খুঁজুন
                               
, ,
           

কর্মী সম্মেলন রূপ নিলো জনসমুদ্রে, কোনো বাধার মুখে থামতে চান না আমীরে জামায়াত

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৫, ৩:১৩ অপরাহ্ণ
কর্মী সম্মেলন রূপ নিলো জনসমুদ্রে, কোনো বাধার মুখে থামতে চান না আমীরে জামায়াত

মো.শামসুল আলম খান/আল হেলাল তালুকদার, কালের আলো, ময়মনসিংহ থেকে

অন্ধকার তাড়িয়ে ছড়িয়েছেন আলোর দ্যুতি। দেশের আর জনগণের প্রশ্নে সাহস ও পরোয়াহীন মন-মনন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের। একই সঙ্গে স্থির এবং দুর্বার। সত্য-নিষ্ঠা, ধ্যান-জ্ঞান, মানবিক গুণ, ব্যক্তিত্ব আর দেশপ্রেমে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় করে নিয়েছেন ঠাঁই। দীর্ঘদিন এমন এক নেতার শূন্যতা ছিল। তিনি ধীসম্পন্ন, চিন্তাশীল ও পূর্ণতার রাজনীতিক। গণমানুষের মনের কথক। সহজ-সরল আর প্রাঞ্জল ভাষায় মিহি জোৎস্নার মতোই আলোকময় তাঁর প্রতিটি শব্দ-বাক্য উচ্চারণ। ঠিক যেন মাটি ও মমতার যোগনিমন্ত্রণ। জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন বারবার। কিন্তু দমে যাননি। তিমির হননের এই আলোকবর্তিকা এমন এক বাংলাদেশ চান যেখানে কোনো ধরনের জুলুম হবে না, শোষণ হবে না, নিপীড়ন হবে না। নতুন করে আর জন্ম হবে না ফ্যাসিবাদের। তাঁর নেতৃত্বেই পরিবর্তনের স্বপ্ন বুনছেন দেশের সাধারণ মানুষ।

দেশের গণমানুষের কল্যাণ-মঙ্গলের মসৃণ পথ রচনায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন আমীরে জামায়াত। ইসলামের বিজয় নিশান উড়াতে চষে বেড়াচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। তাঁর প্রত্যাশার পথ কণ্টকাকীর্ণ। কিন্তু হাল ছাড়তে চান না সহজেই। ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার শপথে হয়েছেন বলীয়ান। বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত গন্তব্যের সোনালি তোরণে পৌঁছে দিতে অদম্য ডা. শফিকুর রহমান আশ^স্ত করেছেন ময়মনসিংহবাসীকে। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর মানবিক বিধান কায়েমে আমরা সকলে এক। আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের আল্লাহ এক, নবী এক। আমাদের জীবন বিধান এক। তার ভিত্তিতেই ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ব ইনশাআল্লাহ। এতে কোনো বাধা-বিপত্তি মানব না। কোনো বাধার মুখে থেমে যাব না।’

শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) সকালে ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে মহানগর ও জেলা জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল কর্মী সম্মেলন কার্যত রূপ নেয় লাখো মানুষের জনসমুদ্রে। দৃপ্তপদভারে এগিয়ে আসা জনস্রোতে দুর্দমনীয় স্পৃহা ও মানসিকতায় জাগরণের নয়া অধ্যায় রচনা করে নতুন এক অঙ্গীকারে সবাইকে একীভূত করলেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিষবাষ্পের অবসান আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ জামায়াতে ইসলামীর পঞ্চম নির্বাচিত এই আমীর নতুন পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাকে প্রস্ফুটিত করেছেন। তারুণ্যের হাত ধরেই বিজয় এসেছে যুগে যুগে। বাংলাদেশেও স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তিমূলকে উপড়ে ফেলেছে তারুণ্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের প্রথম প্রজন্মের এই প্রতিনিধি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তারুণ্যকে। বিনয়াবনত কণ্ঠেই তিনি বললেন, ‘তোমাদের কাছে আমাদের বিনয়ী অনুরোধ, বিশ্বের সকল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তরুণদের বাহুর উপর ভর করে। এমনকি জুলাই আন্দোলনও হয়েছে তাদের নেতৃত্বেই। তোমরা যে আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করেছে, সে লড়াই থেকে তোমরা বিশ্রাম নিও না, যতক্ষণ না তোমাদের দাবি পূরণ হয়। তোমরা কুরআনের বিধানকে বুকে ধারণ কর। আল্লাহর শক্তিতে বলিয়ান হয়ে অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। তোমরা হবে আগামীর নেতা আর আমরা হব তোমাদের সহকর্মী। জাতির খেদমত করার জন্য তোমাদের সুযোগ করে দিতে চাই। এগিয়ে আসো সত্য ও ন্যায়ের দিকে, ইনসাফের দিকে। এগিয়ে আসো দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।’

  • কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিলের অনুরোধ
  • আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই
  • কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়
  • ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে
  • আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার দাবি
  • সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগঠিত থাকার বার্তা

এই বিশাল কর্মী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমীর ও মর্যাদাপূর্ণ ময়মনসিংহ-৪-সদর আসনের দলীয় প্রার্থী কামরুল আহসান এমরুল। সঞ্চালনায় ছিলেন সেক্রেটারি শহীদুল্লাহ কায়সার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ড. সামীউল হক ফারুকী। সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন মহানগর নায়েবে আমীর আসাদুজ্জামান সোহেল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন, কিশোরগঞ্জ জেলা আমীর অধ্যাপক রমজান আলী, নেত্রকোনা জেলা আমীর অধ্যাপক সাদেক আহমাদ হারিছ, জামালপুর জেলা আমীর অ্যাডভোকেট আবদুল আওয়াল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আল হেলাল তালুকদার, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা বদরুল আলম, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নেতা উত্তম ভট্টাচার্য, মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি এমদাদুল ইসলাম, জুলাই আন্দোলনের শহীদ সাগরের বাবা আসাদুজ্জামান আসাদ, মাহিনের বাবা জামিল হোসেন সোহেলসহ স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের নেতারা।

আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান নিজের বক্তব্যের শুরুতে ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগরবাসীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জানতে চান তাঁরা কেমন আছেন? এরপরই তিনি বলতে শুরু করেন, ‘আজকে বাংলাদেশ একটি অঙ্গীকারে আবদ্ধ। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেই বাংলাদেশে কোনো ধরনের জুলুম হবে না, শোষণ হবে না, নিপীড়ন হবে না। নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম নিবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না, যেখানে আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হবো না, যেখানে দুর্নীতির দুর্গন্ধও থাকবে না। ঘুষের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়ে কোনো নাগরিক নীরবে কাঁদবে না। বিচারের বাণী আর নিভৃতে কাঁদবে না। কোন কোন বিচারপ্রার্থীকে আমরা দেখেছি শেষ পর্যন্ত বিচার না পেয়ে আত্মহত্যা করে। সেই চিত্র আর আমরা বাংলাদেশে দেখবো না। এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে দল-ধর্মের অধিকারের ব্যাপারে কোনো ব্যবধান থাকবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই।

বাংলাদেশকে আল্লাহর বিধান এবং সুন্নাহর ভিত্তিতে দেখতে চান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. প্রতিষ্ঠিত মদিনার নগর রাষ্ট্রটি ছিল লিখিত সংবিধানের ভিত্তিতে দুনিয়ার প্রথম আধুনিক রাষ্ট্র। এর আগে দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান ছিল না। মদিনা কেন্দ্রিক নগররাষ্ট্র থেকেই দুনিয়ার প্রথম লিখিত সংবিধানের জন্ম। এখান থেকেই হিউম্যান চার্টার্ড তৈরি হয়েছে এবং এটাকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দুনিয়ার কোনো মতবাদের নেই। মদিনার এই সনদের মাধ্যমেই সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল।’

ডা.শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতির সাথে বেঈমানী করলে সে যেই ধর্মের লোকই হোক তাকে শাস্তি পেতেই হবে। বিশ্বাসঘাতকদের দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই ক্ষমা করে না। কারণ এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। মূল সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে নবী, আপনি দুনিয়ার মানুষকে জানিয়ে দিন, তিনিই (আল্লাহ) হচ্ছেন দুনিয়ার সকল বাদশাহর মালিক। আসমান-জমিনের একক কর্তৃত্ব একমাত্র তারই।’

কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন এবং তাদের অহংকারে আমাদের মনে হয়েছিল তারা কিয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তারা দেশের মজলুম মানুষকে নিয়ে উপহাস করতেন। তারা দেশপ্রেমিক লোকদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে উল্লাস প্রকাশ করেছেন, মিষ্টি বিতরণ করেছেন। তবে তারা আল্লাহর সঠিক বিচার পেয়েছেন।’

তিনি বলেন, আমরা কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করব না। আমাদের একমাত্র ভরসা আল্লাহর ওপর। সুতরাং আমরা ভয় করব একমাত্র আল্লাহকে। আমি বলতে চাই, কেউ যেন আমাদের দিকে চোখ তুলে না তাকায়। যুগে যুগে নবী-রাসূল আলাইহিস সাল্লামগণ এবং তাদের অনুসারীগণ অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছেন, তবু কারো কাছে মাথা নত করেননি। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। ঐক্যের শক্তিতেই বিজয় আসবে ইনশাআল্লাহ। কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।’

দেশের জনগণের মাধ্যমেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে আমীরে জামায়াত বলেন, ‘সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। এজন্য আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আল্লাহর ভয়ে যে হৃদয় সিক্ত, সে কারো জীবন, সম্পদ, ইজ্জত ও সম্মানের ওপর হাত দিতে পারে না। বরং সে অন্যের পাহারাদার হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘সমাজের প্রভাবশালীদের জন্য বিচার এক ধরনের, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের; সেটি চলতে দেওয়া যাবে না, সেটি বর্তমানে অচল। প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী অপরাধী হলে তারাও পার পাবেন না। ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হয় এরা ক্ষমতায় গেলে দেশ পঙ্গু হয়ে যাবে। কারণ দেশের দুর্নীতিবাজদের হাত কাটলে তো গোট দেশটাই একটা হাত কাটা দেশে পরিণত হবে।

আমরা বলি, প্রথমে তাদের সতর্ক করা হবে, তাদের সম্মান-মর্যাদার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের বৈধ আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তারপরও যদি চুরি-ডাকাতি করে, তখন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। পেটের দায়ে যারা চুরি করবে তাদের হাত কাটা হবে না। ইসলাম তাদের আয়ের ব্যবস্থা করে দিবে। যারা বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-বীমা করার জন্য চুরি করবে তাদের প্রকাশ্যে হাত কাটার ব্যবস্থা করা হবে; যাতে গোটা দেশ এটা থেকে শিক্ষা নেয়। এরকম দুয়েকটি উদাহরণ নিশ্চিত করতে পারলে আশা করি চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে যিনার ব্যাপারেও উদাহরণ তৈরি করতে পারলে যৌন হয়রানিও বহুলাংশে বন্ধ হয়ে যাবে। মা বোনেরা নিরাপত্তা পাবেন। আল্লাহর বিধান কায়েম হলে দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীরা নির্মূল হবে। যারা সৎ ও পরিচ্ছন্নভাবে জীবন নির্বাহ করবে তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। তারা নিরাপত্তা পাবেন, মুক্ত পরিবেশ পাবেন। তাদের থাকবে না কোনো ভয়-ভীতি।’

ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে
মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সমাজকে চাঁদাবাজ মুক্ত হতে হবে, দখলদার ও সন্ত্রাস মুক্ত হতে হবে বলে মনে করেন জামায়াতের আমীর। তিনি বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করে চলে এমন একদল লোক তৈরি করতে হবে; যারা মিথ্যা কথা বলবে না, যারা মানুষকে ধোঁকা দিবে না। প্রতারণা করবে না, কারো ইজ্জতে হাত দিবে না। ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে। তবেই মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।’

