খুঁজুন
                               
, ,
           

ফ্যাসিবাদের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হার না মানা জামায়াত আমির

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৫, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
ফ্যাসিবাদের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হার না মানা জামায়াত আমির

মো.শামসুল আলম খান, কালের আলো:

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনীতিতে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে কখনও এই দলটি রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে পারেনি। রাজনীতির প্রয়োজনে বিএনপির সঙ্গে যৌথভাবে অবশ্য কিছু সমাবেশে করেছিল সোহরাওয়ার্দীতে। দলটির একক সমাবেশ ছিল কেবলই বায়তুল মোকাররম, পল্টন ময়দানসহ বিভিন্ন জায়গায়। এবারই প্রথম শনিবার (১৯ জুলাই) ‘সাত দফা’ দাবিতে এককভাবে জাতীয় সমাবেশ করলো দলটি। ইতিহাসে প্রথমবার এই সমাবেশের মাধ্যমে রাজনীতিতে রীতিমতো নতুন ইতিহাস তৈরি করলো তাঁরা। জানান দিলো নিজেদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা। কর্মী-সমর্থকদের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে বহি:প্রকাশ ঘটালো নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিমত্তার। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও জামায়াতের এই জাতীয় সমাবেশের মাধ্যমে একটি নতুন বার্তা পেয়েছে। জাতীয় সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন- ‘পুরোনো ব্যবস্থাপত্রে বাংলাদেশ আর চলবে না।’ অমিত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করলেন-‘আগামীর বাংলাদেশে আরেকটা লড়াই হবে, ইনশাআল্লাহ। একটা লড়াই হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, আরেকটা লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইনশাআল্লাহ। এই দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার জন্য যা দরকার, আমরা তারুণ্য এবং যৌবনের শক্তিকে একত্রিত করে সেই লড়াইয়েও জিতব ইনশাআল্লাহ।’

আমিরে জামায়াত যে লড়াইয়ের ঘোষণা দিলেন তিনি যে সেই লড়াইয়ের অগ্রভাগেই থাকবেন এবং তাঁর দৃঢ় মনোবল ও অসীম সাহস রয়েছে সেই প্রমাণও মিলেছে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ এই সমাবেশে। জাতীয় সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময় অসুস্থ হয়েই মঞ্চে লুটিয়ে পড়েছিলেন তিনি। বিকেল ৫টা ২২ মিনিটের দিকে তিনি বুকে হাত দিয়ে প্রথম দফায় মঞ্চে লুটিয়ে পড়েন। দু:সহ গরমে বক্তব্য দিতে গিয়ে মোট দুই দফায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পাশে থাকা নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ফেলেন। এর মিনিট খানেক বাদে জামায়াত আমির উঠে দাঁড়ান এবং আবার বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু আবারও পড়ে যান তিনি। এ সময় দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘গরমের জন্য আমিরে জামায়াত সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসকরা বলেছেন, তার আর বক্তব্য দেওয়া ঠিক হবে না।’ কিন্তু যার সাহস অতুলনীয়, দেশপ্রেম যার অস্থিমজ্জায় গ্রোথিত তিনি কী আর বিচলিত হতে পারেন? কারও কথা না শোনে মঞ্চে ডায়াসের পাশে পা মেলে বসে বক্তব্য দিলেন তিনি। এসময় তার পাশে চিকিৎসকদেরও দেখা গেছে। বসে বসেই প্রায় ১০ মিনিট বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়েই শেষ হয় দলটির ‘জাতীয় সমাবেশ’। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে রাজধানীতে জামায়াতের স্মরণকালের বিশাল এই জনসমুদ্র আদতে দেশের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। আমিরে জামায়াতের স্বপ্নপূরণের লড়াইয়ের দৃঢ়তা দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলার শক্তি-সাহসে করবে আরও দুর্বার এমনটিই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন রাজধানীতে বড় বড় সমাবেশ করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বিভিন্ন ইস্যুতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করেছে। বিএনপি নয়াপল্টনে কয়েক দফা সমাবেশ করলেও জামায়াতে ইসলামী কেবল কারাবন্দি নেতা (বর্তমানে মুক্ত) এ টি এম আজহারুল ইসলামের মুক্তির দাবিতে পুরানা পল্টন মোড়ে একটি সমাবেশ করেছিল। তবে এবারই প্রথম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইসলামী দলগুলো ও অন্যান্য সমমনা দলগুলোর ঐক্যকে আরও সুসংহত করতে এবং ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনতার অভূতপূর্ব এক জাগরণ ঘটিয়ে ভোটের মাঠে প্রকৃত ফ্যাক্টর হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলো। পাল্টে দিলো রাজনীতির হিসাব-নিকাশ।

জাতীয় সমাবেশে বক্তৃতার সময় হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার পর জামায়াত আমিরকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর রাত ৯টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতাল থেকে হেঁটে বের হন তিনি। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতির জন্য মনের কথাগুলো আল্লাহর ইচ্ছায় পুরো বলতে পারিনি। যারা আমার অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন হয়েছেন ও দোয়া করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি সবসময় চেয়েছি- আমার দ্বারা যেন এই দেশ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু জামায়াত নয়, সব রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। কারণ, দেশ যদি দুর্নীতিমুক্ত না হয়, তাহলে কোনো কিছুই সঠিকভাবে এগোবে না।’

নতুন ব্যবস্থায় নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার ডাক


জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, ‘যাদের ত্যাগ এবং কুরবানির বিনিময়ে, স্বৈরাচারের কঠিন অন্ধকার যুগের যাঁতাতলে পিষ্ঠ হয়ে যারা তিলে তিলে দুনিয়া থেকে নির্যাতিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন, অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিদায় নিয়েছেন, যারা লড়াই করে আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন; আমরা তাদের সবার কাছে গভীরভাবে ঋণী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, আল্লাহ যেন তাদের ঋণ পরিশোধ করার শক্তিটাও ততদিন আমাদের দান করেন।’

‘শহীদ আবু সাঈদরা যদি বুক পেতে না দাঁড়াতো, এ জাতির মুক্তির জন্য যদি বুকে গুলি লুফে না নিত, হয়তো আজকের এই বাংলাদেশটা আমরা দেখতাম না। ইতোমধ্যে হয়তো আরও অনেক মানুষের জীবন ফ্যাসিবাদীদের হাতে চলে যেত। ২৪-এ জীবনবাজি রেখে যুদ্ধটা যদি না হতো তাহলে আজকে যারা বিভিন্ন ধরনের কথা এবং দাবি-দাওয়া পেশ করছেন, তারা তখন কোথায় থাকতেন?’

জামায়াতের আমির বলেন, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালার এই নেয়ামত পাওয়া তাদের যেন অবজ্ঞা এবং অবহেলা না করি। শিশু বলে তাদের যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করি। অহংকারে অন্য দলকে যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করি। অরাজনৈতিক ভাষায় আমরা যেন কথা না বলি। যদি এগুলো আমরা পরিহার করতে না পারি, তাহলে বুঝতে হবে যারা পারবেন, ফ্যাসিবাদের রোগ তাদের মধ্যে নতুন করে বাসা বেঁধেছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা করে জাতীয় ঐক্যের বীজতলাটা আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে তৈরি করবো ইনশাআল্লাহ।

ডায়াসের পাশে বসে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যত সময় হায়াত দিয়েছেন, তত সময় মানুষের জন্য লড়াই করবো ইনশাআল্লাহ। এ লড়াই বন্ধ হবে না। বাংলার মানুষের মুক্তি অর্জন হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। বলছিলাম, জামায়াতে ইসলামী যদি আল্লাহর ইচ্ছা এবং জনগণের ভালোবাসায়, বাংলাদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়, তাহলে মালিক হবে না, সেবক হবে ইনশাআল্লাহ।’

‘লক্ষ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যদি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে, তাহলে কোনো এমপি, কোনো মন্ত্রী আগামীতে সরকারি প্লট গ্রহণ করবে না। কোনো এমপি ও কোনো মন্ত্রী ট্যাক্সবিহীন কোনো গাড়ি চড়বে না। কোনো এমপি ও কোনো মন্ত্রী তার নিজের হাতে কোনো টাকা চালাচালি করবে না। কোনো এমপি ও কোনো মন্ত্রী যদি তার নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য বরাদ্দ পেয়ে থাকেন, কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সামনে তারা তার প্রতিবেদন তুলে ধরতে বাধ্য হবেন’- যোগ করেন তিনি।

