খুঁজুন
                               
, ,
           

তারেক রহমানের ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ণ
তারেক রহমানের ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রূপরেখা

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে তাগিদ তৈরি হয়েছিল, তার ওপর ভর করে অনুষ্ঠিত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশবাসী আশা করেছিল, একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। আর সেই নতুন অধ্যায়ের মূল কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তিনি যখন স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল এক দৃঢ় অঙ্গীকার “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)।

লক্ষ জনতার অভূতপূর্ব অভ্যর্থনার জবাবে তিনি উপহার দিয়েছিলেন এক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথ নকশা। আজ সরকার গঠনের চার-পাঁচ মাস পার হওয়ার পর যদি পুরো দৃশ্যপট পর্যালোচিত হয়, তবে দুটি বিপরীতমুখী স্রোত পরিলক্ষিত হয়: একদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সততা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব; অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা।

বিগত ৫৬ বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের শাসনামলটুকু বাদ দিলে সরকারপ্রধানদের জীবনযাত্রা, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সিদ্ধান্তের মধ্যে এমন আমূল পরিবর্তন খুব কমই দেখা গেছে। কিন্তু তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে গভীর দেশপ্রেম ও পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।

তিনি রাষ্ট্রীয় তকমা ও অহেতুক আড়ম্বর ত্যাগ করে অত্যন্ত সাদামাটা পোশাক ও যাপনচিত্র বেছে নিয়েছেন। ভিআইপি সংস্কৃতির নামে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং সরকারি খরচে লাগাম টেনে ধরে যে ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

প্রতিপক্ষের সমালোচনা সহ্য করার বিরল উদারতা তিনি দেখাচ্ছেন। কোনো প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতের প্রতি তাঁর আচরণ অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ও গণতান্ত্রিক।

সাধারণ মানুষ আজ তাঁর মাঝে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। জিয়াউর রহমান যেভাবে খাল খনন কর্মসূচি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে গিয়েছেন, তারেক রহমানও তাঁর নির্দেশিত পথেই আধুনিক ও সময়োপযোগী এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়ন করছেন।

তাঁর এই সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং সততা প্রতিটি দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি যোগাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষগুলো তাঁর নেতৃত্বের মাঝে নতুন আশার আলো দেখছে।

দেশ পুনর্গঠনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা, তা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত সমর্থন ও গতি পাচ্ছেন না। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে বা ত্রুটি খুঁজবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

দীর্ঘদিনের লালিত অপসংস্কৃতি, তোষামোদি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের যে ঐতিহ্য দেশে তৈরি হয়েছিল, সেই চক্রটি তারেক রহমানের বৈষম্যহীন ও আইনের শাসনের মডেলকে মেনে নিতে পারছে না। কারণ, দেশে সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি,দখল,ঘুষ-দুর্নীতির রাজত্ব চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি কুমিল্লায় একটি আলোচনা বৈঠকে কুমিল্লার এসপি মহোদয়ের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে এক বিএনপি নেতার প্রশ্নের জবাবে তিনি খোলাখুলিই বলেন, “আমি আপনার আগে ছাত্রদল করে এসেছি। আপনারা কাউকে পছন্দ না হলেই ফ্যাসিস্ট বা জামায়াত বলে আখ্যা দেন।” এটি কেবল কোনো একক জেলার চিত্র নয়; সারাদেশের সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীতে আজ এই একই প্রবণতা দৃশ্যমান।

একদল সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও দলীয় প্রভাবশালী নেতা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দক্ষ, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে দিচ্ছেন।

এমনকি যেসব কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে সরাসরি ছাত্রদলের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন—কলেজ উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে কর্মজীবনে যারা সৎ, পেশাদার ও পরহেজগার  হিসেবে চাকরিজীবন পার করেছেন—তাদেরকেও দুর্নীতির বাধা মনে করে হেনস্তা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ট্যাগ দেয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভুল তথ্য ও কুৎসা রটিয়ে নীতিবান কর্মকর্তাদের দূরে সরিয়ে রেখে পুরো সিস্টেমে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করাই এই গোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য। তবে আশা জাগানিয়া বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিষয় আমলে নিচ্ছেন না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে চাই। সম্প্রতি চট্টগ্রামে সংঘটিত দুটি আলোচিত চাঁদাবাজির ঘটনায় সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি দেখা গেছে:

একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ব্ল্যাকমেইল করে এবং শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে কোটি টাকার চেক লিখে নেওয়ার ঘটনায় যুক্তদের রেহাই দেওয়া হয়নি।