প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিলের অনুরোধ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিলের অনুরোধ জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা এই সরকারের প্রতি আধা-আধি সন্তুষ্ট। এটা কোনো দলীয় সরকার নয়। তারা একমতের মানুষ নন। তাদের সকল কর্মকাণ্ড একমুখী হয় না। ফলে দেশবাসীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিছু দিন আগে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সরকারের নিকট সুপারিশমালা জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশমালায় কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী বেশকিছু বিষয় রয়েছে। তারা সমাজকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে চান, তা জাতির জন্য লজ্জাকর। তারা দেশকে এক সর্বনাশা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে চায়, আমরা তা হতে দিবনা ইনশাআল্লাহ।

আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের একটি নির্দিষ্ট কৃষ্টি-কালচার, তাহজিব-তামাদ্দুন এবং আচার-প্রথা রয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তার ব্যত্যয় ঘটতে দেওয়া হবে না। তাদের সমাজবিধ্বংসী সুপারিশমালা আমরা মানব না। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনি দেশে ফিরে প্রথমেই কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিল করুন। এই জাতীয় কমিশনে ঈদানদার মহিলাদের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে, যারা কুরআন-হাদিসের পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন।’

দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশবাসী পবিত্র রমজান মাসটি সুন্দরভাবে কাটাতে পেরেছেন। কিন্তু আবার মনে হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল হতে যাচ্ছে। সরকারের উচিত সে দিকে নজর দেওয়া। সমাজের শৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের পাকড়াও করুন। দ্রব্যমূল্যের সিন্ডিকেট ভেঙে দিন। গণহত্যা প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত বলেন, যারা গণহত্যা সংঘটিত করেছে তাদেরকে আইনের বাইরে রাখবেন না। তাদের বিচার নিশ্চিত করুন। তাদের বিচার দৃশ্যমান করুন। বিগত সাড়ে ১৫ বছরের জঞ্জাল দূর করতে পর্যাপ্ত সংস্কার করুন। কালো টাকা ও পেশিশক্তি থেকে বের হয়ে এসে সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সমানুপাতিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।’

আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার দাবি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার দাবি জানিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ‘শুনতে পাচ্ছি আগামীর সংসদ উচ্চ ও নিম্ন দুই কক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। মূল কর্তৃত্ব থাকবে নিম্ন কক্ষের হাতে; যেটা গঠিত হবে বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে। আর উচ্চ কক্ষের নির্বাচন হবে পিআর পদ্ধতিতে। দেশবাসীর প্রশ্ন উচ্চ কক্ষ যদি পিআর সিস্টেমে হয় তবে নিম্ন কক্ষ নয় কেন? আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হল আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে হতে হবে। দুনিয়ার ৬২টি দেশ পিআর সিস্টেমে নির্বাচন করে। সম্প্রতি ইউরোপ সফর করে এলাম। ইউরোপের ২৬টি দেশের মধ্যে ১৬টি দেশ পিআর সিস্টেমে নির্বাচন করে। তারা যদি এই সুফল যুগ যুগ ধরে পেয়ে থাকে এই সুফল থেকে জাতিকে বঞ্চিত করার আমরা কে? এই অধিকার জাতিকে জাতির হাতে তুলে দিতে হবে। এটি যারা মানবে না তারা হলো বিচার মানি তালগাছটা আমার। আমরা বলবো, বিচার মানুন, রায়ে তালগাছ যার তাঁর হাতে চলে যাবে। এই বিচারটি হতে হবে ন্যায় বিচার।’

দেখতে চান ইসির এসিড টেস্ট
বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাঁরা জাতিকে উদাহরণ সৃষ্টিকারী নির্বাচন উপহার দেওয়ার কথা বলছেন। আমার তাদের এসিড টেস্ট দেখতে চাই। আমরা তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, স্থানীয় সরকার না থাকার কারণে জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিন। স্থানীয় নির্বাচনের এসিড টেস্ট এর মাধ্যমে আপনাদের সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা দেখতে চাই। আপনাদের কাজে সন্তুষ্ট হলে জনগণ আপনাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে যাবে। আর যদি তার ব্যত্যয় ঘটে তবে জনগণ আপনাদের হলুদ নয় লাল কার্ড দেখাবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হলে তা আমরা কিছুতেই মানব না। আমরা ১৮ কোটি মানুষকে সুবিধা দেওয়ার পক্ষে। ঘরে ঘরে ন্যায় ও সত্যের আওয়াজ পৌঁছে দিন।’

সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগঠিত থাকার বার্তা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ময়মনসিংহের কর্মী সম্মেলন থেকে দেশবাসীকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। জাতির উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখুন। ন্যায় ও সত্যের পথে সংগঠিত থাকুন। হয়তো অপরাধীদের দমন করার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করতে আমাদেরও রাস্তায় নামতে হতে পারে। তার জন্য আপনারা তৈরি হোন এবং সতর্ক থাকুন। অতীতে যা চলেছে এখনো যদি তাই চলে তবে এত রক্ত এত জীবন গেল কেন? এত শহীদ এত আহত এত পঙ্গু তাদের কাছে আমরা কী জবাব দিব? জাতির কাছে কীভাবে মুখ দেখাব! তাই শহীদ ও আহতদের প্রতি সম্মান রেখে বাংলাদেশকে জঞ্জালমুক্ত, কলুষমুক্ত, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত, দুঃশাসনমুক্ত করার জন্য আমরা আবারও জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। অতীতের দুরাচার, স্বৈরাচার, দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের থেকে শিক্ষা নিন।’

তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘দেশের ২৮ লক্ষ কোটি টাকা কারা চুরি করেছে? ফ্যাসিবাদ পালিয়ে গেছে। এখন আর কোনো ভয় নেই। তাই নির্ভয়ে বলুন এই টাকা আওয়মী লীগ ও তাদের দোসররা চুরি করেছে। তারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে। আমরা সরকারকে বলছি পাচারকৃত সকল টাকা ফেরত আনা হোক। দুর্বৃত্তরা টাকা পয়সা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে গেছে। তাই আমি ইউরোপ সফরে গিয়ে তাদেরকে বলেছি আমাদের টাকা ফেরত পেতে সহযোগিতা করুন এবং দুর্বৃত্তদের আমাদের হাতে তুলে দিন।’

কালের আলো/এমএসএএকে/এমএএএমকে

৬৯ বছর বয়সে স্ত্রীর চিতাভস্ম সঙ্গে নিয়ে সাইকেলে বিশ্বজয়

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৮ অপরাহ্ণ
৬৯ বছর বয়সে স্ত্রীর চিতাভস্ম সঙ্গে নিয়ে সাইকেলে বিশ্বজয়

প্রিয় মানুষটিকে হারানোর পর শূন্যতা গ্রাস করেছিল জীবন। ২৫ বছরের সংসারের সঙ্গী, আত্মার বন্ধু জ্যাকিকে ক্যানসারের কাছে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন কানাডার মার্ক হার্বস্ট। কিন্তু সেই শোক তাঁকে থামিয়ে দেয়নি। বরং স্ত্রীকে দেওয়া এক প্রতিশ্রুতিই হয়ে উঠল নতুন পথচলার শক্তি। ৬৯ বছর বয়সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পৃথিবী প্রদক্ষিণে। সঙ্গে নিলেন প্রিয়তমা স্ত্রীর চিতাভস্ম। দীর্ঘ ৩২৪ দিনের সেই অভিযানে ৩০ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত গড়লেন বিশ্বরেকর্ড।

শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ নয়, মার্কের এই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্যানসার গবেষণায় সহায়তা এবং প্রবীণদের জন্য একটি বার্তাও—ইচ্ছাশক্তি থাকলে বয়স কখনোই স্বপ্নের পথে শেষ কথা নয়।

২৫ বছরের সঙ্গী হারানোর পর বদলে গেল জীবন

জ্যাকি ছিলেন মার্কের কাছে শুধু স্ত্রী নন, ছিলেন তাঁর আত্মার সঙ্গী ও সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সাত বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০২১ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা যান জ্যাকি।

প্রিয় মানুষটির মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন মার্ক। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষকে নিজের স্ত্রী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জ্যাকি আমার সবকিছু ছিল, আমার আত্মার সঙ্গী এবং আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।’ জ্যাকির অসম্পূর্ণ ইচ্ছাগুলোর কিছু পূরণ করার পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিকে বিশ্বভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্তে বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা করেন মার্ক।

