খুঁজুন
                               
, ,
           

বাঁশের সাঁকো থেকে কাঠের সেতু, তবু কাটেনি অপেক্ষা

নোয়াখালীর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৪ অপরাহ্ণ
বাঁশের সাঁকো থেকে কাঠের সেতু, তবু কাটেনি অপেক্ষা

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের কাটাখালী খালের ওপর দীর্ঘ ৫১ বছর ধরে চলাচলের ভরসা ছিল বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকিপূর্ণ সেই সাঁকো পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অনেকে। মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা ব্যবসার মালামাল পরিবহন—প্রতিটি কাজেই পোহাতে হয়েছে দুর্ভোগ। অবশেষে উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে সেখানে নির্মিত হয়েছে কাঠের সেতু। এতে স্বস্তি ফিরেছে খালের দুই পাড়ের মানুষের জীবনে। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, অস্থায়ী এই কাঠের সেতুর জায়গায় একদিন নির্মিত হবে টেকসই পাকা সেতু।

হাতিয়ার তমরদ্দি বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে কাটাখালী খালের ওপর নির্মিত সেতুটি দিয়ে এখন সাইকেল ও মোটরসাইকেল নিয়ে পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেতুটি দেখতে আশপাশের এলাকা থেকেও মানুষ আসছেন। দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর কাঠের সেতু পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে আনন্দ দেখা গেছে। তবে এই আনন্দের সঙ্গে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত যোগাযোগব্যবস্থার স্মৃতি এবং স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা।

৫১ বছর ধরে বাঁশের সাঁকোই ছিল ভরসা

জানা যায়, আশির দশকের শুরুর দিকেও কাটাখালী খালের ওপর ইট, রড, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে নির্মিত একটি সেতু ছিল। ‘কাটাখালী ব্রিজ’ নামে পরিচিত ওই সেতুর ওপর দিয়ে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করত। তৎকালীন থানা সদর বাথানখালী থেকে তমরদ্দি বাজার হয়ে সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বাজার পর্যন্ত বাস চলাচল করত। সেখান থেকে জাহাজমারা পর্যন্তও যাতায়াতের পথ ছিল এটি।

একপর্যায়ে সেতুটি ভেঙে গেলে সরকারি উদ্যোগে দরপত্র আহ্বান করে সেটি অপসারণ করা হয়। কিন্তু পুরোনো সেতুর জায়গায় নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়ায় বিপাকে পড়েন দুই পাড়ের বাসিন্দারা। নিজেদের প্রয়োজনে তাঁরা চাঁদা তুলে খালের ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। এরপর বছরের পর বছর সেই সাঁকোই হয়ে ওঠে পারাপারের একমাত্র ভরসা।

বর্ষা মৌসুম শেষে সাঁকো মেরামত করতে হতো স্থানীয়দেরই। কখনো বাঁশ বদলাতে হয়েছে, কখনো ভাঙা অংশ জোড়া দিয়ে চলাচলের উপযোগী করতে হয়েছে। এভাবেই কেটে গেছে কয়েক দশক। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তিন গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের দুর্ভোগ

কাটাখালী খালের দক্ষিণ পাড়ে রয়েছে পূর্ব জোড়খালী, জোড়খালী ও কোরালিয়া গ্রাম। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের মানুষকে তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে ওই খালের ওপরের সাঁকো পার হতে হতো।

উপজেলা সদর ওছখালি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। বাজারে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা ব্যবসার মালামাল আনা-নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই সাঁকো পারাপার ছিল বড় বাধা।

বিশেষ করে বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যেত। পিচ্ছিল ও দুর্বল সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, কেউ কেউ গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাও হারিয়েছেন।

রোগী হাসপাতালে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ

সাঁকোর কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হতো মুমূর্ষু রোগী, বয়স্ক মানুষ ও গর্ভবতী নারীদের। খালের দক্ষিণ পাড়ে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৮৫) জানান, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই সাঁকো দিয়ে তমরদ্দি বাজারে যাতায়াত করেছেন। দিনের বেলায় কোনোভাবে পারাপার করা গেলেও রাতে চলাচল ছিল অত্যন্ত কঠিন।