অন্য একটি ইন্টারনেট কোম্পানির অফিসে ঢুকে কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও তাণ্ডব চালানোর মূলহোতাদের দ্রুততার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের মতো অপরাধীরা যখন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, পুলিশ তাদের ধরে আইনের আওতায় এনেছে। বিএনপি সমর্থিত কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় না দেওয়ার এই বার্তা প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রীর নিয়তে কোনো গলদ নেই।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডিএফপি অডিটোরিয়ামে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত জুলাই শহীদ দিবসের আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যে কোনো বিচারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

এখানে দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে চাই যে,সমসাময়িক রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মত এতটা পরিচ্ছন্ন ইমেজের রাজনীতিবিদ খুব বেশি আছে বলে আমার জানা নেই।

“চার-পাঁচ মাসে কিছুই বদলায়নি। একইভাবে ঘুষখোররা ঘুষ খাচ্ছে। ভালো পরিকল্পনা আগের মতোই আটকে দিচ্ছে। আমি সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলাম। তারেক রহমান ছাড়া আর কারও মধ্যে পরিবর্তন ঘটেনি। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।”

স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এই বক্তব্য একদিকে যেমন এক নির্মম সত্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, অন্যদিকে এটি সরকারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর সংকটের ইঙ্গিত বলেই মনে হচ্ছে।

এই জটিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবং তোষামোদকারী চক্রকে রুখে দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে একটি কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো অনুসরণের পরামর্শ:

প্রধানমন্ত্রী এমন একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করতে পারেন যে, কোনো কর্মকর্তা বা নেতার নামে যদি তাঁর কাছে কোনো নেতিবাচক তথ্য দেওয়া হয় এবং তদন্তে তা ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হয়, তবে তথ্য প্রদানকারীকে একটি ‘মাইনাস পয়েন্ট’ দেওয়া হবে।

কোনো ব্যক্তি—তিনি প্রধানমন্ত্রীর যত নিকটবর্তীই হোন না কেন—যদি পরপর দুই বা তিনবার সরকারকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রদান করেন, তবে তাকে অবিলম্বে সরকারের সকল পদ ও দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে ছাঁটাই করতে হবে। এই কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে অশুভ গ্রুপিং, লবিং এবং মিথ্যার ওপর ভর করে সুবিধা নেওয়ার রাজনীতি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করা যায়।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরও যদি মানুষের জীবনমানের মৌলিক উন্নতি না হয়, তবে তা দেশের জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক। চব্বিশের তরুণরা রক্ত দিয়েছিল ক্ষমতার হাতবদলের জন্য নয়; তারা রক্ত দিয়েছিল ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য। তারেক রহমান তাঁর সততা, পোশাক, মেধা ও দূরদর্শিতা দিয়ে নিজের পরিবর্তন প্রমাণ করেছেন। কিন্তু একটি দেশ কেবল এক একক ব্যক্তির পরিশ্রমে বদলাতে পারে না। দলের ভেতর থাকা তথাকথিত নেতাদের বুঝতে হবে, পুরোনো ভোগবাদী ও তোষামোদের রাজনীতি বজায় রাখলে তা কেবল দলকেই নয়, পুরো দেশকেই অতলে ডুবিয়ে দেবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বীকারোক্তিকে আক্ষেপ হিসেবে না দেখে, একে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে এখনই দল ও প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তবেই জুলাই শহীদদের স্বপ্ন সার্থক হবে এবং তারেক রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন, সৎ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

রংপুরে পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের সঙ্গে তুললেন সেলফি

রংপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫৭ অপরাহ্ণ
রংপুরে পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের সঙ্গে তুললেন সেলফি

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে রংপুরের ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি এবং ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। উপস্থিত ব্যক্তিদের অনুরোধে হাসিমুখে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম রংপুর সফর। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে তিনি মন্দিরের পূজামণ্ডপে পৌঁছালে ফুলেল শুভেচ্ছায় তাঁকে স্বাগত জানান মন্দির ও পূজা উদ্‌যাপন কমিটির নেতারা।

রংপুরের ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান মন্দির ও পূজা উদ্‌যাপন কমিটির নেতারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের রংপুর জেলা শাখার সভাপতি রামজীবন কুন্ডু, মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় এবং মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ।

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে পূজামণ্ডপে উপস্থিত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যায়। মণ্ডপে প্রবেশের পর তারেক রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের কুশল জানতে চান।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের অনুরোধে তারেক রহমান হাসিমুখে সেলফি তোলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ব্যক্তিদের কুশল বিনিময়ের দৃশ্যও নজরে আসে। শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্দির পরিদর্শন ছিল তাঁর রংপুর সফরের অন্যতম কর্মসূচি। ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে পূজামণ্ডপে গিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।

রংপুরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফিরে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হবেন বলে জানা গেছে। সেখানে তিনি ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া রাতে ঢাকায় ফেরার আগে চট্টগ্রামের একটি পূজামণ্ডপও পরিদর্শনের কথা রয়েছে তাঁর। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

 

মৃত্যুদণ্ডের তথ্য কোথায় গেল, সৌদির কাছে ঢাকার কৈফিয়ত

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৪ অপরাহ্ণ
মৃত্যুদণ্ডের তথ্য কোথায় গেল, সৌদির কাছে ঢাকার কৈফিয়ত

বন্দিতালিকায় নাম ছিল দুজনেরই। একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ, অন্যজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের উল্লেখও ছিল। কিন্তু সেই তালিকায় ছিল না তাঁদের কী সাজা হয়েছে, সেই তথ্য। পরে জানা গেল, দুজনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ এমন চূড়ান্ত শাস্তির খবর বাংলাদেশ জানতে পারল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম ও টাঙ্গাইলের সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বন্দিতালিকায় নাম থাকার পরও কেন তাঁদের সাজার তথ্য জানানো হয়নি? মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত করা হয়েছিল কি না? আর বিচার চলাকালে তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না?

  • বন্দিতালিকায় দুই বাংলাদেশির অপরাধের উল্লেখ থাকলেও সাজার বিবরণ ছিল অনুপস্থিত
  • বিচারিক প্রক্রিয়া ও তথ্যের ঘাটতির কারণ জানতে চায় বাংলাদেশ

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে ঢাকা। দুই বাংলাদেশির মামলার বিস্তারিত বিবরণ, বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া পদক্ষেপ এবং মৃত্যুদণ্ডের তথ্য বাংলাদেশকে না জানানোর কারণ জানতে সৌদি আরবের কাছে নতুন করে কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি সরাসরি তোলেন বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্মকর্তা বন্দিতালিকায় সাজার তথ্য না থাকার বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

বাংলাদেশের কূটনীতিকদের বক্তব্য, তালিকায় যদি মৃত্যুদণ্ডের তথ্য থাকত, তাহলে দুই বাংলাদেশির সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেত। এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের মামলার খুঁটিনাটি জানতে চাইছে ঢাকা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তথ্য আদান-প্রদানে এই ঘাটতি কেন তৈরি হলো এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানোর উপায় কী?

অপরাধের তথ্য ছিল, মৃত্যুদণ্ডের কথা কেন নয়?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেটে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বন্দি ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের একটি তালিকা পাঠায়। সেখানে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধের উল্লেখ থাকলেও সাজার ধরন বা মেয়াদ সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

তালিকায় বলা হয়, জেদ্দা সংশোধনাগারে বন্দি নজরুল ইসলাম সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে কখন দণ্ড দেওয়া হয়েছে কিংবা কী শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে, জেদ্দা মহিলা কারাগারে বন্দি সুইটি আক্তারের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের কথা বলা হয়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রেও সাজার বিবরণ ছিল অনুপস্থিত।

এরপর বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্বেগের মূল জায়গা। বন্দিতালিকায় যখন দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অপরাধ ও দণ্ডের উল্লেখ ছিল, তখন মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির তথ্য কেন অনুপস্থিত ছিল? তালিকাটি তৈরি ও পাঠানোর সময় এই তথ্য বাদ পড়েছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে তা জানানো হয়নি—সেই ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তিন দফায় কূটনৈতিক উদ্যোগ
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ। গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রথম কূটনৈতিক পত্র পাঠায়। এতে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।

এরপর রবিবার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে ওই কূটনৈতিক পত্র আবার দেওয়া হয়। একই দিন জেদ্দা থেকে ঢাকায় পাঠানো বাংলাদেশ মিশনের এক বার্তায় দুই বাংলাদেশির মামলা এবং সৌদি আরবে অনুরূপ অপরাধে বাংলাদেশিদের সাজা দেওয়ার নজির সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়। সবশেষে সোমবার (১৯ অক্টোবর) জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি আবারও উত্থাপন করেন বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকে যত দ্রুত সম্ভব দুই বাংলাদেশির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক পত্রে জানতে চাওয়া হয়েছে, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, বিচারিক প্রক্রিয়ায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং দণ্ড ঘোষণার পর তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না।অর্থাৎ ঢাকা এখন শুধু মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্তের তথ্য চাইছে না; বরং গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে বিচার, আপিল এবং চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার বিবরণ জানতে চাইছে।

