এআই সড়কের শেষ দাওয়া!
চলতি মাসে পাইলট প্রকল্প শুরুর পর রাজধানীতে এরই মধ্যে এআই ক্যামেরায় ধারণ করা প্রযুক্তিতে দুই হাজারের বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ আশাবাদী হলেও সড়কে শৃঙ্খলা আনা এবং যানজট সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন গাড়িচালকরা। এক্সপ্রেসওয়েতে ক্যামেরা দিয়ে ওভারস্পিড শনাক্ত করে মামলা আরও আগে শুরু হলেও ঢাকায় এআই প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া শুরু হয়েছে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে।
কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে সড়কে বহুমুখী সংকটের কথা। তাদের মতে, লাইসেন্সধারী এবং নিবন্ধিত যানবাহন কঠোর আইন ও নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আটকা পড়ছে। কিন্তু অনিবন্ধিতরা থেকে যাচ্ছে অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ সড়কে সমস্যার অন্যতম কারণ লাইসেন্সবিহীন চালক আর অনিবন্ধিত যানবাহন। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়কের ১০টি পয়েন্টে এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ক্যামেরা ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে পুলিশ।
বাংলাদেশে সাধারণত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং মামলা দেওয়া হয়। হাতে লেখা স্লিপ দিয়ে মামলা শুরু হলেও এরপর ধাপে ধাপে পজ মেশিন ব্যবহার থেকে এখন এআই বেইজড ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম চালু হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত এ সড়কে এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্তের পর মামলা দেওয়া হয়। এখন পাঁচ ধরনের অপরাধ শনাক্ত করতে পরীক্ষামূলকভাবে এআই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। গাড়ি শনাক্তের জন্য ১০৫টি ক্যামেরা ব্যবহার করছে ট্রাফিক বিভাগ।
এআই কোন কোন অপরাধ শনাক্ত করবে, সফটওয়্যারে সেগুলোর একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতেই অপরাধ শনাক্ত করে মামলা দেওয়া হয়। এখন রেড সিগন্যাল ভায়োলেশন, জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি আসা, স্টপেজ ছাড়া গাড়ি থামানো বা অন্য যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং বাম লেন ব্লক করে দাঁড়ালেই মামলা হচ্ছে। এ ছাড়া এআই ব্যবহার করে আরও কিছু ফিচার অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। তার মধ্যে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলা ও সিট বেল্ট বাঁধার মতো বিষয় যুক্ত হচ্ছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, শুরুর দিকে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ গাড়ি ওভারস্পিড করত। ক্যামেরার ফুটেজ থেকে মামলা দেওয়া শুরুর পর ধারাবাহিকভাবে এটি কমে এসেছে। বর্তমানে ২০-২৫টিতে নেমে এসেছে মামলার সংখ্যা। সড়কে আইন অমান্য করলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি চালকের লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা হয়েছে।
ট্রাফিকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এআই ক্যামেরায় ধারণা করা ফুটেজ কালেক্ট (সংগ্রহ) করছে। সেটাকে আবার ম্যানুয়ালি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কাজ করতে গিয়ে বাস্তব কিছু সমস্যা দেখা যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন গাড়ির নম্বর প্লেট সঠিক অবস্থায় নেই, কিছু কিছু ভাঙা, কিছু অস্পষ্ট। ফোনে সরাসরি মেজেস দিলে অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়ে যেতে পারে। এ জন্য ম্যানুয়ালি দেখে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এরপর যেসব মামলা নিশ্চিত করা হচ্ছে সেই গাড়ির নিবন্ধিত সেলফোনে বার্তা পাঠানো হচ্ছে এবং একটি অভিযোগের নোটিস তার ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে। সেই চিঠিতে সশরীরে হাজির হয়ে মামলাটা নিষ্পত্তি করতে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সিস্টেমের মধ্যে গলদ রেখে এআই দিয়ে শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে না। এটা দিয়ে যারা সুফল পেয়েছে, তারা সিস্টেমের কারণেই পেয়েছে। এআই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এখন সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কারোর মুখের দিকে না তাকিয়ে আইন প্রয়োগ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ইঞ্জিন নম্বর দিয়ে সড়কে চলাচল করা গাড়ির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে সড়কে নম্বর প্লেটবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্য বেশি বাড়ছে। এআই সড়কের শেষ দাওয়া!
কালের আলো/এমএএএমকে




আপনার মতামত লিখুন
Array