বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক নায়ক এসেছেন, জনপ্রিয়তাও পেয়েছেন। তবে গ্রামীণ মানুষের আবেগ, জেদ, প্রতিবাদ আর ভালোবাসাকে পর্দায় এতটা সহজ-স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন—এমন শিল্পীর সংখ্যা খুবই কম। তাঁদের মধ্যে আকবর হোসেন পাঠান ফারুক ছিলেন অন্যতম।
১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ফারুকের। তবে দর্শকের বড় পরিসরে পরিচিতি পান খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’ দিয়ে। ১৯৭৫ সালের এই সিনেমায় ‘সুজন’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।
এরপর আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’ সিনেমায় ‘নয়ন’ চরিত্রে অভিনয় করে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গ্রামীণ এক তরুণের আবেগ, সরলতা ও প্রতিবাদী মানসিকতাকে এমনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, যা তাঁকে দর্শকের আরও কাছে নিয়ে যায়।
সত্তর ও আশির দশকে ফারুক অভিনীত বেশ কয়েকটি সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষ জায়গা করে নেয়। ‘লাঠিয়াল’, ‘নয়নমনি’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বউ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘লাল কাজল’-এসব সিনেমায় তাঁর চরিত্রগুলো মূলত গ্রামীণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘিরে।
১৯৭৮ সালের ‘সারেং বউ’ সিনেমায় ‘কদম সারেং’ চরিত্রে তাঁর অভিনয়ও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। আর ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমার শেষদিকে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত মিলনের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলার দীর্ঘ দৃশ্যটি তাঁর অভিনয় প্রতিভার অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ও নির্মাতা মতিন রহমানের মতে, ফারুক গ্রামীণ মানুষের জেদ, তাড়না ও প্রতিবাদের ভাষা খুব সহজাতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তাঁর অভিনয়ের এই স্বাভাবিক ভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর থেকে আলাদা করেছে।
ফারুক শুধু পর্দার নায়ক ছিলেন না, দর্শকের কাছে হয়ে উঠেছিলেন পরিবারের একজনের মতো। তাঁর আচরণ, কথা বলার ধরন ও চরিত্র ধারণের স্বাভাবিকতার কারণেই দর্শক তাঁকে ভালোবেসে ‘মিয়া ভাই’ নামে ডাকতে শুরু করেন।
চাষী নজরুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘মিয়া ভাই’ সিনেমা। সময়ের সঙ্গে ডাকনামটিও যেন তাঁর জনপ্রিয় পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
মজার বিষয় হলো, ফারুকের জন্ম মানিকগঞ্জের ঘিওরের একটি গ্রামে হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা মূলত পুরান ঢাকায়। সেখানে নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী-নির্মাতাদের সংস্পর্শে আসেন তিনি।
পুরান ঢাকার লালকুঠির সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা তাঁর অভিনয়জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন এলাকার মানুষের কথাবার্তা, আচরণ ও জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সিনেমার গ্রামীণ চরিত্রগুলোতে সেই অভিজ্ঞতার ছাপ দেখা যায়।
আশির দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের সিনেমায় গ্রামীণ গল্পের সংখ্যা কমতে শুরু করে। ধীরে ধীরে শহুরে জীবন, চাকচিক্য ও আধুনিকতার গল্প জায়গা নেয় পর্দায়।
ফলে ফারুকের মতো শিল্পীদের জন্য যে ধরনের চরিত্র তৈরি হতো, সেসবও কমে যায়। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ গল্পের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধরনের স্বতন্ত্র নায়ক তৈরির সুযোগও কমেছে।
ফারুকের ক্যারিয়ারের বড় অংশজুড়ে থাকা গ্রামীণ চরিত্রগুলো তাই শুধু তাঁর অভিনয়জীবনের স্মৃতি নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ সময়েরও প্রতিচ্ছবি।
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ‘লাঠিয়াল’ সিনেমার জন্য ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান ফারুক। পরে ২০১৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন এই অভিনেতা।
২০২৩ সালের ১৫ মে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান ফারুক। কিন্তু তাঁর অভিনীত নয়ন, সুজন, কদম সারেং কিংবা মিলনের মতো চরিত্রগুলো এখনো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্মৃতিতে জীবন্ত।
ফারুকের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এখানেই—তিনি শুধু সিনেমায় গ্রামের মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেননি, বরং সেই মানুষগুলোর আবেগকে দর্শকের নিজের জীবনের গল্প করে তুলেছিলেন।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array