খুঁজুন
                               
, ,
           

খালেদা জিয়ার প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে যুগান্তকারী মুহুর্তের সূচনা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ মে, ২০২৫, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ
খালেদা জিয়ার প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে যুগান্তকারী মুহুর্তের সূচনা

কালের আলো রিপোর্ট:

বদলে গেছে রাজধানীর গুলশানের ৮০ নম্বর সড়কে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’র পরিবেশ। গত ক’দিন ধরে চলছে গোছগাছ; বাড়ির সামনের সবুজ আঙিনা সাজানো হয়েছে ফুল গাছের টব দিয়ে। ভেতরেও কক্ষগুলোতে ঝাড়পোঁছ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজও শেষ হয়েছে। আর হবেই বা না কেন, প্রায় ৪ মাস যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা শেষে এবার দেশে ফিরছেন গণতন্ত্রের আপোসহীন নেত্রী ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। উঠবেন এই ফিরোজাতেই। এরই মধ্যে দিয়ে ১১৭ দিনের প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার (০৬ মে) সকাল ১০টায় দেশের মাটিতে পা রাখবেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম জিয়া।

সোমবার (০৫ মে) স্থানীয় সময় ২টা ১০ মিনিটে যুক্তরাজ্যে জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমানের বাসা থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই গাড়ি চালিয়ে তার মাকে বিমানবন্দরে নিয়ে গেছেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার বসবাসের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে ‘ফিরোজা’।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, লন্ডনের গ্রিনিচ সময় সোমবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির দেওয়া বিশেষ রাজকীয় বিমানে (আধুনিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে) ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার এ প্রত্যাবর্তন কেবলই দেশের একজন শীর্ষ নেতার ফেরা নয়। এটি দেশের রাজনীতির যুগসন্ধিক্ষণে এক যুগান্তকারী মুহূর্তের সূচনা বলেই মনে করছেন বিএনপি’র সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এর আগে তাকে বিদায় জানাতে যুক্তরাজ্যের হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিড় করেন দলটির প্রবাসী নেতাকর্মীরা।

এর আগে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৭ জানুয়ারি রাত ১১টা ৪৬ মিনিটে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন খালেদা জিয়া। পরদিন বাংলাদেশ সময় বিকেল ২টা ৫৮ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে অবতরণ করে খালেদা জিয়াকে বহনকারী রয়েল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি। এরপর তাকে সেখান থেকে সরাসরি ‘লন্ডন ক্লিনিকে’ নিয়ে ভর্তি করা হয়। ১৭ দিনের ক্লিনিক-পর্ব শেষে তাকে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

  • দেশের মাটিতে পা রাখবেন আজ সকাল ১০ টায়
  • ‘ফিরোজা’কেও প্রস্তুত করা হয়েছে নতুনরূপে
  • উৎফুল্ল নেতাকর্মীরা পথে পথে জানাবেন স্বাগত
  • শাহজালালে তিন স্তরের নিরাপত্তা, ডিএমপির ১০ নির্দেশনা

দলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, ১১৭ দিনের দীর্ঘ অনুপস্থিতি শেষে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার মধ্যে দিয়ে ফিরোজার অপেক্ষার প্রহরও শেষ হচ্ছে। খালেদা জিয়ার জন্য পথ চেয়ে থাকা ফিরোজার যেন আর তর সইছে না। নেতাকর্মীদের হৃদয়ে বাজছে প্রত্যাবর্তনের ঘণ্টা। প্রিয় নেত্রীর এ ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজনীতির আকাশে আবারও ভেসে বেড়াচ্ছে অজস্র আশা, সম্ভাবনা ও নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্ন, বলছেন দলের নেতাকর্মীরা।

ফিরোজার পরিবেশ বর্ণনা করে দলটির উচ্ছ্বসিত এক নেতা বলছিলেন, ধোয়া-মোছা আর সাজসজ্জায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ও এখন জ্বলজ্বল করছে। সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে বাসভবনের ভেতরে-বাইরে জ্বলে উঠছে অসংখ্য বাতি। এ যেন দলের নেতাকর্মীদের কাছে প্রিয় নেত্রীর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফেরারই আশার আলো।

দলীয় প্রধানকে অভ্যর্থনা জানাতে বিএনপির পক্ষ থেকে নানামাত্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষত, খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরার খবরে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। জুবাইদার এই প্রত্যাবর্তনে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্যরকম চাঙ্গা ভাব বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমানও দেশে ফেরার পথে খালেদা জিয়ার সঙ্গী হচ্ছেন। যদিও বিগত বছরগুলোতে শামিলা রহমান বিভিন্ন সময়ই দেশে অবস্থান করেছেন। সেদিক থেকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দেশত্যাগের পর এবারই প্রথম দেশে ফিরতে পারছেন জুবাইদা।

যুক্তরাজ্য স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নাসির আহমেদ শাহীন জানান, লন্ডন সময় সোমবার বিকাল সাড়ে চারটার দিকে হিথ্রো বিমানবন্দর ছেড়ে গেছে খালেদা জিয়াকে বহনকারী কাতারের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। খালেদা জিয়ার সঙ্গে মোট ১৩ জন দেশে যাচ্ছেন। নির্ধারিত সময়েই সব কিছু সম্পন্ন হয়েছে।

উৎফুল্ল নেতাকর্মীরা পথে পথে জানাবেন স্বাগত
দীর্ঘদিন পর খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা নিয়ে নেতাকর্মীরা উৎফুল্ল। বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ পর্যন্ত পথে পথে তাকে স্বাগত জানাবেন নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে বড় প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে দলটি। বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কারা কোথায় অবস্থান নেবেন, তারা কী করতে পারবেন, কী করতে পারবেন না-সে বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

রবিবার (৪ মে) দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দেশে ফিরবেন খালেদা জিয়া। নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে লা মেরিডিয়ান হোটেল পর্যন্ত অবস্থান করবে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি। ছাত্রদল অবস্থান করবে লা মেরিডিয়ান হোটেল থেকে খিলক্ষেত পর্যন্ত। যুবদল থাকবে খিলক্ষেত থেকে হোটেল র‌্যাডিসন পর্যন্ত। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি অবস্থান করবে হোটেল র‌্যাডিসন থেকে আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত। স্বেচ্ছাসেবক দল অবস্থান করবে আর্মি স্টেডিয়াম থেকে বনানী কবরস্থান পর্যন্ত। কৃষক দল থাকবে বনানী কবরস্থান থেকে কাকলী মোড় পর্যন্ত। শ্রমিক দল অবস্থান নেবে কাকলী মোড় থেকে বনানীর শেরাটন হোটেল পর্যন্ত। ওলামা দল, তাঁতি দল, জাসাস ও মৎস্যজীবী দল অবস্থান করবে শেরাটন হোটেল থেকে বনানী কাঁচাবাজার পর্যন্ত। মুক্তিযোদ্ধা দলসহ সব পেশাজীবী সংগঠন অবস্থান করবে বনানী কাঁচাবাজার থেকে গুলশান-২ পর্যন্ত। মহিলা দল অবস্থান করবে গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বর থেকে গুলশান অ্যাভিনিউ রোড পর্যন্ত। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যরা গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বর থেকে গুলশান অ্যাভিনিউ পর্যন্ত থাকবেন।’

শাহজালালে তিন স্তরের নিরাপত্তা, ডিএমপির ১০ নির্দেশনা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিন স্তরের নিরাপত্তা সুরক্ষায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হবেন। তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ইংল্যান্ডের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে তাকে বহনকারী কাতারের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি মঙ্গলবার (৬ মে) সকাল সাড়ে ১০টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।

অবতরণের পরপরই খালেদা জিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে নিয়ে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে করে বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার গেট দিয়ে বের হবেন। এদিন তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিএনপিসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী বিমানবন্দর থেকে গুলশানে তার বাসা পর্যন্ত উপস্থিত থাকবেন। চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের ভিড় সামলানো ও তার নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মঞ্জুর কবীর ভুঁইয়া জানান, হ্যাঙ্গার গেট সংলগ্ন এলাকায় এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স, ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার অ্যাক্টে নিয়োজিত বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ মোতায়েন থাকবে। তিনি আরও জানান, নিরাপত্তায় কোনও ঘাটতি হবে না। তাকে বহনকারী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি অবতরণের পর শতভাগ নিরাপত্তায় তিনি বিমানবন্দর ত্যাগ করতে পারবেন।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক একাধিক বাহিনীর সঙ্গে ডিএমপির পুলিশও মোতায়েন থাকবে। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত রাস্তায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও কঠোরভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।’

এদিকে, দলীয় নেতাকর্মীদের বিপুল উপস্থিতির আশঙ্কায় ঢাকা মহানগরীতে জনসমাগম ও যান চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। একইসঙ্গে, সুষ্ঠু ট্রাফিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য নাগরিকদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সোমবার (৬ মে) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া শাখা থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ডিএমপি জানায়, মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসা শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে সড়কে যানজট সৃষ্টি হতে পারে। এ উপলক্ষে সাধারণের যান চলাচলে নিম্ন নির্দেশনা মানার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ডিএমপির ১০ নির্দেশনায় বলা হয়েছে- মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জনসাধারণকে গুলশান-বনানী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তায় অবস্থান না করে ফুটপাতে অবস্থান করার জন্য অনুরোধ করা হলো। সংশ্লিষ্ট দলের নেতৃবৃন্দকে আগত জনসাধারণকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফুটপাতে অবস্থান করানোর জন্য প্রয়োজনীয় স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করা হলো।

মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গুলশান-বনানী থেকে উত্তরা পর্যন্ত সড়ক যথাসম্ভব পরিহার করে বিকল্প রাস্তা হিসেবে নিম্নোক্ত রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ- ক. আব্দুল্লাপুর কামারপাড়া-ধউর ব্রিজ-পঞ্চবটী-মিরপুর বেড়িবাঁধ দিয়ে গাবতলী হয়ে চলাচল করা; খ. ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করা; গ. উত্তরা ও মিরপুরে বসবাসকারী নাগরিকদের বিমানবন্দর সড়ক ব্যবহার না করে বিকল্প হিসেবে হাউজ বিল্ডিং-জমজম টাওয়ার-১২ নম্বর সেক্টর খালপাড়-মেট্রোরেল উত্তরা উত্তর স্টেশন-উত্তরা সেন্টার স্টেশন-মিরপুর ডিওএইচএস হয়ে চলাচল এবং উত্তরা সেন্টার স্টেশন থেকে ১৮ নম্বর সেক্টর-পঞ্চবটী হয়ে মিরপুর বেড়িবাঁধ দিয়ে চলাচল করতে পারেন; ঘ. গুলশান, বাড্ডা এবং প্রগতি সরণি এলাকার যাত্রী সাধারণ কাকলী, গুলশান-২, কামাল আতাতুর্ক সড়কের পরিবর্তে গুলশান-১/পুলিশ প্লাজা-আমতলী-মহাখালী হয়ে মহাখালী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন র‌্যাম্প ব্যবহার করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে এয়ারপোর্ট/উত্তরা যেতে পারেন; ঙ. মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইলগামী যানবাহনগুলো মিরপুর-গাবতলী রোড হয়ে চলাচল করতে পারে; চ. বিমানবন্দর/৩০০ ফুট রাস্তা থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনগুলো বনানী/কাকলী র‌্যাম্পের পরিবর্তে মহাখালী র‌্যাম্প/এফডিসি র‌্যাম্প ব্যবহার করতে পারেন।

এছাড়া ডিএমপির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ ঢাকা সেনানিবাসের রাস্তা (জিয়া কলোনি/জাহাঙ্গীর গেট/সৈনিক ক্লাব/স্টাফ রোড) সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শুধু হালকা যানবাহন গমনাগমনের অনুমতি প্রদান করেছে। সুতরাং সেনানিবাসের রাস্তা ব্যবহার করতে পারেন।

কালের আলো/আরআই/এমকে

শিশুদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে নতুন নিয়ম

সোশ্যাল মিডিয়া ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
শিশুদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে নতুন নিয়ম

শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে বড় ধরনের আইনি চাপের মুখে পড়েছে Meta Platforms। যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের করা মামলায় প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় যেতে সম্মত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মামলার কেন্দ্রে ছিল-১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হয়েছে এবং ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেটা যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না।

তবে সমঝোতায় রাজি হলেও কোনো অন্যায় করার কথা স্বীকার করেনি মেটা।

মামলার পেছনে কী অভিযোগ?

প্রায় ৩০ বছর পুরোনো মার্কিন শিশু অনলাইন গোপনীয়তা আইনের আওতায় মামলাটি করা হয়। অভিযোগ ছিল, শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেটার নীতিমালা ও কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

মামলার শুনানি শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় সমঝোতার সিদ্ধান্ত আসে। মেটার প্রধান নির্বাহী Mark Zuckerberg সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই বিচার কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়।

মামলায় সাবেক মেটা কর্মী ও হুইসেলব্লোয়ার আর্তুরো বেজার দাবি করেন, তিনি শিশুদের অনলাইন ক্ষতির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কিশোরদের জন্য নতুন নিয়ম

সমঝোতার অংশ হিসেবে কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বেশ কিছু নতুন বিধিনিষেধ চালুর পরিকল্পনা করেছে মেটা।

নতুন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • দিনে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার;
  • রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নোটিফিকেশন বন্ধ;
  • স্কুল চলাকালে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নোটিফিকেশন বন্ধ;
  • কিশোরদের পোস্টে কে লাইক দিয়েছে, তা অন্যদের দেখানো হবে না;
  • শিশু ও কিশোর ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে।

তবে মেসেজ আদান-প্রদানের সময় দৈনিক দুই ঘণ্টার ব্যবহারের হিসাবের মধ্যে ধরা হবে না।

মেটা জানিয়েছে, বেশিরভাগ নতুন নিয়ম আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবহারকারীর বয়স শনাক্ত করার নতুন ব্যবস্থা চালু করতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