সৌদির ব্যাখ্যা: নিম্ন আদালতে দণ্ড, ১৩ বিচারকের প্যানেলে বহাল
গত সোমবারের (১৯ অক্টোবর) বৈঠকে সৌদি পক্ষ দুই বাংলাদেশির বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। সৌদি পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে নিম্ন আদালত দুই আসামির দণ্ড দেন। পরে ১৩ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আপিল আদালতের প্যানেল তাঁদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আদালতের রায় অনুসরণ করে নারী ও পুরুষ বন্দিদের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তবে এই ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের মূল প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকলে বন্দিতালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য কেন ছিল না, সে বিষয়ে সৌদি কর্মকর্তার কাছ থেকে সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বৈঠক ও নতুন কূটনৈতিক পত্র পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কনসাল জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেন। তবে আলোচনার বিস্তারিত জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

‘আগে জানলে সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া যেত’
জেদ্দার বৈঠকে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিতালিকার অসংগতির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকলে তালিকায় কেন সেই তথ্য উল্লেখ করা হয়নি? বাংলাদেশের কূটনীতিক বলেন, বন্দিতালিকায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য থাকলে জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন তাঁদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেত।

এই বক্তব্যে বাংলাদেশের উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশে বন্দি কোনো বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা চললে সংশ্লিষ্ট মিশনের কাছে সময়মতো তথ্য থাকা জরুরি। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে তথ্য না পেলে কূটনৈতিক যোগাযোগ, আইনি সহায়তা বা অন্য কোনো সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। তবে আগে তথ্য পেলে বাংলাদেশ ঠিক কী পদক্ষেপ নিতে পারত এবং তা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ জন্য দুই মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।

২০২৩ সালে গ্রেপ্তার, ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবে যাত্রা
ঢাকা, রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরকারি কয়েকটি নথি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট (১ আগস্ট ২০২৩) আটক করা হয়। পরদিন ২ আগস্ট (২ আগস্ট ২০২৩) আটক হন সুইটি আক্তার। নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, আর সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তাঁরা দুজনই ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবে যান।

সেখানে আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। কর্মসংস্থানের জন্য সৌদি আরবে যাওয়া এই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, কোন প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের দণ্ড দেওয়া হয় এবং বিচার চলাকালে তাঁরা কী ধরনের আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক পত্রে তাই মামলার বিবরণের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, দুই বন্দি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তা ঢাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই ধরনের অপরাধে বাংলাদেশিদের সাজা কতটা কঠোর?
গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) জেদ্দা থেকে ঢাকায় পাঠানো বাংলাদেশ মিশনের বার্তায় বলা হয়, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে এর আগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির নেই বলে মিশন উল্লেখ করেছে। ওই বার্তায় সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক স্খলনসংক্রান্ত মামলায় বন্দি বাংলাদেশিদের পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। সেখানে মোট ৩০৬ জন বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সাজা সর্বনিম্ন এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড পর্যন্ত।

এ ছাড়া সাইবার অপরাধসংক্রান্ত অন্য তিনটি মামলায় মক্কায় তিন বাংলাদেশিকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়। তাঁদের সাজা সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য সামনে আসায় তাঁদের মামলার বিশেষ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আগের মামলাগুলোর অভিযোগ, প্রমাণ ও বিচারিক পরিস্থিতি এই দুই মামলার সঙ্গে এক ছিল কি না, তা জানা নেই। তাই শুধু সাজা তুলনা করে মামলাগুলোর মধ্যে সরাসরি সমতা টানা সম্ভব নয়।

তবু একই ধরনের অপরাধে আগে বাংলাদেশিদের কারাদণ্ডের তথ্য থাকায় দুই মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ভিত্তি কী ছিল, তা জানতে চাওয়ার গুরুত্ব রয়েছে। মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

‘তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতি ছিল’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, অভিযোগ বা অপরাধের কথা তুলে ধরে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে—এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য হতাশাজনক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রক্রিয়ায় ঘাটতি ছিল। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য চাওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করা হলেও সেই ঘাটতি কোন পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল, কেন মৃত্যুদণ্ডের তথ্য বাংলাদেশকে আগে জানানো হয়নি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। এখন সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া ব্যাখ্যা ও নথির ভিত্তিতেই বোঝা সম্ভব হবে, তথ্য আদান-প্রদানের ব্যর্থতা কোথায় ছিল এবং দুই বাংলাদেশির মামলা সম্পর্কে বাংলাদেশ মিশনকে কেন যথাসময়ে জানানো হয়নি।

