খাল পুনঃখননে শুধু মাটি কাটা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার: বিআইপি
দেশের খাল পুনঃখনন কার্যক্রমকে কেবল মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্লানার্স (বিআইপি)।
সংগঠনটি বলছে, খাল পুনঃখননকে বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না; এর সঙ্গে জাতীয় জলাশয় পুনরুদ্ধার, অববাহিকাভিত্তিক পানিব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার (৯ মে) রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে অবস্থিত বিআইপি কনফারেন্স হলে ‘খাল পুনঃখনন কর্মসূচি: পানিব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন ও স্থানিক পরিকল্পনার প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এসব বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পরিকল্পনাবিদ ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান এবং যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেন প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল, লেক, জলাভূমি ও নিম্নভূমি শুধু পানি ধারণের স্থান নয়; বরং কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা এবং জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র প্রকৌশলগত বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানিক পরিকল্পনা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
আরিফুল ইসলাম বলেন, সরকারের খাল পুনঃখনন কর্মসূচি একটি সময়োপযোগী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ হলেও এটিকে শুধু মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না। খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে জাতীয় জলাশয় পরিকল্পনা, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংরক্ষণ, নগর জলাবদ্ধতা নিরসন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, কৃষি ও মৎস্য উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিআইপির অবস্থান তুলে ধরে আরিফুল ইসলাম বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে এ কর্মসূচিকে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩-২০৫০), বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এবং স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা সম্ভব হলে পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফলাফল অর্জন করা যাবে। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে জাতীয় জলাশয় পুনরুদ্ধার, জলবায়ু অভিযোজন ও টেকসই স্থানিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একইসঙ্গে বিআইপি কারিগরি সহায়তা, নীতিগত পরামর্শ, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা, দূর অনুধাবন প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ, অংশীজন পরামর্শ এবং পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রণয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
বিআইপির সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ; একসময় গ্রামবাংলার পরিচয় ছিল নদী, খাল, বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়কেন্দ্রিক। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এসব জলাভূমি আজ সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভূমির কার্যকর ও পরিকল্পিত ব্যবহারে ব্যর্থতাকে দায়ী করেন মেহেদী আহসান। তিনি বলেন, শহর ও গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে খাল-বিল ভরাট করে বসতবাড়ি, বাজার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধ্বংস হয়েছে।
মেহেদী আহসান বলেন, দেশের নদী ও খালগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো- আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনার জটিলতা। উজানে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। ফলে একসময় শুষ্ক মৌসুমেও যেসব নদীতে পানির প্রবাহ দেখা যেত, বর্তমানে সেসব নদীতে বর্ষা মৌসুমের সীমিত সময় ছাড়া পানি প্রবাহ প্রায় অনুপস্থিত। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও অধিকাংশ নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের অন্তত আরও সাতটি মন্ত্রণালয়কে এ কাজে সম্পৃক্ত করা দরকার। খাল খননকে লাভজনক প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রমের বাইরে এনে পরিবেশ ও নগর সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন খাল ভরাট করে যারা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি খাল পুনঃখনন কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে ১১ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরে। প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পানিসম্পদ পরিকল্পনা প্রণয়ন, নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা, দূর অনুধাবন প্রযুক্তি, লেজারভিত্তিক উচ্চতা নির্ণয় প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের জরিপের মাধ্যমে নিয়মিত ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ চালু, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনার সঙ্গে পুনঃখনন কর্মসূচির সমন্বয়, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন, পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা, পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, মাটির গুণমান পরীক্ষা, খালের পাড়ে বাস্তুতান্ত্রিক সুরক্ষা অঞ্চল নিশ্চিত করা, কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল ও নাগরিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা চালু, পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত করা এবং দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array