বিশ্বকাপের শেষ যুদ্ধ আজ, শিরোপার জন্য লড়বে আর্জেন্টিনা-স্পেন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে আজ রাতে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। একদিকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে নামছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ১৬ বছর পর আবারো বিশ্বসেরার মুকুটের স্বপ্নে বিভোর স্পেন। তবে এই ফাইনালকে বিশেষ করে তুলেছে আরেকটি কারণ-এটি হতে পারে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, আবার একই সঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চে লামিনে ইয়ামালের নতুন অধ্যায়ের সূচনাও। শেষ পর্যন্ত আরেকবার কি বিশ্বকাপ ট্রফি উঠবে মেসির হাতে, নাকি ইয়ামালের হাত ধরে নতুন যুগের সূচনা করবে স্পেন-সেই উত্তর মিলবে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হতে যাওয়া মহারণে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ থাকবে সেই ম্যাচেই।
আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়তে মাঠে নামছে। ২০২২ সালে কাতারে শিরোপা জেতা লিওনেল স্কালোনির দল এবারও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে সেমিফাইনাল পর্যন্ত কোনো ম্যাচ হারেনি তারা। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত খেলে ফাইনাল নিশ্চিত করে। অন্যদিকে স্পেন সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে। পুরো টুর্নামেন্টেই দারুণ ছন্দে থাকা স্পেন দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির এটি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হতে পারে। অন্যদিকে মাত্র কিশোর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে ঝড় তোলা লামিনে ইয়ামাল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালের আলোয়। ফলে ম্যাচটি এক অর্থে ‘মেসি বনাম ইয়ামাল’ দুই প্রজন্মের প্রতীকী লড়াইও বটে।
কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি হতে পারে ভিন্ন স্বাদের। স্পেন বল দখলে রেখে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দ্রুত আক্রমণ, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং মেসির সৃজনশীলতার ওপর ভরসা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং দুই দলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তাই বড় ভূমিকা রাখবে।
স্পেন এবার নিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন হয় দলটি। সেই দলের উত্তরসূরীরা বিশ্বকাপে স্পেন ফুটবলের ঝলমলে আলো ধরে রাখতে পারেনি। অথচ ইউরোপের ফুটবলে স্পেন চার বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে আর্জেন্টিনা ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন। এসব পরিসংখ্যান কোনো কাজে আসবে না আজ। মাঠে কার শক্তি কতটুকু সেটি প্রমাণ হবে কৌশলের মারপ্যাঁচে। জিততে হলে গোল করতে হবে। আর্জেন্টিনার আছে এমন ফুটবলার যার পায়ের জাদুতে ফুটবল দুনিয়া মন্ত্রমুগ্ধ। ৩৯ বছর বয়সে এসেও মেসি দেখাচ্ছেন পরিশ্রম করে কীভাবে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে নিজের চাওয়া পূরণ করছেন।
আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে কম আলোচনা হয়নি। সমালোচনাও ছিল যথেষ্ট। তবে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন লিওনেল মেসি ও তার দল। গ্রুপ পর্বে দাপট দেখিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও নকআউটে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিটি ম্যাচেই শেষ পর্যন্ত লড়তে হয়েছে, চাপ সামলে এগিয়ে যেতে হয়েছে। আর সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতে বারবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মেসি।
তবে আর্জেন্টিনার শক্তি শুধু মেসিতে সীমাবদ্ধ নয়। এই দলে বিশ্বকাপের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের অভাব নেই। গোলও এসেছে একাধিক ফুটবলারের পা থেকে। মেসির পাশাপাশি লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজও গোল করে অবদান রেখেছেন। তারপরও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসার নাম মেসিই। বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তার রয়েছে, যা এই বিশ্বকাপেও বারবার দেখা গেছে। স্কালোনির দল এমন এক মানসিকতা গড়ে তুলেছে, যারা শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত হার মানতে জানে না। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর সেই দৃশ্য দেখা গেছে।
অন্যদিকে স্পেনও ফাইনালে এসেছে দুর্দান্ত ছন্দে। আক্রমণভাগে মিকেল ওয়ারজাবাল প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনিই স্পেনকে ফাইনালে তুলেছেন। মাঝমাঠে অধিনায়ক রদ্রির উপস্থিতি স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রক্ষণে আছেন লেফটব্যাক মার্ক কুকুরেয়া, যিনি পুরো টুর্নামেন্টেই ধারাবাহিক নৈপুণ্য দেখিয়েছেন।
ফাইনালে স্পেনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হবে মেসিকে যতটা সম্ভব নিষ্ক্রিয় রাখা। আর আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা থাকবে স্পেনের গতিময় আক্রমণকে থামিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি কার হাতে উঠবে, সেই উত্তর মিলবে শেষ বাঁশি বাজার পরই।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array