খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রধানমন্ত্রীও দিলেন ডিজিটাল হাজিরা, প্রশাসনে নতুন বার্তা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীও দিলেন ডিজিটাল হাজিরা, প্রশাসনে নতুন বার্তা

সরকারপ্রধান হয়েও দাফতরিক নিয়মের বাইরে থাকছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো তিনিও এখন দিচ্ছেন ডিজিটাল হাজিরা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে সচিবালয়ে নিজের দফতরে প্রবেশের আগে নির্ধারিত ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপস্থিতি নিবন্ধন করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অফিসে প্রবেশের পাশাপাশি কর্মদিবস শেষে কার্যালয় ছাড়ার সময়ও নির্ধারিত নিয়মে হাজিরা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন ব্যক্তি নিজেই ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ায় বিষয়টিকে দাফতরিক শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, সরকারপ্রধান যখন নিজেই নির্ধারিত উপস্থিতি ব্যবস্থার আওতায় থাকেন, তখন অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশাটিও আরও স্পষ্ট হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ডিজিটাল হাজিরা শুধু কর্মস্থলে উপস্থিতির হিসাব রাখার ব্যবস্থা নয়; এটি প্রশাসনে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার একটি অংশ। প্রধানমন্ত্রীর নিজের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।

দাফতরিক নথিতেও কমছে আনুষ্ঠানিকতা
ডিজিটাল হাজিরার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে সরকারি নথিপত্রের ভাষাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ বা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপিত ফাইল ও অন্যান্য সরকারি নথিতে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র পরিবর্তে শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী’ ব্যবহারের নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে নিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ডিজিটাল হাজিরা তার অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি কাজে তার ছবি ব্যবহার না করা, প্রটোকলে গাড়ির সংখ্যা কমানো এবং চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের ট্রাফিক ব্যবস্থায় অযথা বাধা না দেওয়ার মতো কয়েকটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

অনেকেই মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর নিজের ডিজিটাল হাজিরা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নতুন বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।

কালের আলো/এম/এএইচ

শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক

পোশাক খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
পোশাক খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য জাপানের বিশ্বখ্যাত পোশাক প্রস্তুতকারক ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং টেকসই পোশাক উৎপাদন খাতে আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতি ইউনিক্লোর আস্থা এবং ফাস্ট রিটেইলিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রচলিত বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ম্যান-মেড ফাইবার ও টেকসই পোশাকে বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজিত ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তু, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং টেকসই পোশাক উৎপাদন খাতে ইউনিক্লোর বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তৈরি পোশাক খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাত আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈঠকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যে উদ্ভাবন, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় দুই পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিনিয়োগে সহযোগিতার আশ্বাস সরকারের
বাংলাদেশে ইউনিক্লোর কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমির ব্যবস্থা, বিনিয়োগ অনুমোদন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করা শিল্প খাতের সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। ইউনিক্লোর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়লে তৈরি পোশাকশিল্পে প্রযুক্তি, উৎপাদনব্যবস্থা ও পণ্যের মান উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বৈঠকে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ে আহ্বান ও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও নতুন বিনিয়োগের নির্দিষ্ট পরিমাণ, প্রকল্পের সময়সীমা কিংবা বাস্তবায়ন পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে গুরুত্ব
বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নে দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পথও সুগম হতে পারে।

বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবীর, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জাপানের প্রতিনিধিদলে ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক তাকেশি ওকাজাকি এবং প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার ইয়োশিহিরো কুনিই অংশ নেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও সিইও তাদাশি ইয়ানাই। বাংলাদেশে ইউনিক্লোর বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান এবং সরকারের সহযোগিতার আশ্বাসের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

১৮৪ কোটির প্রশ্ন: বাঁচবে কি তুরাগ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
১৮৪ কোটির প্রশ্ন: বাঁচবে কি তুরাগ?

নদ কালো, পানি দুর্গন্ধময়; শিল্পবর্জ্যে বিপর্যস্ত তুরাগের প্রাণপ্রকৃতি। দূষণ ঠেকাতে এবার প্রায় ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। ১৭৩টি কারখানার বর্জ্য শোধনাগার তদারকি, নদীর পানির মান তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, ড্রোনে নজরদারি এবং অন্তত ১০০টি অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে এতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত আয়োজনের পরও কি থামবে নদে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা? নাকি আগের অনেক প্রকল্পের মতো বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও অধরাই থেকে যাবে দৃশ্যমান সুফল?

  • ১৭৩ কারখানার ইটিপি পরীক্ষা, ড্রোনে নজরদারি ও ১০০ অভিযানের পরিকল্পনা
  • তুরাগের দূষণ ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ, বাস্তবায়নেই নির্ধারিত হবে তুরাগের ভবিষ্যৎ

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম: তুরাগ নদের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সমন্বিত দূষণ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রকল্পটি একনেকের আসন্ন সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পঋণ থেকে ১৭৩ কোটি ৬০ লাখ এবং সরকারি তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইটিপি আছে, তবু নদে বিষ!
গাজীপুর, টঙ্গী ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বহু ডাইং ও ওয়াশিং কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। খরচ বাঁচাতে কিছু কারখানা রাতে কিংবা গোপনে শোধনাগার বন্ধ রেখে অপরিশোধিত বর্জ্য নদে ফেলছে বলে অভিযোগ। ফলে তুরাগের পানি কালচে হয়ে পড়ছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ পরিবেশ।

এই বাস্তবতায় নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু দূষণ শনাক্ত করা নয়, দূষণকারীদের চিহ্নিত করে আইন প্রয়োগের আওতায় আনা। নদীর দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোর মানচিত্র তৈরি, ১৭৩টি কারখানার ইটিপির কার্যকারিতা যাচাই এবং পানির মান অনলাইনে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। নদপাড়ে বর্জ্য ফেলার ঘটনা শনাক্তে ব্যবহার করা হবে ড্রোন; নৌযানে টহল এবং নদীর তলদেশ পরিষ্কারের উদ্যোগও রয়েছে।

পরিকল্পনায় আরও আছে, অন্তত ১০০টি অভিযান, নিয়মিত পরিদর্শন, নোটিশ প্রদান এবং আইন ভঙ্গকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা। প্রকল্পের মেয়াদে অন্তত ৩৬ দফা পানির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কথাও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের ওপর—দূষণ ধরা পড়ার পর দায়ী কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হবে?

প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন বাপার
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির নতুন প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশে এর আগেও পরিবেশ রক্ষায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে; কিন্তু সেসব উদ্যোগের সুফল জনগণ ও প্রকৃতি কতটা পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পরিবেশদূষণের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ট্যানারি এলাকার আশপাশে ধলেশ্বরী নদীর দূষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির মান নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

আলমগীর কবিরের প্রশ্ন, তুরাগের ১৭৩টি কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হলেও দূষণকারী মালিকদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে কি না, ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে কি না এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের দৃশ্যমান ফল জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে কি না। তাঁর মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় নয়, দূষণের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।

নজরদারির পর কী হবে?
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে। ড্রোনে বর্জ্য ফেলার দৃশ্য ধরা পড়ল, অনলাইন পর্যবেক্ষণে পানির মান খারাপ পাওয়া গেল কিংবা কোনো কারখানার ইটিপি বন্ধ শনাক্ত হলো—এরপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটিই নির্ধারণ করবে উদ্যোগটির বাস্তব কার্যকারিতা।

কোন কারখানায় কতবার অনিয়ম ধরা পড়েছে, কতটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, কত টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো গেছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাবের পাশাপাশি নদীর পানির মানে পরিবর্তনের তথ্যও জনসমক্ষে আনতে হবে।

কারণ ইটিপি স্থাপন আর সেটি নিয়মিত চালানো এক বিষয় নয়; অভিযান পরিচালনা আর দূষণ বন্ধ করা আরেক বিষয়। নজরদারি ও শাস্তির মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি না হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

সাফল্যের হিসাব দেবে তুরাগের পানি
তুরাগ একসময় কৃষি, মাছ ধরা ও গৃহস্থালির কাজে গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির উৎস ছিল। দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে নদটির পরিবেশগত ভারসাম্য আজ হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তিতে। ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার এই উদ্যোগে কতটি যন্ত্র বসানো হলো, কতটি অভিযান চালানো হলো কিংবা কত টাকা খরচ হলো—এসবের বাইরেও দেখতে হবে, নদে দূষণ কতটা কমল, পানির গুণগত মান কতটা ফিরল এবং জলজ পরিবেশের উন্নতি হলো কি না।

তুরাগের ভবিষ্যৎ তাই শুধু একটি প্রকল্পের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ, সরকারি দপ্তরের স্বচ্ছতা এবং ব্যয়ের বিপরীতে পরিমাপযোগ্য ফল নিশ্চিত করার ওপর। শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হবে একটাই—তুরাগের পানিতে দূষণ কমছে কি না।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

আগাম আলুতে ভাগ্য ফেরানোর অপেক্ষায় রংপুরের কৃষক

রংপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
আগাম আলুতে ভাগ্য ফেরানোর অপেক্ষায় রংপুরের কৃষক

আগের দুই মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় রংপুর অঞ্চলে আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারদরের অনিশ্চয়তা থাকলেও আগাম আলু বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় নতুন মৌসুমের পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। অন্যদিকে বীজ আলুর বিক্রি বাড়াতে ডিলারদের জন্য প্রতি কেজিতে এক টাকা ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সরবরাহ এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের প্রত্যাশা, এবার ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে আগের মৌসুমের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে বীজের দাম কিছুটা কমলেও সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না তাঁদের।

বীজ আলু বিক্রিতে বিএডিসির বিশেষ ছাড়
বিএডিসি রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় সংস্থাটির অনুমোদিত ডিলারের সংখ্যা ৮১৩। চলতি মৌসুমে এসব জেলায় মোট ৪ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বীজ আলু বিক্রি শুরু হয়েছে। ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭৯ জন ডিলার প্রায় ৯৬০ মেট্রিক টন বীজ আলু সংগ্রহ করেছেন। বিক্রি বাড়াতে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিলারদের জন্য প্রতি কেজি বীজ আলুতে এক টাকা ছাড় ঘোষণা করেছে বিএডিসি।

বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মাসুদ সুলতান বলেন, কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে আগাম বুকিং দিয়ে ডিলাররা বীজ আলু সংগ্রহ করেন। বীজ বিক্রি বাড়াতে ডিলারদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, বীজ সরবরাহ ও বিক্রির কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে কৃষকেরা সময়মতো প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে আগাম আলু রোপণের প্রস্তুতিও সহজ হবে।

আগাম আলু চাষে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশা
আগের মৌসুমের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগাম জাতের আলু চাষের পরিকল্পনা করছেন রংপুর অঞ্চলের অনেক কৃষক। তাঁদের একজন রংপুর সদর উপজেলার কৃষক জুয়েল হোসেন। তিনি স্বল্পমেয়াদি আগাম আমন ধান কাটার পর একই জমিতে আলু রোপণ করবেন। এ জন্য জমি পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও বীজ সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। জুয়েল হোসেন জানান, আগের মৌসুমের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবার আগাম আলু চাষে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। গতবারের তুলনায় বীজের দাম কিছুটা কমলেও সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচের চাপ সামলে লাভ করতে হলে ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া জরুরি।

কৃষকদের হিসাবে, আগাম আলু বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে বাজারে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেলে তাঁদের প্রত্যাশিত লাভ নাও হতে পারে। এ কারণে উৎপাদন পরিকল্পনার পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

বীজের দাম কিছুটা কমলেও বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
চলতি মৌসুমে বীজ আলুর দাম কিছুটা কমেছে। কিন্তু অন্যান্য কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আলু উৎপাদনের মোট খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।

রংপুরের কৃষক শাহাদৎ হোসেন এবার সানশাইন ও বারি-৭ জাতের আলু রোপণ করছেন। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় বীজের দাম কমলেও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। গত বছর এক ট্রলি গোবর সার এক হাজার টাকায় কিনেছিলেন, এবার একই পরিমাণ সার কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২৫০ টাকায়। এর পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও সার সংগ্রহের ভোগান্তিও রয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ এভাবে বাড়তে থাকলে বাজারে ভালো দাম না পেলে লোকসানের ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে চাষের শুরুতেই বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হওয়ায় মৌসুম শেষে লাভের হিসাব নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে চাপে কৃষকেরা
কাউনিয়া উপজেলার বাহাগীলি গ্রামের কৃষক শহিদুর রহমানের ১০ বিঘা জমিতে অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণের কাজ চলছে। সেখানে কর্মরত শ্রমিক সরদার আলিম উদ্দিন জানান, আগাম আলু রোপণের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার জমিতে আলুর বীজ রোপণের মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর এক বিঘা জমিতে আলুর বীজ রোপণের মজুরি ছিল এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। এবার তা বেড়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে।

আলিম উদ্দিন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয় করেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জমির পরিমাণ বেশি হলে শ্রমিক নিয়োগে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে বীজের দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমছে না।

৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা
চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এসব জমি থেকে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এরই মধ্যে ১ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আগাম আলুর আবাদ হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম বলেন, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আলু উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। আগাম আলু চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। আগাম আলু চাষের মাধ্যমে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জমির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সময়মতো বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ পাওয়া এবং উৎপাদিত আলুর উপযুক্ত বাজার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই কৃষকদের বড় প্রত্যাশা
রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষকের জীবিকায় আলু চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নতুন মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃষকদের প্রত্যাশা, আগাম আলুর ভালো ফলন এবং বাজারে উপযুক্ত দাম পাওয়া গেলে আগের দুই মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। বিএডিসির বীজে ছাড় এবং কৃষি বিভাগের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের উদ্যোগও তাঁদের সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত হবে না। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে ভালো ফলন সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই নতুন মৌসুমে আলু চাষের সাফল্য নির্ভর করবে ফলন, উৎপাদন খরচ এবং বাজারদরের সমন্বয়ের ওপর।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি