বিশ্বকাপের পর্দা নামল, মাঠের চ্যাম্পিয়নের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় জয় ফিফার
আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই ফুটবল মহাযজ্ঞকে ইতিহাসের অন্যতম সফল আসর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মাঠে স্পেন শিরোপা জিতলেও বাণিজ্যিক সাফল্যের দিক থেকে সবচেয়ে বড় বিজয়ী হয়েছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত বিশ্বকাপটি ফিফার জন্য পরিণত হয়েছে এক বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্যে। রেকর্ড আয়, দর্শকপূর্ণ স্টেডিয়াম, টিকিটের বাড়তি চাহিদা এবং করপোরেট অংশীদারত্ব থেকে বিপুল অর্থ আয় করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যেও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য রেকর্ড ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার অর্থ বিতরণ করেছে ফিফা।
ফিফার বর্তমান চার বছর মেয়াদি বাণিজ্যিক চক্র শেষে আয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ থেকে আয় হয়েছিল ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এবারের আয় প্রায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে। এই আয় বিশ্বের অন্যান্য বড় ক্রীড়া ইভেন্টের তুলনায়ও অনেক বেশি। প্যারিস অলিম্পিকস থেকে আয় হয়েছিল ৫ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি এবং উয়েফা ইউরো ২০২৪ থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বকাপের আগে ৩২ দল থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। অনেকের আশঙ্কা ছিল, এতে প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কা অনেকটাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নতুন ফরম্যাটে নতুন গল্প ও নতুন দল উঠে আসার সুযোগ তৈরি হলেও টুর্নামেন্টের মানে বড় কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।
এবারের বিশ্বকাপে ১০৪টি ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছেন ৬৬ লাখের বেশি দর্শক। স্টেডিয়ামের আসন পূর্ণতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে টিকিটের মূল্য নির্ধারণে ফিফার ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা ছিল। সমর্থকদের অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, এতে সাধারণ দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। যদিও চাহিদায় কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি এবং রেকর্ড দামে টিকিট বিক্রি হয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য পুরস্কার অর্থও বাড়িয়েছে ফিফা। মোট ৬৫৫ মিলিয়ন ডলারের প্রাইজমানি দেওয়া হয়েছে, যা কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। চ্যাম্পিয়ন দল পেয়েছে ৫০ মিলিয়ন ডলার, আর রানার্সআপ দল পেয়েছে ৩৩ মিলিয়ন ডলার।
তবে ফিফার মোট আয়ের তুলনায় এই পুরস্কার অর্থ এখনো তুলনামূলকভাবে ছোট অংশ। বিশাল বাণিজ্যিক বাজার হিসেবে বিশ্বকাপের মূল্য দিন দিন আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও ছিল এবারের বিশ্বকাপে। বিভিন্ন দেশের দল, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের ভিসা জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, ফিফার বেটিং অংশীদারত্ব এবং সংস্থার পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইউরোপের কাউন্সিলও ফুটবলের স্বচ্ছতা ও অখণ্ডতা রক্ষায় ফিফাকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তারপরও এসব বিতর্ক ছাপিয়ে বিশ্বকাপ ২০২৬ মাঠ ও মাঠের বাইরে সফল আয়োজন হিসেবেই শেষ হয়েছে। একটি দেশ বিশ্বকাপ ট্রফি জিতলেও বাণিজ্যিক দিক থেকে আবারও সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছে ফিফা। বিশ্বকাপ যে শুধু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ নয়, একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রীড়া-বাণিজ্যিক আয়োজন—তা আরও একবার প্রমাণ করেছে এই আসর।
কালের আলো/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
Array