মৃত্যুদণ্ডের পরও অমীমাংসিত প্রশ্ন
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁদের বন্দি থাকার তথ্য জানা থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি বাংলাদেশকে আগে জানানো হয়নি কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এই ঘটনায় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বন্দিতালিকায় অপরাধের উল্লেখ থাকলেও সাজার তথ্য অনুপস্থিত ছিল কেন। দ্বিতীয়ত, বিচার ও আপিলের প্রতিটি ধাপে দুই বাংলাদেশির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল। তৃতীয়ত, মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বাংলাদেশের কনস্যুলেটকে যথাসময়ে অবহিত না করার কারণ কী।

বিদেশে বন্দি বাংলাদেশিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি থাকলে সম্ভাব্য কূটনৈতিক বা আইনি উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। এখন ঢাকার লক্ষ্য দুই বাংলাদেশির মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতির কারণ জানা। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিদেশে বন্দি বাংলাদেশিদের বিষয়ে গুরুতর সিদ্ধান্ত যেন সংশ্লিষ্ট মিশনের অজানা না থাকে, তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য নজির

বরিশাল সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৮ অপরাহ্ণ
এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য নজির

একই মাঠে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। দুই উপাসনালয়ের দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। একদিকে মসজিদে আজান ও নামাজ, অন্যদিকে মন্দিরে ঢাকঢোল, শঙ্খধ্বনি আর পূজার্চনা। তবে আজান শুরু হলে থেমে যায় পূজার বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় আচার পালনের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৫৪ বছরের বেশি সময় ধরে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজার জামে মসজিদ ও সার্বজনীন দুর্গা মন্দির।

প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরোধ তো নেই-ই, বরং স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলো প্রতিবেশী হিন্দুদের পূজা উদ্‌যাপনে সহযোগিতা করে আসছে। একইভাবে ঈদ, বিয়ে কিংবা পারিবারিক আয়োজনে অংশ নিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

একই মাঠের এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে দুর্গা মন্দির। দুই উপাসনালয়ের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। এত কাছাকাছি অবস্থান হলেও দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫৪ বছর ধরে এখানে দুই ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রয়েছে। দুর্গাপূজার সময় মন্দিরে ঢাকঢোল, উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও রাতভর আরতির আয়োজন হয়। অন্যদিকে মসজিদে নিয়মিত আজান ও জামাতে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মসজিদে আজান শুরু হলে মন্দিরের পূজারি ও ভক্তরা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রীতিই স্থানীয় মানুষের কাছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, মসজিদে আজান শুরু হলেই তাঁরা পুরো অনুষ্ঠানে বিরতি দেন। নামাজ শেষ হলে আবার পূজার কার্যক্রম শুরু করেন। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারও জন্য বিরক্তির কারণ হননি; বরং দুই ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের উপাসনালয়কে পরস্পরের সহযোগিতায় আগলে রেখেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মানকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। পাশাপাশি অবস্থান করেও দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম যাতে একে অপরের অসুবিধার কারণ না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় বজায় রাখা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মাকসুদ মৃধা বলেন, এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও এভাবেই বসবাস করেছেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা পূজা দেখতে মণ্ডপে যান। অন্যদিকে ঈদ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীরাও তাঁদের আয়োজনে অংশ নেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, পারস্পরিক যাতায়াত, উৎসবে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাঁরা।

মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস জানান, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই মাঠে আধুনা জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। তিনি বলেন, মন্দিরের মাত্র ১০ ফুট দূরে মসজিদ থাকলেও তাঁদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। দুই পক্ষই নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন।

দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পাশাপাশি দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া স্থানীয়দের কাছে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। উৎসবের সময়ও এই সহাবস্থানের রীতি বজায় থাকে। আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা ঢাকঢোলের আওয়াজ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলে আবার তাঁদের কার্যক্রম শুরু হয়।

তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এখানে সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। কেউ কখনো কারও প্রতি বিরক্তির কারণ হননি। স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার যে চর্চা রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছেও সম্প্রীতির শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে।

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহীম বলেন, উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একই স্থানে মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে বসবাস করবে—এমন সমাজব্যবস্থাই তাঁরা চান। আধুনা এলাকার পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির কেবল দুটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক। আজানের সময় পূজার বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা কিংবা একে অপরের উৎসবে অংশ নেওয়ার মতো চর্চা দেখায়, ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে একসঙ্গে বসবাস করা সম্ভব।

দীর্ঘ ৫৪ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য স্থানীয়দের কাছে সম্প্রীতির পরিচিত দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় ভিন্নতাকে বিরোধের কারণ না বানিয়ে সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে সম্পর্ক ধরে রাখার এই চর্চা অন্য এলাকার মানুষের কাছেও অনুকরণীয় হতে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি