খুঁজুন
                               
, ,
           

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাস; ইচ্ছাপূরণ ‘অপরাজেয়’ মহামান্যের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ১০:৪১ অপরাহ্ণ
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাস; ইচ্ছাপূরণ ‘অপরাজেয়’ মহামান্যের

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:

বাংলাদেশের টানা দুইবারের রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর সেনানী। ‘মহামান্য’ নামেই সবাই সম্বোধন করেন তাকে। ব্যক্তিত্ব, আচরণ ও জনকল্যাণে হাওরবাসীর মনেও ‘মহামান্য’ নামেই তার সদর্প উপস্থিতি। আপামর জনসাধারণের মাথা নুইয়ে আসে তার প্রতি শ্রদ্ধায়। হাওরের প্রতিটি বাঁকই তার চেনা। এখানকার সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে তিনিই শিখিয়েছেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে। ফেলে আসা শৈশবে হাওরের বুকে টানা ১৩ ঘণ্টা সাঁতার কেটেছেন।

মুঠো মুঠো উন্নয়নে বদলে দিয়েছেন হাওরের চেহারা। ভোট রাজনীতিতেও ছিলেন ‘অপরাজেয়’। হারেননি কখনও। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরই তাঁর ইচ্ছা ছিল হাওরে একটি সেনানিবাসের। যে সেনানিবাস হাওর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তায় রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একজন কৃষকের সন্তান থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসেছেন। দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে শ্রদ্ধেয় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরকে আরও একবার বিরল সম্মানেই ভূষিত করলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে আকাক্সিক্ষত সেনানিবাস। রাষ্ট্রপতির স্থানীয় কামালপুরের বাড়ির পাশে ঘোড়াউত্রা নদীর চরে নির্মিত হয়ে এটি। বঙ্গবন্ধুকন্যা সেনানিবাসটির নামকরণও করেছেন ‘ভাটির শার্দুল’র নামেই। ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাস’ নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আবহে এক অপরূপ আকর্ষণের পূর্ণতা দিয়ে মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) শুরু করলো পথচলা।

এদিন সকাল ১১ টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাস’র উদ্বোধন করেন। সরকারপ্রধান বলেছেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতির ইচ্ছায় আমরা এই সেনানিবাসটি গঠন করেছি এবং তাঁর নামেই উৎসর্গ করেছি।’ সেনানিবাস উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সেনানিবাস উদ্বোধনের পর একটি আম গাছের চারা রোপণ করেন।

সরকারপ্রধান সেনানিবাসের প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ এবং ১৯ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ঘাটাইলের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরী তাকে অভ্যর্থনা জানান। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার দেন সেনা সদস্যরা। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচটি ইউনিটের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তিনি এ উপলক্ষে বেলুন ওড়ান। তারপর সেনা সদস্যদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন সরকারপ্রধান।

চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাসের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ জেলায় মিঠামইনে নব প্রতিষ্ঠিত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাস হাওর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। তাছাড়া, দেশের উত্তর-পূর্বাংশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও জোরদার হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর চোখে মহামান্য আবদুল হামিদ
মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন অগ্নিসংগ্রামী হিসেবেও গৌরবগাঁথা ইতিহাস রয়েছে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের। ১৯৭০’র ঐতিহাসিক নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্তও ভোট রাজনীতিতে তাঁর কোন হার নেই। জিতেছেন ’৭৯, ’৮৬, ’৯১, ’৯৬ ও ’২০০১ সালের নির্বাচনেও। সপ্তম সংসদে ডেপুটি স্পিকার, নবম সংসদে বিরোধী দলের উপ-নেতার দায়িত্ব পালন করেন দক্ষতার সঙ্গে।

ছিলেন মহান জাতীয় সংসদের স্পিকারও। নিরপেক্ষতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দীর্ঘদিন এই দায়িত্ব পালন করেছেন সফলতার সঙ্গেই। স্বভাবসুলভ রসিকতায় সব সময়ই প্রাণবন্ত করে রাখতেন সংসদকে। অর্জন করেছিলেন জনপ্রিয়তাও। হাওরের বাতাস আর এখানকার জল-মাটির সোঁদা গন্ধ বরাবরই তাকে টানে। দেশের সর্বোচ্চ আসনে থেকেও তিনি নিজেকে একটুকুও বদলাননি। তিনি সততার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ২০১৩ সালে তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ এ ভূষিত হন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের স্মৃতি সব সময় জ্বলজ্বল করে। তার বৈশিষ্ট্য, সাফল্য আর কৃতিত্বের কথা এলাকার জনশ্রুতিতে যেন ঘুরে সব সময়। দুর্গম হাওরে বেড়ে ওঠা দুইবারের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের যারপরেনাই প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রীও।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ, আমাদের রাষ্ট্রপতি। তিনি এ অঞ্চল থেকে বার বার নির্বাচিত হয়েছেন। সেই ৭০ এর নির্বাচন, ৭৩ এর নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্বাচনে তিনি জয় লাভ করেছেন এবং জনগণের সেবা করে গেছেন। এই দুর্গম অঞ্চলের মানুষের পাশে থাকা, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়া, তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে আবদুল হামিদ নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তখন এ অঞ্চলে একটা সেনানিবাস করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। এটি এই অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। তারই ইচ্ছায় এই সেনানিবাসটি আমরা গঠন করেছি। তার নামেই এ সেনানিবাস আমরা উৎসর্গ করেছি।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যখন যে দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের যুদ্ধ এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে তার বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি নিবেদিতপ্রাণ এবং সৎভাবে জীবনযাপন করে এদেশের মানুষের সেবা করে গেছেন। কাজেই তার নামে এই সেনানিবাস করতে পেরে আমরা সত্যিই খুব আনন্দিত।’

হাওরের বিমুগ্ধ বিস্ময়ের কথাও উঠে আসে সরকারপ্রধানের কন্ঠে। তিনি হাওর এলাকার মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। বলেন, ‘মিঠামইন হাওর অঞ্চলটি বর্ষাকালে ছোট ছোট দ্বীপের মতো হয়ে যায়। এখন ঠিক তার বিপরীত। এখন আমরা দেখছি ফসলে ভরে গেছে, রাস্তাঘাট আছে। কিন্তু বর্ষাকালে ভিন্ন চিত্র। এ অঞ্চলের মানুষকে জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়।’

৫ টি ইউনিটের পতাকা উত্তোলন
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাসের ৪টি ইউনিট (পদাতিক, ইঞ্জিনিয়ার, এসএসডি ও সিএমএইচ) ও এসএসডি জাজিরা’র পতাকা উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সাইফুল আলম, ১৯ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ঘাটাইলের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরী, ও ৯ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও সাভারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক নবনির্মিত ইউনিটসমূহের পতাকা উত্তোলন করেন।

বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ একটি ‘ব্র্যান্ড নেইম’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুমহান দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবেলায় এবং দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো নির্মাণেও সর্বোচ্চ সাফল্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ একাগ্রতা, কর্মদক্ষতা এবং নানাবিধ জনসেবামূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে দেশের জনগণের মনে স্থান করে নিয়েছে। যেকোন দুর্যোগ, আর্ত-মানবতার সেবা ও জানমাল রক্ষায় সেনাবাহিনীর কর্তব্য ও দায়িত্বশীল ভূমিকা সব সময় প্রশংসিত হয়ে আসছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ একটি ‘ব্র্যান্ড নেইম’ যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে দায়িত্বশীলতা ও সহমর্মিতার সাথে দুর্গতদের পাশে থেকে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং সমগ্র জাতির কাছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি আস্থার নাম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ সেনানিবাসের প্রত্যেক সদস্যের পেশাগত দক্ষতা ও কর্মচাঞ্চল্যে এই সেনানিবাস অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অত্যাধুনিক সেনানিবাস হিসেবে পরিগণিত হবে।’

কালের আলো/এমএএএমকে

সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনযুগ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১০ অপরাহ্ণ
সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনযুগ

১১ বছরের ব্যবধানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো জারি করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় একদিকে সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর মোট বেতন ভাতাসহ ৩৩ হাজার টাকার বেশি হবে, অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মতো বিশেষ গ্রেডের কর্মকর্তাদের মোট বেতন দাঁড়াবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। শুধু বেতন নয়, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ, পেনশন বৃদ্ধি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিভিন্ন বিশেষ ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

  • সর্বনিম্ন মোট বেতন ৩৩ হাজারের বেশি
  • সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা
  • মূল বেতন, পেনশন ও ভাতায় বড় স্বস্তি
  • পদোন্নতি ছাড়াও উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ

তবে নতুন কাঠামোর পুরো আর্থিক সুবিধা একসঙ্গে মিলছে না। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। অধিকাংশ নতুন ভাতা কার্যকর হবে আরও প্রায় দেড় বছর পর, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার নতুন দিগন্ত খুলছে, অন্যদিকে এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বড় আর্থিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার, ঢাকায় আরও বেশি
নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কর্মস্থলভেদে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মুঠোফোন ভাতা যুক্ত হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় একই গ্রেডে মোট বেতন হবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা।

অন্যদিকে বিসিএসসহ নবম গ্রেডে যোগ দেওয়া তরুণ কর্মকর্তাদের মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। ভাতাসহ তাঁদের মোট আয় ৬০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি চাকরির প্রবেশপর্যায়ের বেতনেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে।

সর্বোচ্চ বেতন প্রায় আড়াই লাখ
নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ঢাকায় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, মুঠোফোন ও ধোলাই ভাতা মিলিয়ে তাঁদের মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক গাড়িসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় বেতন ব্যবস্থার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তর—দুই প্রান্তেই পরিবর্তন এসেছে।

তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন আদেশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও কর্মচারীরা সেদিন থেকেই পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাচ্ছেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে পূর্ণ বেতন কার্যকর হবে। নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা প্রথম পর্যায়ে বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, পরের ধাপে ৭৫ শতাংশ এবং শেষ পর্যায়ে শতভাগ কার্যকর হবে। ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় অঙ্কের ব্যয়ের চাপ কিছুটা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পদোন্নতি ছাড়াও বাড়বে বেতন
নতুন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো পদোন্নতি না পেলেও নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ। একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে এবং রেকর্ড সন্তোষজনক থাকলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে। পরবর্তী পর্যায়েও নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিশেষ করে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত এমন পদে দীর্ঘদিন কাজ করা কর্মচারীদের জন্য এটি আর্থিক অগ্রগতির বিকল্প পথ তৈরি করবে। ফলে শুধু পদোন্নতির ওপর নির্ভর না করেও চাকরির মেয়াদ ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকছে।

পেনশনে বড় স্বস্তি
অবসরপ্রাপ্তদের জন্যও নতুন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার কমে ৫৫ শতাংশে নামবে। তবে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে নিম্ন পেনশনভোগীদের আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড় পরিবর্তন আসছে।

ভাতায়ও নতুন চিত্র
নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়ার হার কর্মস্থল ও গ্রেডভেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয়েছে। চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াত, শিক্ষা সহায়তা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের ভাতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে অধিকাংশ নতুন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

বাড়তি ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে?
নতুন বেতনকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বেতন নিয়ে নয়, অর্থায়ন নিয়ে। মূল বেতন ও ভাতা বাড়ার ফলে সরকারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। চলতি অর্থবছরেই বর্ধিত মূল বেতনের দুই ধাপ বাস্তবায়নে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, আগামী দেড়-দুই বছরে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে। ঋণনির্ভর অর্থায়ন বা ব্যয় সংকোচনের পথ নিতে হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তবে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারও রাজস্ব আয় বাড়ানো, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় সময় পাচ্ছে। ফলে নতুন কাঠামোর সাফল্য শুধু বেতন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজস্ব সংগ্রহ ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর সক্ষমতাও।আয় বাড়ার সঙ্গে বাড়ুক সেবার মাননতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে প্রণোদনা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রবেশপর্যায়ের বেতন বৃদ্ধি, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ এবং পেনশন বৃদ্ধির ফলে সরকারি চাকরি আরও কাঠামোবদ্ধ আর্থিক সুবিধার আওতায় আসছে।

এখন চ্যালেঞ্জ হবে এই বাড়তি সুবিধার সঙ্গে সরকারি সেবার মান ও কর্মদক্ষতার প্রত্যাশিত উন্নতি নিশ্চিত করা। কারণ একটি আধুনিক বেতনব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য শুধু কর্মচারীর বেতন কত বাড়ল, তা দিয়ে নয়; সেই বিনিয়োগের বিনিময়ে রাষ্ট্র কতটা দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব সেবা দিতে পারল—শেষ পর্যন্ত তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কাঠামোর পূর্ণ সার্থকতা।

এম/এএইচ

মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, এশিয়ান গেমস শেষ বাংলাদেশের

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৮ অপরাহ্ণ
মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, এশিয়ান গেমস শেষ বাংলাদেশের

ড্র দিয়েই আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের মিশন শেষ করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে ঋতুপর্ণা চাকমা, তহুরা খাতুনরা।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৫২ ধাপ এগিয়ে মিয়ানমার। শক্তির দিক থেকেও প্রতিপক্ষ এগিয়ে থাকলেও গ্রুপের শেষ ম্যাচটি নিয়ে আশাবাদী ছিল বাংলাদেশ। ম্যাচের আগে কোচ পিটার বাটলার ও অধিনায়ক মারিয়া মান্দার কথাতেও সেই প্রত্যাশার ছাপ ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জয় নয়, গোলশূন্য ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে।

মিয়ানমারের বিপক্ষে এর আগে দুবার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। দুই ম্যাচের একটিতে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ এবং অন্যটিতে জয় পেয়েছিল মিয়ানমার। ফলে আজকের ম্যাচের ড্রয়ে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের হিসাবও সমান থাকল।

কোয়ার্টার ফাইনালের আশা শেষ

গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচেই শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে সরাসরি ওঠার সুযোগ আগেই শেষ হয়ে যায়।

তবে মিয়ানমারের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয় পেলে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে শেষ আটে ওঠার ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। কিন্তু গোলশূন্য ড্রয়ের ফলে সেই সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেল।

বল দখলে কাছাকাছি, আক্রমণে ব্যর্থতা

মিয়ানমারের বিপক্ষে বল দখলের লড়াইয়ে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না বাংলাদেশ। ম্যাচের ৪৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা।

তবে বল দখল থাকলেও আক্রমণভাগে কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারেনি দলটি। পুরো ম্যাচে মিয়ানমারের গোলমুখে মাত্র তিনটি শট নিতে পেরেছে বাংলাদেশ। এর কোনোটিই লক্ষ্যে রাখতে পারেনি তারা।

অন্যদিকে বাংলাদেশের গোলমুখে আটটি শট নিয়েছে মিয়ানমার। এর মধ্যে দুটি ছিল লক্ষ্যে। তবে বাংলাদেশের গোলরক্ষক রুপনা চাকমা দুটিই দক্ষতার সঙ্গে ঠেকিয়ে দেন।

ফলে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল কোনো গোল হজম না করা।

আগের দুই ম্যাচে বড় হার

এশিয়ান গেমসের এবারের আসরে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল কঠিন। প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৬-০ গোলে হারে বাংলাদেশ।

তৃতীয় ম্যাচে মিয়ানমারের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে অন্তত এক পয়েন্ট নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করল দলটি।

এ নিয়ে দ্বিতীয়বার এশিয়ান গেমসে অংশ নিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। ২০২৩ সালের আসরেও তিন ম্যাচ খেলে দুটি হার ও একটি ড্র পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার তিন ম্যাচে মোট ১৫ গোল হজম করেছিল দলটি।

এবারও প্রথম দুই ম্যাচে ১৬ গোল হজম করলেও শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের বিপক্ষে গোলপোস্ট অক্ষত রেখেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। তবে গ্রুপ পর্বে জয়হীন থেকেই আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের অভিযান শেষ হলো তাদের।

কালের আলো/এসএ

শতবর্ষে নূরজাহান: শিশুশিল্পী থেকে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৪ অপরাহ্ণ
শতবর্ষে নূরজাহান: শিশুশিল্পী থেকে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’

একসময় তাঁর কণ্ঠ শুনে পরিবারের একজন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—এই মেয়েই একদিন পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবে। কথাটি যে এত দ্রুত সত্যি হবে, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি। মাত্র ছয় বছর বয়সে সংগীতের তালিম নেওয়া সেই মেয়েটিই কয়েক বছরের মধ্যে মঞ্চে উঠলেন, শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে এলেন, পরে হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় নায়িকা। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে এমন সাফল্য পেলেন যে দেশভাগের সময় ভারত ছাড়ার সময় পেছনে রেখে গেলেন প্রতিষ্ঠিত এক তারকার জীবন।

কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় তখনো বাকি ছিল।

নতুন দেশ পাকিস্তানে গিয়ে তাঁকে আবার শুরু করতে হয়েছিল। দেশটি তখন নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার সংগ্রামে। নূরজাহান সেখানে শুধু গান গাওয়া কিংবা অভিনয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রযোজনা করেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন, পরিচালনায় এসেছেন, নিজের পারিশ্রমিক নিজেই নির্ধারণ করেছেন। পরে অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি মন দেন সংগীতে।

আর সেই সংগীতই তাঁকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—সুরের রানি।

আজ নূরজাহানের জন্মের ১০০ বছর। ১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্মেছিলেন তিনি। সংগীত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী পরবর্তী সময়ে শুধু পাকিস্তানের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ও চলচ্চিত্র ইতিহাসে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন।

ছয় বছর বয়সে সংগীতের হাতেখড়ি

নূরজাহানের জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে গান ছিল দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা মাদাদ আলী সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের আরও কয়েকজন নারী মঞ্চে কাজ করতেন। ছোট বয়সেই নূরজাহানের কণ্ঠে অসাধারণ সম্ভাবনা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

মাত্র ছয় বছর বয়সে শুরু হয় তাঁর সংগীতের তালিম। পরে কলকাতায় গিয়ে সংগীতের আরও বড় পরিসর পান তিনি। শিশুশিল্পী হিসেবে তখনই পরিচিতি তৈরি হয় ‘বেবি নূরজাহান’ নামে।

মঞ্চ ও চলচ্চিত্র—দুই জায়গাতেই অল্প বয়সে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৫ সালের পিন্ড দি কুড়ি চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। এরপর পাঞ্জাবি ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ বাড়তে থাকে।

যে বয়সে অন্য শিশুরা স্কুল, খেলাধুলা আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই নূরজাহান স্টুডিও, মঞ্চ, রেকর্ডিং ও ক্যামেরার সামনে কাজ শুরু করেছিলেন।

১৯৩৮ সালে গুল বাকাওলি ছবির জন্য গান রেকর্ড করেন তিনি। চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর শুরুর দিককার উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

মুম্বাইয়ে তারকা হয়ে ওঠা

কলকাতার পর নূরজাহানের ক্যারিয়ার তাঁকে নিয়ে যায় লাহোর ও মুম্বাইয়ে। চল্লিশের দশকে মুম্বাই ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে আর শিশুশিল্পী হিসেবে থেমে থাকেননি তিনি; হয়ে ওঠেন পূর্ণাঙ্গ নায়িকা ও গায়িকা।

১৯৪২ সালের খানদান তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর গানের জনপ্রিয়তাও তাঁকে দ্রুত বড় তারকায় পরিণত করে।

এরপর একে একে আসে জিনাত, আনমোল ঘড়িজুগনু-এর মতো চলচ্চিত্র।

১৯৪৫ সালের জিনাত-এর ‘বুলবুলো মাত রো’ গানটি তাঁকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। অন্যদিকে আনমোল ঘড়িতে অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি দর্শকের নজর কাড়ে।

১৯৪৭ সালের জুগনুতে দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় তাঁকে তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সারির নায়িকাদের একজন করে তোলে।

দেশভাগে বদলে গেল জীবন

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। লাখ লাখ মানুষের মতো নূরজাহানের জীবনও বদলে গেল রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

স্বামী ও চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পাকিস্তানে চলে যান।

তখন পাকিস্তানের নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প খুবই নবীন। দেশভাগের কারণে শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, প্রযোজক ও অর্থ—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। লাহোরকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চললেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল সীমিত।

নূরজাহান সেখানে গিয়ে আবার শুরু করলেন।

তবে এবার তিনি শুধু শিল্পী ছিলেন না। ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছিল চলচ্চিত্র কীভাবে তৈরি হয়, তারকা কীভাবে গড়ে ওঠে এবং দর্শকের কাছে একটি চলচ্চিত্রকে কীভাবে পৌঁছে দিতে হয়।

১৯৫১ সালে মুক্তি পায় চানভে। এতে নূরজাহান অভিনয় ও সংগীতের পাশাপাশি পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

নায়িকা থেকে কণ্ঠের সম্রাজ্ঞী

চানভে-এর পর দুপাট্টা, পাতে খান, ইন্তেজার, আনারকলিকোয়েল-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নূরজাহান।

তবে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তিনি বুঝতে শুরু করেন, পর্দায় অভিনয়ের চেয়ে তাঁর কণ্ঠের জন্য মানুষের অপেক্ষা বেশি। শেষ পর্যন্ত অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন।

১৯৫৯ সালের পর তাঁর অভিনয়জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন মূলত প্লেব্যাক ও গজলশিল্পী।

নায়িকার ঠোঁটে গান থাকলেও দর্শকের কাছে সেই গানের আবেগকে আলাদা মাত্রা দিত নূরজাহানের কণ্ঠ। ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠই হয়ে ওঠে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় আকর্ষণ।

নিজের পারিশ্রমিক নিজেই ঠিক করতেন

নূরজাহানের ব্যক্তিত্বের একটি দিক ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস। পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে যখন অনেক গায়িকা একটি গানের জন্য প্রায় ৩৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, নূরজাহান দাবি করতেন প্রায় ২ হাজার রুপি।

অর্থাৎ অন্যদের তুলনায় তাঁর পারিশ্রমিক ছিল কয়েক গুণ বেশি।

তাঁর কাছে এটি শুধু জনপ্রিয়তার বিষয় ছিল না; নিজের শিল্পের মূল্য সম্পর্কেও তিনি স্পষ্ট ছিলেন। তিনি জানতেন, একটি চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ দর্শক টানার অন্যতম কারণ হতে পারে।

নিজের স্টুডিও ও কাজের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। প্রযোজক, পরিচালক কিংবা অন্য সহকর্মী—কাজের জায়গায় নিজের অবস্থান নিয়ে আপস করতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না তিনি।

ব্যক্তিজীবনেও ছিল নানা বাঁক

নূরজাহানের ব্যক্তিজীবনও ছিল ঘটনাবহুল।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে বিয়ে করেন তিনি। দুজনের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্কও জড়িয়ে ছিল। তাঁদের সংসারে সন্তান আসে। পরবর্তী সময়ে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়।

১৯৫৯ সালে অভিনেতা এজাজ দুররানিকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন নূরজাহান। এরপর তাঁর অভিনয়জীবনও শেষের দিকে চলে আসে।

তবে পর্দা থেকে সরে গেলেও সংগীত থেকে সরে যাননি তিনি। বরং এরপরই তাঁর কণ্ঠ আরও স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়।

ছয় সন্তানের মা হয়েও নিজের পেশাগত পরিচয়কে আলাদা করে রেখেছিলেন নূরজাহান। পরিবার ও কাজ—দুটিই নিজের মতো করে সামলানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

ফয়েজের কবিতা, নূরজাহানের কণ্ঠ

নূরজাহানের কণ্ঠের বড় শক্তি ছিল শুধু সুর নয়, শব্দের আবেগও তুলে ধরতে পারা। এ কারণেই কবিদের সঙ্গে তাঁর কাজ বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘মুঝসে পেহলি সি মোহাব্বত’ তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছিল। প্রেম, হতাশা ও সামাজিক বোধ—সবকিছুই তাঁর গায়কিতে আলাদা আবেগ তৈরি করেছিল।

প্রেমের গান, বিরহ, গজল, লোকগীতি কিংবা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গান—বিভিন্ন ধারায় নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন নূরজাহান।

যুদ্ধের সময় কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল জাতীয় আবেগের প্রতীক

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় নূরজাহানের কণ্ঠ নতুন এক ভূমিকা নেয়। রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গান দিয়ে তিনি পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে যুদ্ধকালীন আবেগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেন।

সেই সময় তাঁর গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সংগীত-ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

নূরজাহানের কণ্ঠ তখন আর শুধু চলচ্চিত্রের নায়িকার কণ্ঠ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল জাতীয় আবেগ প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

লতা মঙ্গেশকরের আদর্শ

ভারত ও পাকিস্তানের সংগীত ইতিহাসে নূরজাহান ও লতা মঙ্গেশকরের নাম প্রায় পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে।

দুজনকে নিয়ে বহুবার তুলনা হলেও নূরজাহানের প্রতি লতা মঙ্গেশকরের শ্রদ্ধা ছিল প্রকাশ্য। লতা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকে নূরজাহানের গান শুনে তিনি বড় হয়েছেন এবং নূরজাহান তাঁর আদর্শ ছিলেন।

দেশভাগের পর দুই শিল্পীর ক্যারিয়ার দুই দেশে আলাদা পথে এগোলেও একজনের শিল্প অন্যজনের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থেকেছে।

দীর্ঘ বিরতির পর ভারতে ফেরেন

দেশভাগের কয়েক দশক পর ১৯৮২ সালে ভারতে গিয়েছিলেন নূরজাহান। এটি ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য সীমান্তপারের সফরগুলোর একটি।

তত দিনে পাকিস্তানে তিনি কিংবদন্তি। কিন্তু ভারতে তাঁর পুরোনো শ্রোতাদের স্মৃতিও তখনো অমলিন ছিল।

যে মুম্বাই একসময় তাঁকে তারকা বানিয়েছিল, যে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তিনি ক্যারিয়ারের অন্যতম উজ্জ্বল সময় কাটিয়েছিলেন, কয়েক দশক পর সেই ভূখণ্ডে ফিরলেন তিনি অন্য পরিচয়ে—পাকিস্তানের ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ হিসেবে।

প্রায় ১০ হাজার গানের কিংবদন্তি

নূরজাহানের মোট গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কোথাও কয়েক হাজার, আবার কোথাও প্রায় ১০ হাজার গানের কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানি সরকারি সূত্রেও প্রায় ১০ হাজার গানের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন নেই। উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।

তাঁর বিশেষত্ব ছিল—তিনি শুধু গান গাইতেন না, গানের চরিত্র ও আবেগকেও নিজের কণ্ঠে ধারণ করতেন। এ কারণেই তাঁর বহু পুরোনো গান আজও নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে ফিরে আসে।

শেষ পর্যন্ত সংগীতের সঙ্গেই

জীবনের শেষ দশকেও সংগীত থেকে দূরে যাননি নূরজাহান। ১৯৯৬ সালে তাঁর শেষ রেকর্ডিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে।

অর্থাৎ ছয় বছর বয়সে যে সংগীতযাত্রা শুরু হয়েছিল, জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।

২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর করাচিতে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান নূরজাহান। বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

একজন সংগীতশিল্পীর পরিবারের ছোট্ট মেয়ে থেকে শিশুশিল্পী, সেখান থেকে মুম্বাইয়ের নায়িকা; দেশভাগে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত; নতুন দেশে গিয়ে আবার নিজের সাম্রাজ্য তৈরি—নূরজাহানের জীবন যেন নিজেই একটি দীর্ঘ চলচ্চিত্র।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো একটি চলচ্চিত্র বা গান নয়। তাঁর কণ্ঠ, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের সময়ের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার গল্পই তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

আজ জন্মের শতবর্ষে তাই নূরজাহান শুধু একটি নাম নন—তিনি উপমহাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রের এক দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক।

কালের আলো /এসএ