আইএমএফের পূর্বাভাসে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি
মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ২০২৬ সালে আবারও ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। সে হিসাবে এ সূচকে ভারতের চেয়ে ১৩৭ ডলার এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ।
এর আগে ২০২০ সালেও মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে আবারও এ সূচকে এগিয়ে যায় ভারত। আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে চলতি বছর বাংলাদেশ আবারও প্রতিবেশী দেশটির চেয়ে এগিয়ে থাকবে।
অর্থনীতির আকারে ভারতের সঙ্গে বড় ব্যবধান
জিডিপিতে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও অর্থনীতির মোট আকারের দিক থেকে ভারতের তুলনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের মোট জিডিপি ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের হিসাবে ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড় হতে পারে। মাথাপিছু জিডিপি ও মোট জিডিপি আলাদা সূচক হওয়ায় একটিতে এগিয়ে থাকা মানেই সামগ্রিক অর্থনীতির আকারেও এগিয়ে থাকা নয়।
ক্রয়ক্ষমতার সমতায় এগিয়ে ভারত
ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) হিসাবেও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হতে পারে। এ পদ্ধতিতে দুই দেশের স্থানীয় মূল্যস্তর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপির ভিত্তিতে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। অর্থাৎ পিপিপির হিসাবে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
উৎপাদন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি
গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন খাতের অবদানও বেড়েছে। ভারতের অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদন খাতের অবদান ২০১৪ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে মেহরোত্রা জানান, ভারতের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের মূল্য সংযোজনের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে কমে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। এ পরিসংখ্যান দুই দেশের উৎপাদন খাতের অবদানে ভিন্ন প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটে চাপে বাংলাদেশ
মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও জ্বালানি সংকট অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলছে। দেশের প্রয়োজনীয় তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করে
জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া কিংবা বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে রপ্তানি আয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে রপ্তানির বহুমুখীকরণ ও জ্বালানিনিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৭ ও ২০২৮ সালেও এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালেও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ২১৯ ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ৩ হাজার ৩৬ ডলার। ২০২৮ সালেও সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ। তবে ২০২৯ সালে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ওই বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলার এবং বাংলাদেশের ৩ হাজার ৩৩৪ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে ২০২৯ সালে এ সূচকে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে ভারত।
মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে সবার জীবনমান বোঝা যায় না
মাথাপিছু জিডিপি নির্ণয় করা হয় একটি দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। এটি দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের গড় চিত্র তুলে ধরে। তবে এ সূচকে এগিয়ে থাকা মানেই দেশের প্রত্যেক মানুষের আয় বেশি কিংবা সবার জীবনযাত্রার মান উন্নত—এমন নয়।
আয়বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় মানুষের প্রকৃত জীবনমানকে প্রভাবিত করে। তাই মাথাপিছু জিডিপির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন খাতের সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাসে মাথাপিছু জিডিপিতে অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা গেলেও সেই অগ্রগতিকে টেকসই করতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা জরুরি।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]