আমিরে জামায়াত বলেন, ‘চাঁদা আমরা নেব না, দুর্নীতি আমরা করবো না। চাঁদা আমরা নিতে দেব না, দুর্নীতি আমরা সহ্য করবো না। আজীবন সবার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছি, জেল-জুলুমের পরোয়া করি নাই। আমার আফসোস, ২৪ সালে জাতিকে মুক্তি দিতে গিয়ে যারা জীবন দিয়ে শহীদ হলো-আমি তাদের একজন হতে পারলাম না। আপনাদের কাছে দোয়া চাই, ইনসাফের ভিত্তিতে একটি দেশ গড়ে তোলার জন্য আগামীতে যে লড়াই হবে, আমার আল্লাহ যেন সেই লড়াইয়ে আমাকে একজন শহীদ হিসেবে কবুল করেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রিয় শহীদ নেতৃবৃন্দ, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে, শাপলা গণহত্যা, সারাদেশের গণহত্যা, চব্বিশের গণহত্যা যারা করেছে, তাদের সবার বিচার বাংলাদেশের মাটিতে নিশ্চিত করতে হবে। এদের বিচারের দৃশ্যমান প্রক্রিয়া শুরু না করা পর্যন্ত পুরানো ব্যবস্থাপত্রে বাংলাদেশ আর চলবে না।’

জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘এতগুলা মানুষ এমনি এমনি জীবন দেয়নি। জীবন দিয়েছে জাতির মুক্তির জন্য। যদি পুরোনো সবকিছুই টিকে থাকবে, তাহলে কেন তারা জীবন দিয়েছিল? যারা ওই বস্তাপঁচা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে আবার নিতে চান, তাদের আমরা বলি, জুলাইযুদ্ধ করে যারা জীবন দিয়েছে আগে তাদের জীবনটা ফেরত এনে দেন। যদি শক্তি থাকে ফেরত এনে দেন। আপনারা পারবেন না। যেহেতু পারবেন না, কাজেই নতুন ব্যবস্থায় নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে ইনশাআল্লাহ।’

জাতীয় সমাবেশ যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম। সমাবেশে অন্যান্য দলের নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনূস আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, গণ আন্দোলনের সময় রংপুরে নিহত আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী, নেজামে ইসলামী পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, রফিকুল ইসলাম খান। জামায়াত নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ঢাকা মহনগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

জীবন সায়াহ্নে আড্ডায় খুঁজে পান বেঁচে থাকার আনন্দ

গাইবান্ধা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ণ
জীবন সায়াহ্নে আড্ডায় খুঁজে পান বেঁচে থাকার আনন্দ

বয়স বাড়ে, কর্মজীবন থেমে যায়, কমে আসে ব্যস্ততা। যে মানুষটি একসময় পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের নানা কাজে ছুটে বেড়িয়েছেন, জীবনের এক পর্যায়ে তাকেই খুঁজতে হয় কথা বলার একজন মানুষ, একটু আড্ডা কিংবা পুরোনো দিনের গল্প শোনার কোনো আপন ঠিকানা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সেই ঠিকানাই নিজেদের জন্য তৈরি করেছেন একদল প্রবীণ। নাম দিয়েছেন ‘বেলা শেষের যাত্রী’।

সন্ধ্যা নামলেই উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চৈতন্য বাজারের একটি ছোট্ট টিনের ঘরে জড়ো হন তারা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে গল্প। কখনো মুড়িমাখা, কখনো চানাচুর-ঝাল। কেউ পত্রিকা পড়েন, কেউ প্রথম যৌবনের স্মৃতি মনে করে গান ধরেন। আবার কেউ নাটকের সংলাপ শুনিয়ে মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। চাকরিজীবনের স্মৃতি, জীবনের পাওয়া-না পাওয়া কিংবা ফেলে আসা মানুষের গল্পও ফিরে আসে সেই আড্ডায়।

‘এসো বন্ধুরা, জীবনের পড়ন্ত বিকালে ফেলে আসা অতীত জীবনের গল্প করি’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১৯ সালে পাঁচজন সদস্য নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সদস্যসংখ্যা ৪০ ছাড়িয়েছে।

বিআরডিবির অবসরপ্রাপ্ত উপপরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল ও তাঁর কয়েকজন সমবয়সী বন্ধুর উদ্যোগে শুরু হয় এ পথচলা। কর্মজীবন শেষে তিনি উপলব্ধি করেন, অবসরের সঙ্গে শুধু অফিসের ব্যস্ততাই শেষ হয় না; অনেক সময় কমে যায় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও।

সেই শূন্যতা থেকেই নিজেদের বয়সী মানুষদের নিয়ে একটি মিলনস্থল তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। এরপর একে একে যুক্ত হন শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, চিকিৎসক, কৃষি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।

সংগঠনের সবচেয়ে কম বয়সী সদস্যের বয়সও ষাটোর্ধ্ব। অধিকাংশ সদস্যের বয়স ৬৫ থেকে ৭৪ বছরের মধ্যে। এরই মধ্যে পাঁচজন সদস্য মারা গেছেন। তাদের অনুপস্থিতিও এখন আড্ডার গল্পের অংশ হয়ে আছে।

বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, এ আয়োজনের মাধ্যমে একাকিত্ব ও অবহেলার অনুভূতি দূরে সরে যায়। বেঁচে থাকার জন্য নতুন উদ্যম পাওয়া যায়। মনে হয়, ‘আছি তো আমরাও।’ আনন্দ ও মানসিক শক্তি পাওয়া যায়, ভালো লাগা তৈরি হয়।

এই আড্ডার গভীরতা হয়তো এখানেই। এখানে কেউ কারও কাছে বয়স লুকান না। বরং বয়সের সঙ্গে জমে থাকা স্মৃতিগুলোই পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নেন। ব্যস্ত জীবনে যে কথাগুলো বলা হয়নি, যে গল্পগুলো শোনার মানুষ পাওয়া যায়নি, সেগুলোই সন্ধ্যার পর জায়গা করে নেয় ছোট্ট ঘরটিতে।

কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সংগঠক কঙ্কন সরকার বলেন, প্রবীণ মানেই অবহেলার মানুষ নন। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা সমাজের বড় সম্পদ। কর্মজীবন শেষ হলেও একজন মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। এই বয়সে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কথা বলার জায়গা, আপনজনের সঙ্গ এবং নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ।

তিনি বলেন, ‘বেলা শেষের যাত্রী’ সেই জায়গাটিই তৈরি করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়লে প্রবীণদের একাকিত্ব কমবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ পাবে।

তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু বলেন, প্রবীণরা আমাদের সমাজের অভিজ্ঞতার বাতিঘর। তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নতুন প্রজন্মকে অনেক কিছু শেখাতে পারে। ‘বেলা শেষের যাত্রী’র মতো উদ্যোগ তাদের একাকিত্ব দূর করার পাশাপাশি পারস্পরিক বন্ধনও শক্তিশালী করছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে।

পাঁচজনকে নিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগটি এখন ৪০ জনের বেশি প্রবীণের মিলনস্থল। তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়—দিনের শেষে কয়েকটি পরিচিত মুখ, কিছু গল্প, একটু হাসি আর মন খুলে কথা বলার সুযোগ।

জীবনের বেলা হয়তো পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। কিন্তু তাদের আড্ডায় এখনো সন্ধ্যা নামে গল্প, গান আর হাসি নিয়ে। ‘বেলা শেষের যাত্রী’ তাই শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; বয়সের শেষ প্রান্তেও মানুষ যে সঙ্গ, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার আনন্দ ভাগ করে নিতে চায়, এটি তারই এক জীবন্ত গল্প।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

বাউফলে নদীভাঙনে বিলীনের পথে গ্রাম, ঝুঁকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

পটুয়াখালী সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৮ অপরাহ্ণ
বাউফলে নদীভাঙনে বিলীনের পথে গ্রাম, ঝুঁকিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তেঁতুলিয়া ও লোহালিয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ধুলিয়া, নাজিরপুর, কারখানা ও কাছিপাড়া ইউনিয়নের একের পর এক এলাকা বিলীন হওয়ার পথে। বর্ষা ও জোয়ারের পানির তীব্র স্রোতে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের শত শত মানুষ।

কাছিপাড়া ইউনিয়নে কারখানা নদীর ভাঙনে যেকোনো সময় বিলীন হতে পারে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে চররঘুনাথদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর তীর থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫ ফুট। এছাড়া হিসাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীর তীর থেকে বিদ্যালয় দুটির দূরত্ব যথাক্রমে ৭০ থেকে ৮০ ফুট।

স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে যেভাবে নদীভাঙন বাড়ছে, তাতে বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের প্রায় ৫০ ফুট জায়গা গত এক মাসেই নদীতে বিলীন হয়েছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নোমান বলেন, নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দ্রুত বিদ্যালয় রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সে।

কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনীল চন্দ্র দাস বলেন, বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গত বছর বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন কিছুটা ঠেকানো হলেও প্রায় এক মাস আগে আবার ৫০ ফুট জায়গা নদীতে বিলীন হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি মসজিদ ও বাজারও হুমকির মুখে পড়বে। বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার মতো আশপাশে কোনো জায়গা নেই বলেও জানান তিনি।