ব্যাংকক থেকে শুরু, আবার সেখানেই প্রত্যাবর্তন

২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে শুরু হয় মার্কের ঐতিহাসিক যাত্রা। লক্ষ্য ছিল একটাই—সাইকেলে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা। এরপর একের পর এক দেশ পেরিয়ে এগিয়ে যান তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্র—দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে ২৫টি দেশ অতিক্রম করেন তিনি। ৩২৪ দিন পর, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর আবারও ব্যাংককের সেই জায়গায় ফিরে আসেন মার্ক। তাঁর সাইকেলের চাকা তখন ঘুরে ফেলেছে ৩০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ।

সঙ্গে ছিল জ্যাকির চিতাভস্ম

এই বিশ্বভ্রমণের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় ছিল জ্যাকির উপস্থিতি। জীবিত অবস্থায় জ্যাকি যেসব জায়গায় যেতে চেয়েছিলেন, সেসব স্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন মার্ক। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রীর চিতাভস্ম। যেসব জায়গা জ্যাকি দেখতে চেয়েছিলেন, সেখানে গিয়ে তাঁর চিতাভস্ম ছড়িয়ে দেন মার্ক। ফলে প্রতিটি গন্তব্য তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল স্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া একেকটি স্মৃতি। এক অর্থে, পৃথিবীর চারপাশে এই দীর্ঘ সাইকেলযাত্রায় মার্ক একা ছিলেন না—সঙ্গী ছিলেন তাঁর প্রিয় জ্যাকির স্মৃতিও।

রেকর্ডের চেয়ে বড় ছিল অন্য একটি লক্ষ্য

মার্কের অভিযানের উদ্দেশ্য শুধু গিনেস রেকর্ডে নাম তোলা ছিল না। ক্যানসারে স্ত্রীকে হারানোর অভিজ্ঞতা থেকেই ক্যানসার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেন তিনি। অভিযানের মাধ্যমে কানাডার প্রিন্সেস মার্গারেট ক্যানসার ফাউন্ডেশনের জন্য প্রায় ৬৮ হাজার কানাডিয়ান ডলার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর ব্যক্তিগত শোকের গল্পটি শেষ পর্যন্ত ক্যানসার গবেষণায় সহায়তার একটি উদ্যোগেও রূপ নেয়।

অচেনা মানুষ হয়ে উঠলেন আপন

হাজার হাজার কিলোমিটারের এই যাত্রায় পথের কষ্ট যেমন ছিল, তেমনি ছিল মানুষের ভালোবাসাও। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন অকৃত্রিম সহযোগিতা।

মালয়েশিয়ায় পুলিশ তাঁকে এসকর্ট দিয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় এক নারী তাঁর ক্যাফেতে রাতে থাকার সুযোগ করে দেন। আবার অনেক অপরিচিত মানুষ নিজেদের বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছেন তাঁর জন্য। কেউ দিয়েছেন খাবার, কেউ থাকার জায়গা, কেউবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। এই ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তগুলোই মার্কের দীর্ঘ অভিযানের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে।

৬৯ বছর বয়সে নতুন ইতিহাস

মার্কের এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও এসেছে। সাইকেলে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের খেতাব এখন তাঁর এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন নিউজিল্যান্ডের ৬৬ বছর বয়সী ক্রিস্টোফার বেনেট। মার্ক তাঁর চেয়ে তিন বছর বেশি বয়সে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।

তবে মার্কের গল্পে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তাঁর যাত্রার কারণ। স্ত্রীকে হারানোর বেদনা, তাঁর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া, ক্যানসার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং বয়সকে উপেক্ষা করে নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি বিশ্বভ্রমণের গল্প নয়; বরং ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি ও অদম্য মানসিক শক্তির এক অনন্য কাহিনি।

জ্যাকিকে হারানোর চার বছর পরও তাঁর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখলেন মার্ক। আর সেই যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে হাতে উঠল বিশ্বরেকর্ড—যেন প্রিয় মানুষটিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির এক প্রতীকী পূর্ণতা।

