খুঁজুন
                               
, ,
           

মেধাবী সেনা কর্মকর্তা তানজিমের মৃত্যুতে শোকগাথা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ
মেধাবী সেনা কর্মকর্তা তানজিমের মৃত্যুতে শোকগাথা

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর:

দায়িত্ব পালনের সময় কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন শহিদ লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন। চেনা জানা ভূমণ্ডল ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শে থেমে গেলো তাঁর জীবনের স্পন্দন। অনাকাঙ্খিত ও মর্মান্তিক এই মৃত্যুতে দিশেহারা তাঁর পরিবার। রুদ্ধবাক বাবা সারোয়ার জাহান। ক্ষণে ক্ষণে মুর্চ্ছা যাচ্ছেন মা নাজমা বেগম। গভীর মর্মবেদনা আর শোকাচ্ছন্ন তাঁর সহকর্মীদের হৃদয়। প্রিয় মাতৃভূমির জন্য তরুণ এই মেধাবী সেনা কর্মকর্তার আত্মত্যাগের কীর্তি জ্বলন্ত। শোকাহত আঙুলের ফাঁকে বেদনার্ত অনুভূতির মিশেলে শোকগাথা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

তাঁর আত্মত্যাগ একটি সুখী ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সংকল্পবদ্ধ হয়ে আত্মনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে

ড.মুহাম্মদ ইউনূস
প্রধান উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকার

শোকস্তব্ধ এসব মানুষের ভাষাও শোকাহত। আবার অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতেও সোচ্চার তাঁরা। ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনী এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছয় জনকে আটক করেছে। আচমকা এই মৃত্যুতে কাঁদছে দেশ। শোকাভিভূত প্রধান উপদেষ্টা ড.মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যরা। তাঁরাও প্রকাশ করেছেন বেদনার্ত অনুভূতি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানিয়েছেন গভীর সমবেদনা। গর্বিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মাঝে তাঁর স্মৃতি বেঁচে থাকবে চিরদিন।

মৃত্যু অমোঘ, চিরন্তন বাস্তবতা। প্রতিটি আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এটিই স্বাভাবিক। তবে সেই মৃত্যু যদি হয় হত্যাকাণ্ড; তবে এটিকে খুব সহজে গ্রহণ করা এতোটা সহজ বা স্বাভাবিক নয় মোটেও। একজন মানুষের মৃত্যু ধ্বংস করে দিতে পাওে গোটা পরিবারকে। যিনি মৃত্যুবরণ করলেন তিনি জানতেও পারলেন না তাঁর মৃত্যুতে পরিবার কী অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করছেন বা করবেন! বাষ্পরুদ্ধ হাহাকারে হতভাগ্য বাবা সারোয়ার জাহান তাই বলছিলেন-‘এমন মৃত্যু যেন আর কারও না হয়।’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাঁর জন্য গর্বিত

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান

টাঙ্গাইলের সন্তান লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন পাবনা ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সঙ্গে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালের ৮ জুন আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেন। জীবন উদযাপনের মন্ত্রে থিতু হওয়ার আগেই দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে তাকে। অশ্রুসিক্ত স্বজন-সহকর্মীরা মঙ্গলবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শেষ বিদায় জানান তাকে। ওইদিন সেনাবাহিনীর ১৯ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও ঘাটাইলের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ মাসীহুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা সেনাবাহিনী খুবই মর্মাহত। আমরা আমাদের একজন সহকর্মীকে হারিয়েছি। আমরা তার পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করছি। বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূর্ত প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নন্দিত নাম বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সরকারের নির্দেশে পাহাড়ে নানামুখী মানবিক কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী অপতৎপরতা বারবার রুখে দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অকুতোভয় সদস্যরা। ঝুঁকি নিয়ে আবার কখনও জীবন দিয়ে দেশপ্রেমিক সেনা সদস্যরা নিরীহ পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা রক্ষায় তৎপর থেকেছেন অহর্নিশ। নি:স্বার্থ মানসিকতার উদাহরণ তৈরি করে দায়িত্ব পালন থেকে কখনও পিছপা হয়নি। ঠিক তেমনি কক্সবাজারের চকোরিয়ায় ডাকাতির হাত থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের রক্ষায় বুকের রক্ত দিয়ে তরুণ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন প্রমাণ করলেন দেশে শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর।