এদিকে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে ধুলিয়া ইউনিয়নের আয়তনও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ধুলিয়া লঞ্চঘাট, স্থানীয় লঞ্চঘাট বাজার, হাজারো একর ফসলি জমি ও শত শত বসতবাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে সাইক্লোন শেল্টারসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ ও সেতু নির্মাণের দাবিতে ধুলিয়ায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানববন্ধনও হয়েছে। ইউএনও সালেহ আহমেদ ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই ব্লক দিয়ে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে নাজিরপুর ইউনিয়নের বড় ডালিমা, নিমদী, কচুয়া ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতভিটা, আবাদি জমি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কাঁচা-পাকা সড়ক ও বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে বহু পরিবার অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

নাজিরপুর ইউনিয়নের ধানদী পয়েন্টসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভাঙন রোধে সম্প্রতি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ইউএনও সালেহ আহমেদ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদও এলাকা পরিদর্শন করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন।

নদীভাঙনে যোগাযোগব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একের পর এক বসতঘর নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

ভাঙনকবলিত মানুষের অভিযোগ, বছরের পর বছর জিও ব্যাগ ফেলা ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষার আশ্বাস দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। স্থায়ী সিসি ব্লক বাঁধ নির্মাণের দাবিতে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হলে এসব এলাকা বাউফলের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙনকবলিত এলাকায় বার্জের মাধ্যমে বালুর বস্তা ফেলা হবে। এতে বস্তাগুলো পরিকল্পিতভাবে একটির ওপর আরেকটি বসানো সম্ভব হবে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থায়ী হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

ঢেউয়ের প্রেমে যেন অন্যরকম এক পারশা

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৮ অপরাহ্ণ
ঢেউয়ের প্রেমে যেন অন্যরকম এক পারশা

সংগীত ও অভিনয়ে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন তরুণ শিল্পী পারশা মাহজাবীন পূর্ণী। কাজের ব্যস্ততার বাইরে এবার মালদ্বীপের নীল সমুদ্র আর স্বচ্ছ জলের পুলে দেখা মিলেছে তার একেবারে ভিন্ন আবহের।

মালদ্বীপ ভ্রমণের বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন পারশা। কখনো সমুদ্রের নীল জলের মাঝে, কখনো সাগরের ঢেউয়ের পাশে, আবার কখনো সুইমিংপুলে—বিভিন্ন মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দী হয়েছেন এই তরুণ গায়িকা ও অভিনেত্রী।

ঢেউয়ের প্রেমে মুগ্ধ পারশা

প্রকাশিত ছবিগুলোর একটিতে পানিতে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার দিকে মৃদু হাসিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় পারশাকে। অন্য একটি ছবিতে কালো সাঁতারের পোশাকে সানগ্লাস পরা অবস্থায় সুইমিংপুলে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছেন তিনি।

সমুদ্রের নীল জল, আকাশ আর পারশার সাবলীল উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ছবিগুলোতে তৈরি হয়েছে ছুটির দিনের এক নির্মল আবহ। একটি ছবির ক্যাপশনে পারশা লিখেছেন, ‘ঢেউয়ের প্রেমে মুগ্ধ!’

নতুন লুকেই নজর কাড়লেন

মালদ্বীপের অবকাশযাপনের এসব ছবিতে পারশার পোশাক, চুলের স্টাইল ও স্বাভাবিক অভিব্যক্তি আলাদা করে নজর কেড়েছে। বিশেষ করে পানিতে তোলা ছবিগুলো প্রকাশের পর তার নতুন লুক নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে অনুরাগীদের মধ্যে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যঘরেও ভক্তদের প্রশংসা চোখে পড়ছে। কেউ তার লুকের প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ মালদ্বীপের সৌন্দর্যের সঙ্গে পারশার উপস্থিতির সমন্বয়কে দারুণ বলে মন্তব্য করেছেন।

গান থেকে অভিনয়—বহুমুখী পারশা

শুধু গানের জগতেই নয়, অভিনয়েও নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন পারশা মাহজাবীন। সংগীত ও অভিনয়—দুই অঙ্গনেই কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি বাড়াচ্ছেন তিনি।

আর এবার কাজের খবরের বাইরে মালদ্বীপের নীল জলরাশির মাঝে তার এই ভিন্নধর্মী উপস্থিতি ভক্তদের সামনে তুলে ধরল পারশার অন্য এক অবকাশযাপনের মুহূর্ত। ছবিগুলো প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলো নিয়ে চলছে আলোচনা।

কালের আলো/জেএন