তিনি জানান, একবার তাঁর ছেলের স্ত্রীর প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও রাতের অন্ধকারে খাল পার হওয়া সম্ভব হয়নি। সারারাত অপেক্ষার পর পরদিন সকালে নৌকায় করে তাঁকে খাল পার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সিরাজ মিয়ার ভাষ্য, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে গ্রামের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রেও অন্য এলাকার মানুষের অনীহা ছিল। বিভিন্ন নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

মালামাল পার করতে গিয়ে পঙ্গু ভ্যানচালক

কোরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা নবির উদ্দিন (৫০) ও শমশের আলী (৬০) জানান, তাঁদের দোকানের মালামাল আনতে হয় তমরদ্দি বাজার থেকে। ভ্যানচালকেরা খালের ওপারে মালামাল রেখে দেন। এরপর মাথায় করে সাঁকো পার হয়ে সেগুলো দোকানে পৌঁছে দিতে হয়।

শমশের আলী জানান, গত বছর নুর ইসলাম নামের এক ভ্যানচালক চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান। এতে তাঁর এক হাত ও এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। বর্তমানে তিনি পঙ্গু অবস্থায় বাড়িতে বসবাস করছেন।

শুধু ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহন নয়, সাঁকো পারাপার করতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদেরও দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

শমশের আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের শিক্ষার্থীদের তমরদ্দি উচ্চবিদ্যালয় ও তমরদ্দি মাদ্রাসায় যেতে এই সাঁকো পার হতে হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এক ছাত্রী সাঁকো থেকে খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকলে সহপাঠীদের চিৎকার শুনে খালপাড়ের দোকান থেকে লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন।

২০ বছর আগেও হয়েছিল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ বছর আগে কাটাখালী খালের ওপর নতুন সেতু নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। একজন ঠিকাদার কাজ পেয়ে নির্মাণকাজ শুরু করলেও মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির কারণে কাজ বন্ধ করে দেন বলে জানা যায়। পরে তিনি নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিয়ে যান। ফলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।

এর আগে ২০১৯ সালে কাটাখালী খালের ওপর দিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায়। তবু দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি।

উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কাঠের সেতু

সম্প্রতি কোনো এক কাজে ওই এলাকায় গিয়ে বাঁশের সাঁকোটি দেখেন হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল। স্থানীয়দের কাছ থেকে সাঁকোটির দীর্ঘ ইতিহাস ও দুর্ভোগের কথা শুনে তিনি কাঠের সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে নির্মিত হয় নতুন সেতুটি।

সেতুটি পুরোপুরি কাঠ দিয়ে তৈরি। নিচে রয়েছে সিমেন্টের খুঁটি, তার ওপর কাঠের পাটাতন। দুই পাশে দেওয়া হয়েছে হাতল। রং করে সাজানো হয়েছে পুরো সেতু। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও এটি দেখতে আসছেন।

প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সোনাদিয়া থেকে সেতুটি দেখতে আসেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর আরিয়ান ফরিদ। তাঁর মতে, বিশেষ রঙে সাজানো দীর্ঘ সেতুটি দূর থেকে দেখতে ছোট নদীর ওপর নির্মিত বড় সেতুর মতো মনে হয়। এটি এখন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার অসুবিধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। এতে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একটি সাঁকোকে সেতুতে রূপান্তরের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে ইট-পাথরের স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বলা হয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার প্রত্যাশা

কাটাখালী খালের ওপর কাঠের সেতু নির্মাণের ফলে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থায় স্বস্তি ফেরার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

তমরদ্দি বাজার বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি হোসেন আহম্মদ বলেন, সেতুটি নির্মিত হওয়ায় তমরদ্দি বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য কয়েক গুণ বাড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন। হাতিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের নিঝুম দ্বীপ, জাহাজমারা ও চরচেঙ্গা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে তমরদ্দি বাজারের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও জমজমাট হতে পারে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যাতায়াত সহজ হলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া, জরুরি চিকিৎসা নেওয়া এবং কৃষি ও ব্যবসার পণ্য পরিবহন আগের তুলনায় সহজ হবে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে তিন গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আসবে।

