ইউটিউবের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা মিস্টার বিস্ট এবার চমক দেখালেন ভিন্ন এক উদ্যোগে। আফ্রিকার দেশ ঘানায় শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য একটি পুরো গ্রাম তৈরি করেছেন তিনি। প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই গ্রাম।
‘আবনা ডাকওয়া ভিলেজ’ নামের গ্রামটি তৈরি করা হয়েছে বিশেষ করে কোকোয়া শিল্পে শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য। গ্রামটিতে রয়েছে বসবাসের বাড়ি, স্কুল, খেলার মাঠ, চিকিৎসাকেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বাজার এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার সুযোগ।
চার দিনেই প্রায় ৬ কোটি ভিউ
মিস্টার বিস্টের আসল নাম জিমি ডোনাল্ডসন। তাঁর জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত নতুন একটি ভিডিওতে তুলে ধরা হয়েছে পুরো প্রকল্পের নির্মাণকাজ ও গ্রামটির বর্তমান চিত্র।
প্রায় ১৯ মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, নির্মাণশ্রমিকদের সঙ্গে মিস্টার বিস্ট নিজেও বিভিন্ন কাজে অংশ নিয়েছেন। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিডিওটি প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটির নিচে জমা পড়েছে ৭৫ হাজারের বেশি মন্তব্য।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শকেরা সেখানে উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে অনেকে নিজেদের সমস্যা তুলে ধরে মিস্টার বিস্টের কাছে সহায়তাও চেয়েছেন।
মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য আগে থেকেই পরিচিত মিস্টার বিস্ট। তবে তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘আবনা ডাকওয়া ভিলেজ’ এখন পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় আর্থিক মানবিক উদ্যোগগুলোর একটি।
আট মাসে শেষ নির্মাণকাজ
অনুন্নত একটি জমিতে গ্রামটি গড়ে তুলতে প্রায় এক বছর ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরপর প্রায় আট মাস ধরে চলে নির্মাণকাজ।
গ্রামটিতে শিক্ষকদের বিনা মূল্যে থাকার জন্য রয়েছে ১০টি বাড়ি। রয়েছে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র, কমিউনিটি মার্কেট এবং এমন একটি স্কুল, যেখানে ৩০০-এর বেশি শিশুকে পড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে।
ইতিমধ্যে গ্রামটিতে বসবাস করছেন ১ হাজার ৬২ জন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ শিশু, যারা আগে কোকোয়া খামারে কাজ করত। এখন তারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
স্কুলে ফেরাতে বিনা মূল্যে খাবার
শিশুদের স্কুলমুখী রাখতে শুধু স্কুল নির্মাণেই থেমে থাকেননি মিস্টার বিস্ট। শিক্ষার্থীদের জন্য আগামী পাঁচ বছর প্রতিদিন বিনা মূল্যে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এই কর্মসূচিতে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনহিতকর ও দাতব্য সংস্থা রকফেলার ফাউন্ডেশন।
উদ্যোগটির লক্ষ্য হলো শিশুদের শ্রম থেকে সরিয়ে শিক্ষার পরিবেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারগুলোর জীবনযাপনের জন্য বিকল্প সুযোগ তৈরি করা।
সৌরবিদ্যুৎ, পানি ও জীবিকার ব্যবস্থা
গ্রামটিকে ভবিষ্যতে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতেও বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রয়েছে অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থাপন করা হয়েছে দুটি বড় পানির ট্যাংক। পাশাপাশি রয়েছে কৃষিকাজের অবকাঠামো ও মাছ চাষের ব্যবস্থা। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামবাসী যাতে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আয় করার সুযোগ পান, সেই লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
বসবাসের জন্য বাড়ি ও মৌলিক সেবার পাশাপাশি বাজার ও জীবিকার সুযোগ থাকায় প্রকল্পটি শুধু আবাসন তৈরির উদ্যোগ নয়; দীর্ঘমেয়াদে একটি সম্প্রদায়কে স্বনির্ভর করে তোলার পরিকল্পনাও এতে রাখা হয়েছে।
ঘানায় শিশুশ্রম নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ
ঘানাসহ পশ্চিম আফ্রিকার কোকোয়া উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে শিশুশ্রম দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। মিস্টার বিস্ট তাঁর ভিডিওর একটি মন্তব্যে জানিয়েছেন, ঘানায় প্রায় ১৫ লাখ শিশু স্কুলে না গিয়ে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।
আরেকটি ভিডিওতে পশ্চিম আফ্রিকার কোকোয়া খামারগুলোয় শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন তিনি। একই সঙ্গে বড় চকলেট কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফও পশ্চিম আফ্রিকার কোকোয়া উৎপাদনকারী অঞ্চলে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিকাজে যুক্ত থাকার বিষয়টি নথিবদ্ধ করেছে।
‘শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব দিতে চাই’
ভিডিওটির নিচে পিন করে রাখা মন্তব্যে মিস্টার বিস্ট জানিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা হলো এই উদ্যোগ দেখে অন্যরাও শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে অনুপ্রাণিত হবেন।
ইউটিউবের বিনোদনধর্মী ও চ্যালেঞ্জভিত্তিক ভিডিও দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠা মিস্টার বিস্টের এই উদ্যোগ তাই তাঁর কনটেন্টের বাইরে গিয়ে আরেকটি বার্তা সামনে এনেছে—শিশুদের শিক্ষা, নিরাপদ জীবন ও ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করাও মানবিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array