অনুমোদনের পরই নতুন বিধানগুলোর বাস্তবায়ন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সংস্কার নিয়ে ব্যাংক মালিকদের আপত্তি
ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি প্রস্তাবিত সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির দাবি, একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন সদস্য থাকতে পারবেন এবং পরিচালকদের মেয়াদ হবে নয় বছর। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবারের সদস্যসংখ্যা কমানো এবং পরিচালকদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ছয় বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাবে অনড় রয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের পরিচালনা কাঠামো সংস্কার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক মালিকদের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী চূড়ান্ত হলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গঠন, পরিচালকদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাবের বিষয়ে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]