শুধু মেটা নয়, চাপ বাড়তে পারে অন্য প্ল্যাটফর্মেও

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে এই আইনি লড়াই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপের একটি বড় উদাহরণ।

মেটার পাশাপাশি TikTok ও Snap Inc.-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপরও একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে।

বিশেষ করে শিশুদের বয়স যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

এক ট্রিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিও ছিল

মেটা মামলায় হেরে গেলে সম্ভাব্য জরিমানার অঙ্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কিছু হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ জরিমানা এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারত।

সেই তুলনায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা মেটার জন্য বড় অঙ্ক হলেও সম্ভাব্য সর্বোচ্চ আইনি ক্ষতির তুলনায় অনেক কম।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নতুন নিয়মগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?

সাবেক ইনস্টাগ্রাম কর্মী আর্তুরো বেজারের মতে, শুধু নতুন নিয়ম চালু করাই যথেষ্ট নয়। এসব ব্যবস্থায় শিশু-কিশোরদের অনলাইন অভিজ্ঞতা সত্যিই নিরাপদ হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু কতক্ষণ তারা অনলাইনে থাকছে-এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। তারা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তাদের তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে-এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/এসএ

আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের ড্র, পিএসজির হ্যাটট্রিক অভিযানের শুরু

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের ড্র, পিএসজির হ্যাটট্রিক অভিযানের শুরু

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন ৩৬ দলের কাঠামোয় টানা দুই মৌসুমই শিরোপা জিতেছে ফরাসি ক্লাব Paris Saint-Germain (পিএসজি)। এবার হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে আগামী মাসে অভিযান শুরু করবে লুইস এনরিকের দল। তবে নতুন মৌসুমের ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে। বাছাইপর্বের প্লে-অফ শেষ হয়েছে গতকাল রাতে। আজ অনুষ্ঠিত হবে লিগ পর্বের ড্র।

বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১০টায় মোনাকোর গ্রিমালদি ফোরামে হবে এই ড্র। গত দুই মৌসুমের মতো এবারও আলাদা কোনো গ্রুপ থাকবে না। লিগ পর্বে প্রতিটি দল খেলবে আটটি ভিন্ন দলের বিপক্ষে। কোন দলের বিপক্ষে খেলবে এবং কোন ম্যাচটি ঘরের মাঠে, কোনটি প্রতিপক্ষের মাঠে হবে—ড্রয়ের মাধ্যমে তা নির্ধারিত হবে।

ক্লাবগুলোকে উয়েফার কো-এফিশিয়েন্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে চারটি পটে ভাগ করা হবে।

যেভাবে হবে ড্র

প্রথমে প্রথম পট থেকে ম্যানুয়ালি একটি দলের নাম লেখা বল তোলা হবে। এরপর বিশেষ সফটওয়্যার তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করবে ওই দলের আট প্রতিপক্ষ এবং কোন দলের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ও কোন দলের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলবে।

এভাবে প্রথম পটের দলগুলোর প্রতিপক্ষ নির্ধারণের পর দ্বিতীয় পট, তৃতীয় পট এবং সবশেষে চতুর্থ পটের দলগুলোর ড্র সম্পন্ন হবে।

প্রতিটি দল চারটি পট থেকেই দুটি করে প্রতিপক্ষ পাবে। তবে একই দেশের দুটি ক্লাব একে অপরের বিপক্ষে খেলতে পারবে না। একই সঙ্গে একটি দল সর্বোচ্চ দুটি ভিন্ন দেশের ক্লাবের বিপক্ষে খেলতে পারবে।

সরাসরি সুযোগ পেয়েছে ২৯ ক্লাব

ঘরোয়া লিগের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ২৯টি ক্লাব সরাসরি লিগ পর্বে জায়গা পেয়েছে। বাকি সাতটি দল এসেছে বাছাইপর্ব পেরিয়ে।

ইংল্যান্ড

আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, অ্যাস্টন ভিলা ও লিভারপুল।

স্পেন

বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, ভিয়ারিয়াল, আতলেতিকো মাদ্রিদ ও রিয়াল বেতিস।

ইতালি

ইন্টার মিলান, নাপোলি, রোমা ও কোমো।

জার্মানি

বায়ার্ন মিউনিখ, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, লাইপজিগ ও স্টুটগার্ট।

ফ্রান্স

পিএসজি, লাঁস ও লিল।

পর্তুগাল

পোর্তো ও স্পোর্তিং সিপি।

নেদারল্যান্ডস

পিএসভি ও ফেইনুর্ড।

অন্যান্য

বেলজিয়ামের ব্রুগা, তুরস্কের গালাতাসারাই, ইউক্রেনের শাখতার এবং চেক প্রজাতন্ত্রের স্লাভিয়া প্রাগ।

প্লে-অফ পেরিয়ে আসা সাত দল

বাছাইপর্বের প্লে-অফ শেষে লিগ পর্বের টিকিট পেয়েছে সাবাহ (আজারবাইজান), বোডো/গ্লিমট (নরওয়ে), লাস্ক (অস্ট্রিয়া), এইকে এথেন্স (গ্রিস) অথবা লেভস্কি সোফিয়া (বুলগেরিয়া), ভাইকিং (নরওয়ে) অথবা দিনামো জাগরেব (ক্রোয়েশিয়া), সেলিয়ে (স্লোভেনিয়া) অথবা স্লোভান ব্রাতিস্লাভা (স্লোভাকিয়া) এবং লিওঁ (ফ্রান্স) অথবা ফেনেরবাচে (তুরস্ক)।

কোন ক্লাব কোন পটে থাকবে, সেটি বাংলাদেশ সময় আজ দুপুরে কো-এফিশিয়েন্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হবে। এরপর রাতের ড্রতেই পরিষ্কার হবে ইউরোপসেরা হওয়ার পথে কার সামনে কোন আট প্রতিপক্ষ।

কালের আলো/এসএ

গান-কবিতার বাইরে চলচ্চিত্রেও নজরুল ছিলেন বহুমুখী এক স্রষ্টা

শিল্প সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
গান-কবিতার বাইরে চলচ্চিত্রেও নজরুল ছিলেন বহুমুখী এক স্রষ্টা

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য’—কাজী নজরুল ইসলামের এই বহুল উচ্চারিত পঙ্‌ক্তি যেন তাঁর সমগ্র শিল্পীসত্তারই প্রতিচ্ছবি। এক হাতে প্রেম, সৌন্দর্য ও মানবতার বাঁশি; অন্য হাতে অন্যায়, শোষণ ও অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের তূর্য।

বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলকে আমরা প্রধানত কবি ও গীতিকার হিসেবেই চিনি। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল আরও অনেক বিস্তৃত। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সাংবাদিকতার পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তিনি ছিলেন এক অসাধারণ বহুমুখী শিল্পী।

চলচ্চিত্রে তিনি কখনো অভিনেতা, কখনো পরিচালক, কখনো কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার, আবার কখনো গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। এমনকি শিল্পীদের গান শেখানো, উচ্চারণ ঠিক করা এবং অভিনয়ের প্রস্তুতিতেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতেন। গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন তালিকায় দেখা যায়, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০–২১টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুলের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

চলচ্চিত্রে নজরুলের প্রবেশ: শুধু গান নয়, সবকিছুতেই

ত্রিশের দশকে কলকাতার চলচ্চিত্রজগৎ তখন সবাক সিনেমার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। এই সময় পার্সি মালিকানাধীন ম্যাডান থিয়েটার্সে নজরুল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হন। ‘সুর ভাণ্ডারী’ বা ‘সুর ভাঙারি’ হিসেবে তাঁর কাজের মধ্যে ছিল চলচ্চিত্রের শিল্পীদের গান শেখানো, সুর ও উচ্চারণ ঠিক করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গান ও সংগীত নিয়ে কাজ করা।

অর্থাৎ, চলচ্চিত্রে নজরুলের ভূমিকা শুরু থেকেই কেবল ‘গান লিখে দেওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একটি সিনেমার দৃশ্য, চরিত্র, সংলাপ, গান ও অভিনয়—সবকিছুর সমন্বিত শিল্পরূপ নিয়ে তিনি ভাবতেন।

ম্যাডান থিয়েটার্সের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার সময় ‘জ্যোৎস্নার রাত’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘ঋষির প্রেম’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘চিরকুমারী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘কলঙ্ক ভঞ্জন’, ‘রাধাকৃষ্ণ’ ও ‘জয়দেব’-এর মতো চলচ্চিত্রের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়।

‘ধ্রুব’: একই সিনেমায় অভিনেতা, পরিচালক ও সুরকার

নজরুলের চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোর একটি ‘ধ্রুব’। গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে নির্মিত এই পৌরাণিক চলচ্চিত্রটি ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পায়। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির পরিচালনায় ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দে ও কাজী নজরুল ইসলাম, প্রযোজনা করেছিল পাইওনিয়ার ফিল্মস এবং সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল।

এই সিনেমায় নজরুল নিজেই অভিনয় করেন দেবর্ষি নারদ চরিত্রে।

আর এখানেই তাঁর অভিনবত্ব।

পুরাণের নারদকে সাধারণত জটাধারী, দীর্ঘ দাড়ি-গোঁফওয়ালা বয়স্ক ঋষি হিসেবে দেখানো হলেও নজরুলের নারদ ছিলেন তরুণ, সুদর্শন ও প্রাণবন্ত। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গলায় মালা, পরনে লম্বা পোশাক—পর্দায় তাঁর উপস্থিতি সে সময় দর্শকের কাছে ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

তাঁর এই রূপ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল। কিন্তু নজরুল নিজের শিল্পীসত্তার ব্যাখ্যায় অনড় ছিলেন—তিনি নারদের ‘চিরতরুণ ও চিরসুন্দর’ রূপ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

‘ধ্রুব’-এর সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য

‘ধ্রুব’ শুধু নজরুলের অভিনয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; সংগীতের দিক থেকেও এটি অসাধারণ।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির ১৮টি গানের মধ্যে ১৭টি গানই নজরুল রচনা ও সুর করেন। তিনি নিজেও ছবিতে গান করেন।

অর্থাৎ একই চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন—

পরিচালক + অভিনেতা + গীতিকার + সুরকার + সংগীত পরিচালক + কণ্ঠশিল্পী।

বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগে একজন শিল্পীর এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই সঙ্গে পালন করা নিঃসন্দেহে নজরুলের অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ।

‘ধূপছায়া’: ক্যামেরার পেছনে নজরুল

‘ধ্রুব’-এর পাশাপাশি নজরুল নিজে ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এই ছবিতে তিনি দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রেও অভিনয় করেন। বিভিন্ন গবেষণামূলক সূত্রে ‘ধূপছায়া’কে নজরুলের পরিচালিত চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলচ্চিত্র গবেষকদের একাংশের মতে, নজরুলই ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলিম চলচ্চিত্র পরিচালক। ফলে তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনার ইতিহাস শুধু নজরুল-গবেষণার জন্য নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম সবাক যুগেও নজরুল

বাংলা চলচ্চিত্র যখন সবাক যুগে প্রবেশ করছে, তখনও নজরুল সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন।

১৯৩১ সালে অমর চৌধুরী পরিচালিত ‘জামাইষষ্ঠী’ চলচ্চিত্রে তিনি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে ‘জলসা’ চলচ্চিত্রে নিজের গান গাওয়ার পাশাপাশি ‘নারী’ কবিতা আবৃত্তি করেন।

অর্থাৎ চলচ্চিত্রে শব্দের ব্যবহার যখন একেবারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তখন নজরুল সাহিত্য ও সংগীতের অভিজ্ঞতাকে সিনেমার নতুন ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছিলেন।

‘পাতালপুরী’: বাস্তব জীবন থেকে সিনেমার গান

১৯৩৫ সালের ‘পাতালপুরী চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন নজরুল। ছবির বিষয় ছিল কয়লাখনি অঞ্চলের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম।

নজরুলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করলে তিনি সেটিকে দূর থেকে কল্পনা করে থেমে থাকতেন না। বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করতেন।

‘পাতালপুরী’র ক্ষেত্রেও কয়লাখনি অঞ্চলের জীবন সম্পর্কে জানতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকসংগীতের আবহ, বিশেষ করে ঝুমুরের সুর, তাঁর সৃষ্টিতে জায়গা করে নেয়।

এই প্রবণতা থেকেই বোঝা যায়, নজরুলের চলচ্চিত্রসংগীত ছিল কেবল স্টুডিওনির্ভর নয়; তিনি পরিবেশ, মানুষ ও জীবন থেকে সংগীতের উপাদান সংগ্রহ করতেন।

‘গ্রহের ফের’, ‘গৃহদাহ’ থেকে ‘বিদ্যাপতি’

চলচ্চিত্রে নজরুলের কাজের পরিধি দ্রুত বাড়তে থাকে।

‘গৃহদাহ’-এ তিনি সুরকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের সংগীতের সঙ্গে রাইচাঁদ বড়ালও যুক্ত ছিলেন।

১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’-এও নজরুল সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে কাজ করেন।

কিন্তু একই সময়ের ‘বিদ্যাপতি’ তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের আরেকটি বড় অধ্যায়।

‘বিদ্যাপতি’: সাহিত্য, ইতিহাস ও সংগীতের মেলবন্ধন

মধ্যযুগের মৈথিলি কবি বিদ্যাপতির জীবন ও কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে দেবকী বসুর পরিচালনায় নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’।

ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির গল্পের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের নাম যুক্ত; চিত্রনাট্য/স্ক্রিনপ্লেতে দেবকী বসুর সঙ্গে তাঁরও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

ছবিটিতে অভিনয় করেন পাহাড়ি সান্যাল, কানন দেবী, ছায়া দেবী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়সহ সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা। ছবিটি বাংলা ও হিন্দি-দুই ভাষাতেই নির্মিত হয়।

‘বিদ্যাপতি’র সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কবিতা ও সংগীতকে গল্প বলার অংশ করে তোলা। বিদ্যাপতির পদাবলির আবেগ, প্রেম ও ভক্তিকে চলচ্চিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নজরুলের সাহিত্যিক ও সংগীতবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলা সংস্করণ সফল হওয়ার পর হিন্দি সংস্করণও নির্মিত হয়। ফলে নজরুলের সৃষ্টিশীলতা বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছেও পৌঁছে যায়।

‘গোরা’: রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে নজরুলের ঐতিহাসিক ভূমিকা

১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পান নজরুল।

এখানে ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা।

ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহারের ধরন নিয়ে আপত্তি উঠলে নজরুল সরাসরি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কবিগুরু তাঁকে সমর্থন করেন এবং তাঁর গান ব্যবহারের ক্ষেত্রে নজরুলের সংগীতবোধের ওপর আস্থা রাখেন।

এই ঘটনা শুধু নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের পারস্পরিক শ্রদ্ধার উদাহরণ নয়; বাংলা সংস্কৃতির দুই প্রধান স্রষ্টার মধ্যে সৃজনশীল স্বাধীনতা ও পারস্পরিক আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও এটি স্মরণীয়।

‘সাপুড়ে’: গবেষণা করে সিনেমার গল্প

১৯৩৯ সালের ‘সাপুড়ে’ নজরুলের চলচ্চিত্রজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ছবিটির গল্পের সঙ্গে নজরুলের নাম যুক্ত এবং পরিচালনা করেন দেবকী বসু। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভও ছবিটির গল্পের কৃতিত্ব নজরুলকে দিয়েছে।

এই ছবির জন্য নজরুল বেদে সম্প্রদায়ের জীবন সম্পর্কে কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি কিছু সময় বেদে দলের সঙ্গে থেকেছেন—এমন তথ্য বিভিন্ন জীবনী ও চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখায় পাওয়া যায়।

এখানেও তাঁর কাজের ধরনটি লক্ষ করার মতো।

তিনি আগে জীবনকে দেখেছেন, তারপর সেটিকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন।

‘মদিনা’: অসুস্থতার কারণে থেমে গেল এক অসমাপ্ত স্বপ্ন

চলচ্চিত্রে নজরুলের সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায়গুলোর একটি ‘মদিনা

১৯৪১-৪২ সালের দিকে এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, গান, সুর ও সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ছবিটির জন্য প্রায় ১৫টি গান লেখার কথাও জানা যায়।

কিন্তু ১৯৪২ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নজরুল। তাঁর অসুস্থতার কারণে ‘মদিনা’ আর মুক্তির আলো দেখতে পারেনি।

এ যেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া একটি সম্ভাবনা—নজরুলের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র-স্বপ্নের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়।

‘চৌরঙ্গী’ ও ‘দিলরুবা’

১৯৪২ সালে ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন নজরুল। পরবর্তী হিন্দি সংস্করণের জন্যও তাঁর লেখা গান ব্যবহৃত হয়।

‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গেও গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততার উল্লেখ পাওয়া যায়।

এ সময়ের কাজগুলো দেখলে বোঝা যায়, অসুস্থতার আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিল।

চলচ্চিত্র ব্যবসাতেও নজরুল

শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রের প্রযোজনা ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও নজরুল প্রবেশ করেছিলেন।

১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বেরসহ আরও অনেকে।

অর্থাৎ নজরুল শুধু সিনেমার সৃজনশীল দিক নয়, চলচ্চিত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক কাঠামো নিয়েও ভাবছিলেন।

নজরুলের চলচ্চিত্রযাত্রা কতটা বিস্তৃত ছিল?

নজরুলের সঙ্গে যুক্ত চলচ্চিত্রের সঠিক সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণামূলক তালিকা মিলিয়ে দেখা যায়, তিনি প্রায় ২০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

  • জলসা
  • ধূপছায়া
  • প্রহ্লাদ
  • বিষ্ণুমায়া
  • ধ্রুব
  • পাতালপুরী
  • গ্রহের ফের
  • বিদ্যাপতি (বাংলা ও হিন্দি)
  • গোরা
  • নন্দিনী
  • সাপুড়ে
  • সাপেড়া
  • চৌরঙ্গী
  • দিকশূল
  • অভিনয় নয়সহ আরও কিছু চলচ্চিত্র।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে প্রায় ৫০টি নজরুলগীতি ব্যবহৃত হয়েছিল।

পর্দায় নজরুলের গান: মৃত্যুর পরও অমলিন

১৯৭৬ সালে নজরুলের জীবনাবসান হলেও চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি শেষ হয়নি। বরং তাঁর গান ও সাহিত্যকর্ম পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বারবার আকৃষ্ট করেছে।

‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’-তে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর ব্যবহার দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

‘লায়লা-মজনু’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রেও তাঁর গান ব্যবহৃত হয়েছে।

নজরুলের গান চলচ্চিত্রে শুধু ‘গান’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; অনেক সময় তা চরিত্রের আবেগ, দৃশ্যের নাটকীয়তা এবং গল্পের বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।

নজরুলের গল্প-উপন্যাসও উঠেছে বড় পর্দায়

শুধু গান নয়, তাঁর সাহিত্যও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

২০০৬ সালে নজরুলের গল্প ‘মেহের নেগার’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। মৌসুমী ও ফেরদৌস অভিনীত এই ছবিটি নজরুলের গল্পকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।

এ ছাড়া তাঁর ‘রাক্ষসী’, ‘জ্বিনের বাদশাহ’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

শিশুদের জন্য তাঁর ‘লিচু-চোর’ ও ‘খুকী ও কাঠবেরালি’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হারিয়ে যাচ্ছে ‘ধ্রুব’-চলচ্চিত্র সংরক্ষণেও এক বড় ক্ষতি

নজরুলের চলচ্চিত্র-ঐতিহ্যের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়গুলোর একটি হলো তাঁর পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘ধ্রুব’-এর সংরক্ষণ।

মূল ছবিটি ছিল সাদা-কালো ৩৫ মিমি চলচ্চিত্র। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রটির মূল নেগেটিভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণ ছবি আর সহজলভ্য নেই; কেবল কিছু অংশ টিকে থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

এটি শুধু নজরুল-গবেষকদের জন্য নয়, উপমহাদেশের চলচ্চিত্র-ইতিহাসের জন্যও বড় ক্ষতি। কারণ ‘ধ্রুব’ আমাদের জানায়—বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগেই একজন কবি কীভাবে একই সঙ্গে পরিচালক, অভিনেতা ও সংগীতস্রষ্টার ভূমিকা পালন করেছিলেন।

কেন চলচ্চিত্রের নজরুল এত গুরুত্বপূর্ণ?

নজরুলের চলচ্চিত্রকর্মকে শুধু তাঁর জীবনের একটি ‘অতিরিক্ত অধ্যায়’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন—

প্রথমত, সাহিত্য ও সংগীতকে দৃশ্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, পৌরাণিক কাহিনি থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের জীবন—বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করেছিলেন।

তৃতীয়ত, লোকসংগীত ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে চলচ্চিত্রের সংগীতে ব্যবহার করেছিলেন।

চতুর্থত, বাস্তব জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গল্প ও সংগীত নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন।

পঞ্চমত, অভিনয়, পরিচালনা ও সংগীত—তিনটি ক্ষেত্রেই নিজেকে পরীক্ষা করেছিলেন।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি চলচ্চিত্রকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ করেননি। একজন মুসলিম কবি হয়েও তিনি হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক ‘ধ্রুব’-তে নারদ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তার গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় তাঁর সামগ্রিক মানবতাবাদী দর্শনেরই প্রতিফলন।

কবির পরিচয়ের বাইরে যে নজরুলকে আমরা কম দেখি

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা বিদ্রোহী কবি বলি, প্রেমের কবি বলি, সাম্যের কবি বলি। তাঁকে গানের স্রষ্টা হিসেবেও জানি। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নজরুল ছিলেন আরও অনেক কিছু।

তিনি ছিলেন অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, প্রশিক্ষক এবং প্রযোজনা-উদ্যোক্তা।

আর তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—তিনি কোনো একটি পরিচয়ে নিজেকে আটকে রাখেননি।

তাঁর অস্থিরতা ছিল সৃষ্টির অস্থিরতা। নতুন কিছু করার তাগিদ তাঁকে কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো মঞ্চে, আবার কখনো ক্যামেরার সামনে কিংবা পেছনে নিয়ে গেছে।

তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নজরুলকে শুধু ‘চলচ্চিত্রের গীতিকার’ হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিশাল একটি অংশ অদেখাই থেকে যায়।

বরং তাঁকে দেখা উচিত বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর যুগের একজন বহুমুখী, নিরীক্ষাপ্রবণ ও আধুনিক চিন্তার শিল্পী হিসেবে—যিনি কবিতার শব্দ, গানের সুর, অভিনয়ের শরীর এবং ক্যামেরার ভাষাকে একই সৃষ্টিশীল জগতে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

নজরুলের বাঁশরী যেমন প্রেমের কথা বলেছে, তাঁর রণ-তূর্য যেমন বিদ্রোহের ডাক দিয়েছে—তেমনি তাঁর চলচ্চিত্রকর্মও বাংলা সংস্কৃতির বহুত্ব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।

কালের আলো/এসএ