কালের আলো/জেএন

‘যৌথ অভিযান’ নয়, সমন্বয়েই জোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ
‘যৌথ অভিযান’ নয়, সমন্বয়েই জোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নতুন কোনো ‘যৌথ অভিযান’ নয়—বরং নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনারই অংশ। পুলিশ, বিজিবি, এসআরপি ও আনসার বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর এই প্রক্রিয়া সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক দমনে অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে এর পরিধি বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের ‘শুভারম্ভ ফলক’ উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি এসব কথা বলেন।

  • সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে
  • সামনে আরও জোরদারের ঘোষণা
  • আনসারের জন্য ১১ বিঘায় নতুন সদর দপ্তর

এই প্রেস ব্রিফিংয়ে তাই শুধু আনসারের নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতা নয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও একসঙ্গে সামনে এসেছে—বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম, সদস্যদের জবাবদিহি, আনসারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে ‘যৌথ অভিযান’ নিয়ে মন্ত্রীর স্পষ্টীকরণই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ—আলাদা কোনো অভিযান কাঠামোর ঘোষণা নয়, বিদ্যমান সমন্বিত ব্যবস্থাকেই আরও সক্রিয় করার কথাই বলা হয়েছে।

‘যৌথ অভিযান’ নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এর প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, একাধিক বাহিনীর সদস্যকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামানোকে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক ‘যৌথ অভিযান’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এরচেয়ে বাহিনীগুলোর নিজ নিজ সক্ষমতা ও দায়িত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে অপরাধ দমনের যে কার্যক্রম চলছে, সেটিই অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়কে কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এখানে মূল বিষয়টি অভিযানটির নাম নয়, বরং মাঠপর্যায়ে বাহিনীগুলোর সমন্বিত সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে—সেটি।

আনসারের সদর দপ্তরে বদলাচ্ছে অবকাঠামো 

প্রেস ব্রিফিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আনসার ও ভিডিপির দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটানোর উদ্যোগ। খিলগাঁওয়ে বর্তমান সদর দপ্তরের জায়গা অপর্যাপ্ত এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই বাস্তবতায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ৩ দশমিক ৪২৮ একর, অর্থাৎ প্রায় ১১ বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নতুন সদর দপ্তরের জন্য। তেজগাঁওয়ে নির্মিতব্য এই অবকাঠামোতে একটি বৃহৎ ও আধুনিক প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সদর দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা শুধু জায়গার সংকটের সঙ্গে যুক্ত নয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ বাহিনীর প্রশাসনিক কার্যক্রম, সদস্যদের অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

৬০ লাখ প্রশিক্ষিত জনশক্তির বিস্তৃতি

আনসার ও ভিডিপির জনবল কাঠামোর যে চিত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তাতে বাহিনীটির ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার ব্যাটালিয়ন আনসার ও ৬০ হাজার অঙ্গীভূত আনসার সদস্য রয়েছেন। এর বাইরে ৩৫ হাজার ভিডিপি দলনেতার অধীনে রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ প্রশিক্ষিত জনশক্তি। নিয়মিত ও অনিয়মিত সদস্য মিলিয়ে এটিকে দেশের সর্ববৃহৎ ফোর্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী।

ফলে এই বাহিনীর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে শুধু দাপ্তরিক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। মাঠপর্যায়ে এত বড় জনবল কাঠামো পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য প্রশাসনিক অবকাঠামোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের আবাসন সংকট মোকাবিলায় আশুলিয়া ও শেরেবাংলা নগরেও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অপরাধে জড়ালে বাহিনীর সদস্যরাও ছাড় পাবেন না

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি কিংবা অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ক্ষেত্রেও মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল সরাসরি। প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু প্রত্যাহার নয়, বিভাগীয় আইনি ব্যবস্থা এবং ফৌজদারি মামলা—দুই পথেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির কাঠামোকেও সামনে আনা হয়েছে। অপরাধ দমনে নিয়োজিত সদস্যের বিরুদ্ধেই যদি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার ক্ষেত্রেও প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ঢাকার ট্রাফিকে এআইয়ের ব্যবহার

রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সড়ক খনন ও নির্মাণকাজের ধরনেও পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরো সড়ক একসঙ্গে কেটে দীর্ঘ সময় ফেলে না রেখে খণ্ড খণ্ডভাবে কাজ শেষ করে দ্রুত পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর যানজটের একটি বড় উৎস সড়ক উন্নয়নকাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থাপনার এই দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিসেম্বর ঘিরে বাড়তি নজর

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্যের শেষাংশে ডিসেম্বরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস’; এ সময়ে কোনো অপশক্তিকে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। এই বক্তব্যের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদারের ঘোষণাটি একই ধারায় পড়ছে। অর্থাৎ সামনে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়কে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

দুই কোটি টাকার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ঝুলছে তালা

বগুড়া সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
দুই কোটি টাকার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ঝুলছে তালা

বগুড়ার শেরপুরে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি সাত বছরেও নিয়মিত কার্যক্রমে আসেনি। ২০১৯ সালে হস্তান্তর করা তিনতলা ভবনটির প্রধান ফটকে এখন ঝুলছে তালা। চারপাশে আগাছা, বাউন্ডারি দেয়ালের কয়েকটি অংশ ভাঙা এবং কোথাও কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক বন্ধ। ভবনের ভেতরে নিয়মিত কোনো কার্যক্রম নেই। ফটকের বাইরে ও চারপাশে আগাছা জমেছে। বাউন্ডারি দেয়ালের কয়েকটি অংশ ভেঙে গেছে। ভবনে দায়িত্বে থাকা নৈশপ্রহরী বা অন্য কোনো কর্মীকেও সেখানে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গার ওপর ভবনটি নির্মাণ করা হয়। এর চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৯৪ লাখ ৯ হাজার ২০৭ টাকা। ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মার্কেট এবং তৃতীয় তলায় অফিস, লাইব্রেরি, কনফারেন্স রুম ও মিউজিয়ামের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মার্কেটে রয়েছে ছয়টি দোকান। বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল ১ হাজার ২০০ ওয়াটের সোলার প্যানেল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কমপ্লেক্সে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাংগঠনিক ও দাফতরিক কার্যক্রম, সভা-সেমিনার, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং জাতীয় দিবসের কর্মসূচি পালনের কথা। ভবনের দোকান ও বিভিন্ন কক্ষ ভাড়া বা বরাদ্দ থেকে পাওয়া অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ তহবিলে জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে শেরপুরে বর্তমানে সেই উদ্দেশ্যে ভবনটির নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না। উপজেলা পর্যায়ে তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১৮১ জন। এর মধ্যে ৯২ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে শতাধিক জুলাই যোদ্ধা রয়েছেন।

শেরপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ভবনটি বুঝে পাওয়ার পর কমিটি না থাকায় সেখানে তেমন কোনো কার্যক্রম ছিল না। ২০২৫ সালে নতুন এডহক কমিটি হওয়ার পর কিছু দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের পর সেগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।

ভবন থেকে বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভাঙচুরের পর জেনারেটর, সোলার, পানির পাম্প, থাই গ্লাস ও বৈদ্যুতিক তার পর্যন্ত চুরি হয়েছে। স্থায়ীভাবে দেখাশোনার জন্য কেউ না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশের বাড়ির একজন ব্যক্তি ভবনটি দেখাশোনা করতেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ভবন নির্মাণের পর কিছু সময় সেখানে কার্যক্রম চললেও বর্তমানে নিয়মিত মানুষের আনাগোনা নেই। দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকায় ভবনের চারপাশ অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তারা দ্রুত ভবনটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিয়মিত কার্যক্রম চালুর দাবি জানান।

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, সম্প্রতি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি কমপ্লেক্সটি পরিদর্শন করেছেন। ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নিরূপণ করা হয়েছে। দ্রুত সংস্কার করে সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধারা বসতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জুলাই যোদ্ধাদের ওই ভবনে বসার বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি জানিয়ে ইউএনও বলেন, পুরো ভবন সংস্কারে অনেক অর্থের প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি