পাঁচ চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি, পুনরুদ্ধারে আশার আলো
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিলেও তা এখনো নাজুক। একদিকে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা, দুর্বল রফতানি এবং ব্যাংক খাতের সংকট অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে পুনরুদ্ধারের গতি বাড়াতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি : এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা জরুরি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে। আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা গতি ফিরলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার তুলনায় এই হার এখনো কম।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, চাপ কাটেনি
অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি এখনো মূল্যস্ফীতি। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে। তবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ রয়ে গেছে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির দামের চাপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সাম্প্রতিক প্রবণতাকে স্থায়ী করাই এখন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কাজ।
রেমিট্যান্সে স্বস্তি, রিজার্ভেও শক্তি
বৈদেশিক খাত অবশ্য অর্থনীতির জন্য তুলনামূলক স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। জুন শেষে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে। মে শেষে এই পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানেই রিজার্ভে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। এ কারণে রফতানি বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও জরুরি বলে মনে করছে এমসিসিআই।
রফতানিতে বড় প্রবৃদ্ধি নেই
রেমিট্যান্সে ইতিবাচক চিত্র থাকলেও রফতানি খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। জুনে রফতানি আয় বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থবছর শেষে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির। এমন পরিস্থিতিতে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন বাজার তৈরি এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা, সরকারের ঋণ বাড়ছে
অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থনীতির এই চিত্রে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে দুর্বল চাহিদার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি না ফিরলে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা কঠিন হবে। তাই ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাত থেকে কার্যকর ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়েও সংকট
সরকারের রাজস্ব আদায় ও উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্রও অর্থনীতির দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ কম। একই সময়ে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে। এক দশকের মধ্যে এ হার সর্বনিম্ন। ফলে রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি—দুই দিক থেকেই সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও ব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত
বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক হিসাবে অবশ্য বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে এর বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থবছর শেষে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। আরও উদ্বেগের বিষয়, নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই কমেছে ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থবছর শেষে নিট এফডিআই নেমে এসেছে মাত্র ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক খাতকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও বিনিয়োগ ও রফতানির দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সামনে মূল কাজ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙা করা
এমসিসিআইয়ের মূল্যায়নে সামগ্রিক চিত্রটি তাই মিশ্র। বৈদেশিক খাতে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের উন্নতি অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও আগের বছরের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি—বিনিয়োগ, বেসরকারি ঋণ, উৎপাদন ও ভোক্তা চাহিদা—এখনো দুর্বল। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ শুধু স্থিতিশীলতা ধরে রাখা নয়, বরং সেই স্থিতিশীলতাকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া। এজন্য মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, রফতানিতে গতি ফেরানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এমসিসিআইয়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, পুনরুদ্ধারের দরজা খুলতে শুরু করেছে। এখন সেই দরজা দিয়ে অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array