মেধাবী সেনা কর্মকর্তা নির্জনের চিরস্থায়ী শুন্যতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ লিখেছেন-‘বাংলাদেশ একজন সাহসী সেনা কর্মকর্তাকে হারালো। এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।’ কোন কোন মন্তব্যে তাকে ‘প্রকৃত হিরো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে- ‘দেশের শান্তি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপনার এই ত্যাগ জাতি বিনম্র চিত্তে আজীবন স্মরণ করবে। যারা দেশের কল্যাণে প্রাণ দেয় তারা কখনও মরে না, তারা বেঁচে থাকে মানুষের অন্তরে।’

দেশমাতৃকার সেবায় তরুণ সাহসী এই সেনা কর্মকর্তার আত্মত্যাগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাঁর জন্য গর্বিত বলে জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত মঙ্গলবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও চট্টগ্রাম এরিয়া এবং বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ৩৩ পদাতিক ডিভিশন ও কুমিল্লা এরিয়া পরিদর্শনকালে সেনাপ্রধান নিজের বক্তব্যের শুরুতেই লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জনের মৃত্যুতে তাঁর মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

‘প্রিয় মাতৃভূমির প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন মহান আত্মত্যাগ করেছেন’ বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি নিহত সেনা কর্মকর্তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এক শোক বার্তায় বলেছেন, তাঁর আত্মত্যাগ একটি সুখী ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সংকল্পবদ্ধ হয়ে আত্মনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।’ মঙ্গলবার (২৪ সেপ্টেম্বর) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গণমাধ্যমে পাঠানো শোক বার্তায় এ তথ্য জানান।

শোক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুর্বৃত্তদের হামলায় লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জনের মৃত্যুতে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমি আন্তরিক সমবেদনা জানাই। একই সঙ্গে সমবেদনা জানাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আমার সব সহকর্মীর প্রতি। বাংলাদেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই তরুণ ও মেধাবী কর্মকর্তা মানুষের জান-মাল রক্ষার্থে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। দেশপ্রেমের আদর্শের নজির হিসেবে তার এ আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘নির্জনের মৃত্যুর ঘটনাটি এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়েছে যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় জনমানুষের নিরাপত্তা বিধানে দেশব্যাপী দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। দুর্বৃত্তদের হামলায় তার এ অকাল মৃত্যু শুধু সেনাবাহিনীর জন্য নয় বরং দেশের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।’

আকাশের রহস্যময় দিগন্ত পেরিয়ে স্বপ্নময় অন্তরীক্ষে শহিদ লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন। আশ্বিনের বিষণ্নতা-ভরা মায়াবী প্রকৃতিতে মৃত্যুর অমোঘ পদচিহ্ণে মাত্র ২৩ বছরের জীবনের দাঁড়ি টেনে তিনি চলে গেলেন চিরতরে। দেশের জন্য জীবন দিয়ে স্থাপন করে গেলেন দৃষ্টান্ত। জৈবিক অর্থে তিনি চলে গেলেও চৈতন্যের অনুভবে তাকে বার বার খুঁজে পাওয়া যাবে দেশপ্রেমিক প্রতিটি সেনা সদস্যের হৃদয়ের অতলান্তিক মহাসাগরে। কবিগুরুর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে তাই সবাই বলছেন- ‘তোমায় হৃদ মাঝারে রাখব ছেড়ে দিব না।’

কালের আলো/এমএএএমকে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকায় এগিয়ে এলো কাতার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে মধ্যস্থতার ভূমিকায় এগিয়ে এলো কাতার

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতার দায়িত্ব এতদিন অনেকটা এককভাবেই পালন করে এসেছে পাকিস্তান। এবার পাকিস্তানের পাশাপাশি এই ভূমিকায় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারও।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরান সফরে গিয়েছিলেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা-সংলাপ চালিয়ে যেতে আর আগ্রহী নয় যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অভিযান ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরুর ঘোষণা দেন। এদিন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত-বিনিময়ের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের (ইরান) সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না। (ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে) বৈঠক কিংবা এ জাতীয় কোনো কিছুর পরিকল্পনাও আমাদের নেই।”

তবে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন. “আমরা চাই, ইরান একটি ফলপ্রসূ আলোচনার সিদ্ধান্ত নিক। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন আমাদের এই অর্থনৈতিক অভিযান চলবে।”

ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। সেই অভিযান থেকে সূত্রপাত হওয়ার পর প্রায় ৬ মাস পেরিয়েছে যুদ্ধের। এতদিন মার্কিন এবং ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনী পরস্পরকে লক্ষ্য করে অভিযান-পাল্টা অভিযান পরিচালনা করেছে, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় দু’টি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে, আবার সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে পরস্পরকে লক্ষ্য করে অভিযানও পরিচালনা করেছে।

তবে ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণার কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে দেশটির অর্থনীতির ওপর সীমাহীন চাপ প্রয়োগের নীতি নিয়েছে ওয়াশিংটন।

এমন পরিস্থিতিতেই তেহরান সফর করলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র কাতারের প্রধামন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুলরহমান আল-থানি। ওয়াশিংটন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণার চার দিন পর তেহরানে পৌঁছে দেশটির শীর্ষ আলোচক এবং ক্ষমতসীন ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং সে বৈঠকে ইরানকে ফের কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আল-থানির এ আহ্বানের উত্তরে ঘালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা সম্পূর্ণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তেহরান ফের কূটনৈতিক আলোচনায় আসতে পারে।

আল-থানি এবং ঘালিবাফের বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নির্বাহী প্রধান মেজর জেনারেল মোহসিন রেজায়িও ছিলেন। তিনি বলেছেন, ইরান শিগগিরই হরমুজ প্রনালী খুলে দেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই আলোচনা চায়— তাহলে ইরানের হরমুজ বিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণের আগেই তা শুরু করতে হবে।

আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে কঠোর হামলা পরিচালনা করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন রেজায়ি।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
স্পিকার পক্ষপাতিত্ব করেছেন: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করার পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কটূক্তি করা হলেও স্পিকার নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেননি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেছেন, আজকে আমরা দেখলাম, স্পিকার একটু পক্ষপাতিত্ব করলেন এবং বিরোধীদলের সঙ্গে বৈষম্য করলেন।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টায় জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনের বৈঠক থেকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, স্পিকার বিরোধীদলকে ‘অসহিষ্ণু’ হিসেবে তুলে ধরারও ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অথচ গত ছয় মাসে বিরোধীদল সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছে এবং দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির আমলে বিরোধীদল যে আচরণ করেছিল, তার কিছুই কিন্তু এই বিরোধীদল করেনি। বরং গত ছয় মাস আমরা সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছি এবং সহযোগিতার কথা বলে এসেছি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, জনগণের দুর্ভোগ যখন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন জনগণের পক্ষে কথা বলা বিরোধীদলের দায়িত্ব। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণও সেটিই।

তিনি আরও বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ গত ১৮০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের ছয় মাসের পরিস্থিতির তুলনা করে জানতে চাওয়া হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে সরকার কতটা সক্ষম হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন কিনা।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে সাধারণ মানুষ ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ, হামলা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটছে। সংসদ সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব তথ্য শুধু বিরোধীদলের বক্তব্য নয়, পুলিশ সদর দফতরের তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপাত্তেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, এসব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কটূক্তি করেছেন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করা হলেও স্পিকারের ভূমিকা নিরপেক্ষ ছিল না।

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলসহ তিনটি বিল উত্থাপনের জন্য আনা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা এসব বিলের বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিচ্ছিন্নভাবে না এনে গণভোটের গণরায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে আলোচনা করা উচিত।

তিনি অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও আইনগুলো নিয়ে বিশেষ কমিটিতে আলোচনার কথা থাকলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখন সরকার নিজেদের মতো করে এসব বিল বিচ্ছিন্নভাবে সংসদে এনে পাস করানোর চেষ্টা করছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা সংসদে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দেখতে পাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। যেখানে স্পিকার ও সরকারি দল এককভাবে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।

এই পরিস্থিতির প্রতিবাদেই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বলে জানান তিনি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে বলেন, ওই পরিষদের মাধ্যমেই গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সংক্রান্ত যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতির স্বাধীনতায় উগ্রবাদ কাম্য নয়

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত। উদার ও মধ্যপন্থি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় গোড়ামি, পরমতঅসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রতার স্থান কখনো স্থায়ী হতে পারেনি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে ভয়ের ছায়া এবং অনিশ্চয়তা দানা বেঁধে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গভীর চিন্তার বিষয়।

এখানে আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে,বাংলাদেশকে বুঝতে হলে শুধু তার রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা ভূগোলের দিকে তাকালে হবে না; শুনতে হবে তার মানুষের গান, দেখতে হবে তার লোকজ উৎসব, অনুভব করতে হবে তার মাটির গন্ধ। এই দেশের নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে এসেছে ভাটিয়ালির সুর, গ্রামবাংলার উঠোনে জন্ম নিয়েছে জারি-সারি ও পালাগান, বাউলের একতারায় ধ্বনিত হয়েছে মানুষের অন্তর্গত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। মসজিদের মিনার থেকে আজানের ধ্বনি যেমন এ দেশের আকাশে মিশে আছে, তেমনি কোনো গ্রামীণ মেলায় বাঁশির সুর, কোনো মঞ্চে নাটকের সংলাপ কিংবা কোনো শিল্পীর কণ্ঠে গানও এ দেশের মানুষের জীবন ও অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বহুত্বই বাংলাদেশের সৌন্দর্য, এই সহাবস্থানই আমাদের সভ্যতার শক্তি।

আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিচর্চার বিশ্বজোড়া সুনাম রয়েছে। এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ধর্মীয় সংকীর্ণতার দেশ। বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য হলো ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সহনশীলতার সহাবস্থান। একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ হতে পারেন এবং সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা লোকসংস্কৃতির অনুরাগী হতে পারেন। ধর্মীয় চেতনা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানো তাই আমার কাছে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতারও পরিপন্থী।

তবে এখানে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—সংস্কৃতির নামে কোনো অপসংস্কৃতি, অশালীনতা, উসকানি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না। আইন ভঙ্গ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সত্যিই আপত্তিকর বা বেআইনি কিছু থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা পরীক্ষা করবে, প্রয়োজন হলে শর্ত আরোপ করবে, এমনকি আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে—এটি কোনো গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

উল্লেখ্য ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির পর জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠানটির অনুমতি বাতিল করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য ধর্মীয় আপত্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশ্নের কথাও বলা হয়েছে। প্রশাসনের এসব যুক্তি যদি বাস্তব ও আইনসম্মত হয়, সেগুলোর যথাযথ তদন্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও নিশ্চিত করতে হবে—কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক চাপ যেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল নিয়ামক হয়ে না দাঁড়ায়।

আজ কনসার্ট। কাল নাটক। পরশু সিনেমা। তার পরদিন বাউলগান। এরপর হয়তো লোকসংগীত, কবিগান কিংবা নৌকাবাইচ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি কোনো একটি গোষ্ঠীর আপত্তিকে অনুষ্ঠান বন্ধের যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একসময় প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা আসলে কার হাতে? রাষ্ট্রের হাতে, নাকি রাস্তায় সংগঠিত চাপের হাতে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল কোনো বেসরকারি আয়োজকের সমস্যা নয়; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও যদি নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শহুরে কনসার্টের বাইরেও গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি নানা চাপের মুখে পড়ছে। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র ও চেয়ার ভাঙচুরের খবর এসেছে। নেত্রকোনার মদনেও বাউলগানের আয়োজন বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে।

কারণ বাউল শুধু গান নয়। বাউল বাংলার আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের বাউলগান ২০০৮ সালে ইউনেসকোর মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ যে ঐতিহ্যকে বিশ্ব সংরক্ষণের যোগ্য মনে করছে, সেই ঐতিহ্য যদি নিজের দেশেই ভয় ও বাধার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য লজ্জার এবং আত্মসমালোচনার বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘তৌহিদী জনতা’, ‘ইমাম-ওলামা পরিষদ’সহ বিভিন্ন ব্যানারে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের দাবি ওঠার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে গত ১৫ মাসে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা এবং ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগে আরও ৩৬টি আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করছি।

কারণ সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত সবসময় মঞ্চ ভেঙে আসে না। অনেক সময় শুধু ভয় তৈরি করাই যথেষ্ট।

একজন আয়োজক যদি ভাবেন যে,অনুষ্ঠান করলে ঝামেলা হতে পারে। একজন শিল্পী যদি ভাবেন—দূরের জেলায় গিয়ে গান করা নিরাপদ তো? একজন হলমালিক যদি ভাবেন—অনুষ্ঠান বন্ধ হলে ক্ষতির দায় কে নেবে? আর প্রশাসনৎ যদি  ভাবে—অনুষ্ঠান করতে দিলে সংঘর্ষ হতে পারে। এভাবে কেউ কাউকে সরাসরি নিষেধ না করেও একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ভীত ও সংকুচিত করে ফেলা যায়।

একসময় দেখা যাবে, অনুষ্ঠান করার অনুমতি থাকলেও কেউ আয়োজন করতে চাইছেন না। মঞ্চ আছে, কিন্তু শিল্পী নেই। দর্শক আছে, কিন্তু অনুষ্ঠান নেই। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম সীমিত। তখন হয়তো কোনো পোস্টার ছিঁড়তে হবে না, কোনো মঞ্চ ভাঙতে হবে না—ভয়ই সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। সুতরাং এই ভয়ের সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি সিনেমা ভালো না লাগলে সেটি না দেখার অধিকার আমার আছে। কিন্তু অন্য একজনের সেটি দেখার অধিকারও আছে। কোনো গান আমার পছন্দ না হলে আমি সেটি শুনব না; কিন্তু অন্যের গান শোনার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আমার নেই। অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে হবে। ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা উসকানিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতির নাম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা অন্যের বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া যাবে না।

কারণ রাষ্ট্রের কাজ হলো অধিকারগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা—কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ভেটো ক্ষমতা তুলে দেওয়া নয়।

এখানে আমাদের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মীয় নিরাপত্তা-আতঙ্কের বয়ান বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা প্রশ্নের পাশাপাশি জঙ্গিবাদবিরোধী বয়ানও ছিল রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ যারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা ধরনের নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের হাতে নতুন করে কোনো অজুহাত তুলে দেওয়া আমাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বয়ান যখন প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তখন আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে—এই দেশ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু উগ্র নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন, কিন্তু অসহিষ্ণু নয়; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বহুত্ববাদবিরোধী নয়।

আর সেই বাস্তবতা প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আইনের শাসন। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। বিএনপি একটি উদার ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা বলে। অতএব সেই সরকারের আমলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে যদি একের পর এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে সেটি সরকারের জন্যও সুখকর কোনো বার্তা নয়। সরকারকে তাই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কেউ যদি শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানান, রাষ্ট্র তার কথা শুনবে। প্রয়োজন হলে আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা হবে। অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা, শব্দের মাত্রা, সময়সূচি, জনদুর্ভোগ, শালীনতা কিংবা আইনগত শর্ত—সবকিছু নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কেউ যদি হামলা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি বা জবরদস্তির মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে চায়, সেখানে রাষ্ট্রকে আপসহীন হতে হবে।

এখানে আমি মনে করি,সংস্কৃতি বিরোধী শক্তিকে দমন করার অর্থ কোনো ধর্মীয় মতকে দমন করা নয়; বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে দমন করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশকে পিছিয়ে নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টা সফল হতে দেওয়া যাবে না। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সৃজনশীল অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা যদি গান, নাটক, সিনেমা কিংবা লোকসংস্কৃতির আয়োজন নিয়েই ভয় পেতে শুরু করি, তাহলে সেটি আত্মবিশ্বাসের সংকট ছাড়া আর কিছু নয়।

এখানে সৌদি আরবের পরিবর্তনের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। ইসলামি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দেশ ভিশন ২০৩০-এর অধীনে বিনোদন ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে বিকশিত করছে। ২০১৮ সালে কয়েক দশকের বিরতির পর দেশটিতে সিনেমা হল পুনরায় চালু হয়েছে; কনসার্ট ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানও এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ। এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের সংস্কৃতিনীতি বাংলাদেশকে হুবহু অনুসরণ করতে হবে। আমি বলতে চাইছি যে—ধর্মীয় পরিচয় ও আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনের মধ্যে সমন্বয় অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

আমরা চাই ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট থাকুক। চাই মসজিদ-মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশীলন আরও শক্তিশালী হোক। একই সঙ্গে চাই নাট্যমঞ্চ প্রাণবন্ত থাকুক, সিনেমা হল সচল থাকুক, বাউল তার একতারা হাতে গান গাইতে পারেন, তরুণেরা সুস্থ সংগীতচর্চা করতে পারেন, সাহিত্য ও শিল্পচর্চা বিকশিত হোক। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই।

বরং সুস্থ সংস্কৃতি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল করে। চিন্তা করতে শেখায়। মাদক, অপরাধ ও অন্ধ উগ্রতার বিপরীতে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিসর তৈরি করে। ফলে সংস্কৃতির পথ বন্ধ করা কোনোভাবেই সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করে না।

এখন সময় এসেছে সরকারকে একটি সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করার—আইনসম্মত কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে বন্ধ করা যাবে না।

একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও দায়িত্ব রয়েছে। আয়োজকদের আইন মেনে চলতে হবে। শিল্পীদেরও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জনশৃঙ্খলার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতার স্বাধীনতা নয়।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে,বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা তৈরি পোশাক শিল্প দিয়ে তৈরি হয় না। একটি দেশের মানুষের মনন, সহনশীলতা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাও তার পরিচয়ের অংশ। সুতরাং মঞ্চ বন্ধের প্রতিটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত।

আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে শিল্পী মঞ্চে ওঠার আগে ভয় পাবেন।  আমরা এমন বাংলাদেশও চাই না, যেখানে ধর্মের নাম করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস পাবে। বরঞ্চ আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম থাকবে হৃদয়ে, সংস্কৃতি থাকবে জীবনে, আর আইন থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।

পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো  ঠাঁই নেই। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী দল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে। শিল্প ও সংস্কৃতির অবাধ পথচলা রোধ করা হলে তরুণ সমাজ পথভ্রষ্ট হবে এবং দেশীয় ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আর কোনো সাংস্কৃতিক মঞ্চ যেন ভীতি ও হুমকির মুখে বন্ধ না হয়—সরকার ও প্রশাসনকে অবিলম্বে সেই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পতিত-পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সেই পুরনো উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বয়ানই নতুন প্রাণ লাভ করবে। যা শান্তি কামি কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের কাম্য হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ নসিব করুন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।