স্বস্তি মিলেছে, অপেক্ষা এখন পাকা সেতুর

কাঠের সেতু নির্মাণের পর স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। তবে তাঁরা এটিকে স্থায়ী সমাধানের শেষ ধাপ হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের প্রত্যাশা, কাঠের সেতুর জায়গায় দ্রুত একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণ করা হবে, যাতে ভারী যানবাহন চলাচলসহ দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি সাঁকোর ওপর নির্ভর করে চলা মানুষের কাছে কাঠের সেতুটি তাই শুধু পারাপারের পথ নয়—এটি স্বস্তি, সম্ভাবনা ও দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে ওঠার নতুন আশার প্রতীক। এখন তাঁদের অপেক্ষা, সেই আশা কবে স্থায়ী সেতুতে রূপ নেবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ধর্ম নয়, নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
ধর্ম নয়, নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী

ধর্মের পরিচয় নয়, নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক মানুষের যে অধিকার ও প্রাপ্য রয়েছে, সরকারপ্রধান হিসেবে তা নিশ্চিত করতে নিজের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকা-১৭ আসনের সনাতন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঢাকা-১৭ আসনের আটটি মন্দিরের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে পূজায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এ সময় ধর্মীয় সম্প্রীতি, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়।

‘ধর্মের ভিত্তিতে নয়, মানুষ হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করব’

মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আল্লাহ তাঁকে মানুষের জন্য কাজ করার একটি সুযোগ দিয়েছেন। নিজের অবস্থান থেকে তিনি চেষ্টা করবেন, ধর্মের পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে তাঁর ক্ষমতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব নিরাপত্তা দিতে।

তিনি বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক মানুষের যে অধিকার রয়েছে এবং যা তাঁর প্রাপ্য, সরকারপ্রধান হিসেবে সেই অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করাই তাঁর দায়িত্ব। নাগরিকদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে নিজের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সনাতন সম্প্রদায়ের নেতারা অল্প সময়ের মধ্যে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। আরও কিছু বিষয়ে সরকার কাজ করার চেষ্টা করছে। এসব উদ্যোগ সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সবাই একসঙ্গে ছিলেন

দেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। জাতির সংকটময় সময়ে মানুষ যখন ধর্মীয় পরিচয়কে আলাদা করে দেখেননি, তখন অন্যান্য ক্ষেত্রেও ধর্মের ভিত্তিতে পার্থক্য করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, দেশ স্বাধীন করার সংগ্রামে সব ধর্মের মানুষ অংশ নিয়েছেন। একইভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে ছিলেন। তাই নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়।

নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বিভিন্ন ধর্মের নেতাকর্মী

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রামে বিভিন্ন ধর্মের নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, তাঁর মুসলমান কর্মীরা যেমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বী কর্মীরাও নির্যাতিত হয়েছেন। সে ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো পার্থক্য ছিল না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তারেক রহমানের বক্তব্যে নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পূজার ছুটি ও অনুদান বাড়ানোয় ধন্যবাদ

মতবিনিময় সভায় সনাতন সম্প্রদায়ের নেতারা বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের কল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটি ও অনুদান বাড়িয়ে দেওয়ায় তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

নেতারা বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন এবং কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন উদ্যোগে তাঁরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন।

তাঁরা আরও জানান, বিএনপিকে ভোট দিয়ে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষ ভুল করেননি বলে তাঁদের মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতেও সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন তাঁরা।

  • বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা

মতবিনিময় সভায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সভাপতি অলক সাহা, বারিধারা ডিওএইচএস পূজা কমিটির সভাপতি জীবন কানাই দাস, ব্রিটিশ চন্দ্র কর্মকার, নারায়ণ চন্দ্র সাহা, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিখা রানী দাস, শ্যামল কুমার দাস ও রাজিব কুমার আচার্যসহ সনাতন সম্প্রদায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য তারেক রহমানের প্রতিনিধি আব্দুর রহমান সানি এবং বনানী সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ সফিকুজ্জামান রতনও সভায় অংশ নেন।

মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সরকারের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারই গুরুত্ব পায়।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ইসরায়েলের নির্দেশনায় ৩১ দেশের নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৯ অপরাহ্ণ
ইসরায়েলের নির্দেশনায় ৩১ দেশের নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধ

ইসরায়েলের নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে বাংলাদেশসহ ৩১টি দেশের নাগরিক ও দ্বৈত নাগরিকত্বধারী পাইলট এবং কেবিন ক্রুদের ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব দেওয়া বন্ধ করেছে ফরাসি বিমান সংস্থা এয়ার ফ্রান্স। যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেসব দেশের নাগরিকত্বের ভিত্তিতে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনকি ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা কর্মীদেরও অন্য নাগরিকত্ব নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকলে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ফ্রান্সে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বিমান সংস্থাটি।

ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদনের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই শনিবার (১০ অক্টোবর) এ তথ্য জানায়।

মিডিয়াপার্টের হাতে আসা এয়ার ফ্রান্সের একটি অভ্যন্তরীণ বার্তা অনুযায়ী, ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশকারী ফ্লাইটের কোনো ক্রুর এমন দেশের নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা চলবে না, যে দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

এই নির্দেশনার ভিত্তিতে এয়ার ফ্রান্স ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ছাড়াও আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইরান ও পাকিস্তানের মতো দেশের নাগরিকেরা এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে তালিকায় রয়েছে ৩১টি দেশের নাগরিকত্ব।

নির্দেশনায় কোনো ধর্মের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থাকায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিশেষ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে, নিরাপত্তার যুক্তিতে নেওয়া এই ব্যবস্থা কার্যত জাতীয়তার ভিত্তিতে কর্মীদের আলাদা করছে।

এই বিধিনিষেধের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ফরাসি নাগরিকত্ব থাকলেও তাঁরা ছাড় পাচ্ছেন না। কারও দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত কোনো দেশের হলে তাঁকেও ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কর্মীদের দ্রুত তাঁদের নাগরিকত্বের তথ্য জানাতে বলেছে এয়ার ফ্রান্স। নির্দেশনা না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তের ফলে কর্মক্ষেত্রে জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও একজন কর্মীকে তাঁর অন্য নাগরিকত্বের কারণে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

তবে এ বিষয়ে এয়ার ফ্রান্স এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এন১২-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন নির্দেশনাটি জারি করে। ইসরায়েলের দাবি, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনাটি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে ক্রু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রুটে দায়িত্ব পালন করে আসা কিছু পাইলট ও কেবিন ক্রুর দায়িত্ব পালনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

নতুন বিধিনিষেধের পেছনে একটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে ওমানি সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং সেটিকে ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের টার্মিনালে বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে।

ওই অভিযোগের পর বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর পরপরই ইসরায়েলের পরিবহন মন্ত্রণালয় নতুন নির্দেশনা জারি করে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে ওঠা অভিযোগ এবং ৩১ দেশের নাগরিকদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা থাকলেও নাগরিকত্বের ভিত্তিতে এত বড় পরিসরে কর্মীদের বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, দেশটির অন্তত একটি বিমান সংস্থা প্রায় ২ হাজার ৫০০ পাইলট ও কেবিন ক্রুর অতীত ইতিহাস যাচাই শুরু করেছে।

এ উদ্যোগও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যাচাইয়ের আওতায় থাকা কর্মীদের পরিচয়, যাচাইয়ের নির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং এর ভিত্তিতে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিমান চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিরাপত্তার নামে কোনো কর্মীকে তাঁর নাগরিকত্বের ভিত্তিতে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হলে সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এয়ার ফ্রান্সের ক্ষেত্রে বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে, কারণ বিধিনিষেধের আওতায় পড়ছেন ফরাসি নাগরিকত্ব থাকা কর্মীরাও। তাঁদের অন্য নাগরিকত্বের কারণে দায়িত্ব পালনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমান কর্মসংস্থানের অধিকার ও বৈষম্যবিরোধী আইনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

মিডিয়াপার্টের প্রতিবেদনে এ সিদ্ধান্তের কারণে ফরাসি বিমান সংস্থাটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মামলার চূড়ান্ত ফলাফল বা আদালতের সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এয়ার ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং কর্মীদের সমান অধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

তথ্যসূত্র: মিডিয়াপার্ট, মিডল ইস্ট আই ও আনাদোলু এজেন্সি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

সংরক্ষিত আসনে পুরুষ, দাঁড়িয়ে থাকেন নারী-প্রবীণরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৮ অপরাহ্ণ
সংরক্ষিত আসনে পুরুষ, দাঁড়িয়ে থাকেন নারী-প্রবীণরা

রাজধানী ঢাকার লোকাল বাসে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের যাতায়াত ক্রমেই দুর্ভোগ ও ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। সংরক্ষিত আসনে বসার সুযোগ না পাওয়া, বাসে ওঠানামার সময় অসতর্কতা এবং সহকারী কর্মীর অভাবে প্রতিদিনই নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন তাঁরা। যাত্রীসেবার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় নগর পরিবহনে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআর) এবং শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) যৌথ পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে। রোববার (১১ অক্টোবর) সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পর্যবেক্ষণের তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এক মাস ধরে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন রুটের অর্ধশতাধিক বাস পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এ সময় যাত্রী, পরিবহনশ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে নগর পরিবহনের নানা অনিয়ম ও যাত্রীদের ভোগান্তির চিত্র পাওয়া গেছে।

সংরক্ষিত আসনেও বসার সুযোগ নেই

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধাসহ প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য প্রতিটি বাসে নয়টি আসন সংরক্ষিত রাখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিছু বাসে এ বিষয়ে নির্দেশনার কথা লেখা থাকলেও অধিকাংশ বাসে তা উল্লেখ নেই। সংগঠন দুটির দাবি, কোনো বাসেই নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।

যাত্রীভর্তি লোকাল বাসে সংরক্ষিত আসনে পুরুষ যাত্রীদের বসে থাকতে দেখা গেছে। অন্যদিকে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে তাঁদের শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি অস্বস্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়ছে।

৮০ শতাংশ বাসে নেই হেলপার

ঢাকার লোকাল বাসে চলাচলের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে সহকারী কর্মী বা হেলপার না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে, এ ধরনের প্রায় ৮০ শতাংশ বাসে হেলপার নেই।

সংগঠন দুটির ভাষ্য অনুযায়ী, একজন চালক মালিকের কাছ থেকে দিনচুক্তিতে বাস ভাড়া নেন। পরে একজন কন্ডাক্টর নিয়ে সড়কে বাস চালান। দিন শেষে মালিকের পাওনা পরিশোধ করে অবশিষ্ট টাকা চালক ও কন্ডাক্টর ভাগ করে নেন। খরচ কমানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে হেলপার রাখা হয় না।

ঝুঁকি নিয়ে বাসে ওঠানামা

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কন্ডাক্টররা বিভিন্ন স্টপেজ ও সড়কের যত্রতত্র বাস থামিয়ে দ্রুত যাত্রী ওঠানামা করান। একই সময়ে তাঁদের বাসের ভেতরে ভাড়া আদায়ের কাজও করতে হয়। ফলে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে বাসে উঠতে ও নামতে হয়।

বিশেষ করে বাস থেকে নামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। সংগঠন দুটির দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে।

অনিয়ম বন্ধে চার দফা সুপারিশ

নগর পরিবহনে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে চারটি সুপারিশ করেছে জাতীয় কমিটি ও এসসিআরএফ।

সুপারিশগুলো হলো—

১. নগর পরিবহনের সব বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ নির্ধারিত শ্রেণির যাত্রীদের জন্য নয়টি আসন সংরক্ষণের নির্দেশনা কার্যকর করা।

২. প্রতিটি বাসে চালক ও কন্ডাক্টরের পাশাপাশি একজন হেলপার নিয়োগ নিশ্চিত করা।

৩. চালক কিংবা কন্ডাক্টরের কাছে দিনচুক্তিতে বাস ভাড়া দেওয়ার প্রথা বন্ধ করা।

৪. সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো কঠোরভাবে প্রতিহত করা।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলো নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চলাচল করছে। বাসমালিকদের যাত্রীসেবার চেয়ে মুনাফার দিকে নজর বেশি।

এসব অনিয়ম প্রতিরোধে অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি জানান তিনি।

যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসনের ব্যবহার, বাসে পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ এবং নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামার নিয়ম কার্যকর করা জরুরি বলে মনে করছে সংগঠন দুটি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি