খুঁজুন
                               
, ,
           

৩৬-এ জেনিফার লরেন্স: ক্যাটনিস থেকে অস্কারজয়ী তারকা

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
৩৬-এ জেনিফার লরেন্স: ক্যাটনিস থেকে অস্কারজয়ী তারকা

আজ ৩৬ বছরে পা দিলেন হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জেনিফার লরেন্স। এ প্রজন্মের অন্যতম সফল অভিনেত্রী হিসেবে ইতিমধ্যে অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটার মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ঘরে তুলেছেন তিনি। ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’-এর ক্যাটনিস এভারডিন থেকে ‘উইন্টার্স বোন’ ও ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এর মতো সিনেমার জটিল চরিত্র—বৈচিত্র্যময় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন এই অভিনেত্রী।

তবে জেনিফার লরেন্সের গল্প শুধু তারকা হয়ে ওঠার নয়। কৈশোরে সামাজিক অস্বস্তি, নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে করা, মাত্র ১৪ বছর বয়সে অভিনয়ের জন্য নিউইয়র্কে পাড়ি দেওয়া এবং এরপর একের পর এক অডিশন—সব মিলিয়ে তাঁর পথ ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা।

১৯৯০ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকির লুইসভিলে জন্ম জেনিফার শ্রেডার লরেন্সের। বাবা গ্যারি লরেন্স নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আর মা কারেন পরিচালনা করতেন শিশুদের একটি ক্যাম্প। দুই বড় ভাইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা জেনিফারের শৈশব ছিল বেশ দুরন্ত।

ঘোড়ায় চড়া, ফিল্ড হকি, সফটবল ও বাস্কেটবল—খেলাধুলায়ও সক্রিয় ছিলেন তিনি। তবে ছোটবেলার জেনিফারকে আজকের আত্মবিশ্বাসী হলিউড তারকার সঙ্গে মেলানো কঠিন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ছোটবেলায় নিজেকে অনেকটা ‘বেমানান’ মনে হতো। অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও সামাজিক অস্বস্তির কারণে অন্যদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারতেন না।

অভিনয়ই ধীরে ধীরে তাঁর জন্য হয়ে ওঠে এমন একটি জায়গা, যেখানে নিজের অস্বস্তি ভুলে থাকা সম্ভব ছিল।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে বেড়াতে গিয়ে ঘটনাচক্রে এক প্রতিভা অন্বেষকের নজরে পড়েন জেনিফার। ছবি তোলার পর ওই ব্যক্তি তাঁর মায়ের ফোন নম্বর নেন। পরদিনই আসে অডিশনের প্রস্তাব। অডিশনে জেনিফারের অভিনয়ে মুগ্ধ হন এজেন্টরা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নিতে স্কুলের পড়াশোনাও দ্রুত শেষ করেন তিনি। মাত্র দুই বছরেই হাইস্কুলের পড়া শেষ করে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন।

জেনিফারের ক্যারিয়ারের শুরু টেলিভিশনে। ২০০৭ সালে ‘দ্য বিল এনভাল শো’-তে নিয়মিত চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এরপর ‘গার্ডেন পার্টি’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক।

২০০৮ সালে ‘দ্য বার্নিং প্লেন’-এ অভিনয় করে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে উদীয়মান অভিনয়শিল্পী হিসেবে মারচেলো মাস্ত্রোয়ান্নি পুরস্কার পান তিনি।

তবে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় মোড় আসে ২০১০ সালে। ডেবরা গ্র্যানিক পরিচালিত স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘উইন্টার্স বোন’-এ দরিদ্র পরিবারের কিশোরী রি ডলি চরিত্রে অভিনয় করেন জেনিফার। কঠিন বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে থাকা এক কিশোরীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।

সিনেমাটি বড় বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও জেনিফার পান সেরা অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার মনোনয়ন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর।

২০১২ সালে মুক্তি পায় ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’। সুজান কলিন্সের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটিতে জেনিফার অভিনয় করেন ক্যাটনিস এভারডিন চরিত্রে। এই চরিত্রই তাঁকে বিশ্বজুড়ে তারকা বানিয়ে দেয়।

ক্যাটনিস শুধু একজন অ্যাকশন নায়িকা ছিলেন না; নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও ধীরে ধীরে উঠে আসে চরিত্রটি। জেনিফারের অভিনয়ে ক্যাটনিসের মধ্যে একসঙ্গে ফুটে ওঠে শক্তি, ভয়, কোমলতা ও বিদ্রোহ।

প্রথম ‘হাঙ্গার গেমস’ সিনেমায় তাঁর পারিশ্রমিক ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ডলার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্যের সঙ্গে পরবর্তী সিনেমাগুলোতে তাঁর পারিশ্রমিক ও লাভের অংশও দ্রুত বাড়ে।

চারটি সিনেমায় ক্যাটনিস চরিত্রে অভিনয় করে জেনিফার হয়ে ওঠেন প্রজন্মের অন্যতম পরিচিত নারী অ্যাকশন তারকা। ২০১২ থেকে ২০১৫—মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর নাম উঠে আসে হলিউডের সবচেয়ে দামি তারকাদের তালিকায়।

‘দ্য হাঙ্গার গেমস’-এর একই বছরে মুক্তি পায় ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’। ডেভিড ও. রাসেলের পরিচালনায় ব্র্যাডলি কুপারের বিপরীতে জেনিফার অভিনয় করেন টিফানি ম্যাক্সওয়েল চরিত্রে।

ক্যাটনিসের সম্পূর্ণ বিপরীত এই চরিত্র ছিল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, আবেগপ্রবণ এবং প্রাণবন্ত এক তরুণীর। আর এই চরিত্রেই নিজের অভিনয়ের বৈচিত্র্য দেখান জেনিফার।

২০১৩ সালের অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ২২ বছর। অস্কার মঞ্চে পুরস্কার নিতে যাওয়ার সময় পড়ে যাওয়ার ঘটনাটিও তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। তবে ঘটনাটি যেন তাঁর স্বাভাবিক ও অকৃত্রিম ব্যক্তিত্বকেই আরও স্পষ্ট করে দেয়।

‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এর পর ‘আমেরিকান হাসল’-এ অভিনয় করেন জেনিফার। চরিত্রটি তুলনামূলক ছোট হলেও তাঁর অভিনয় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। বাফটায় সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান তিনি।

এরপর ‘জয়’ সিনেমায় ব্যবসায়ী জয় ম্যাঙ্গানোর চরিত্রে অভিনয় করে আবারও অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পান।

অন্যদিকে ‘এক্স–মেন’ সিরিজে মিস্টিক চরিত্রে অভিনয় তাঁকে আরেকটি বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির মুখ করে তোলে। একই সময়ে স্বাধীন সিনেমা, পুরস্কারপ্রত্যাশী নাটক এবং বড় বাজেটের ব্লকবাস্টারে কাজ করেছেন তিনি—হলিউডে এমন ভারসাম্য খুব কম অভিনেত্রীর ক্যারিয়ারেই দেখা যায়।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেনিফারের অভিনীত সিনেমাগুলোর সম্মিলিত বৈশ্বিক আয় ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

জেনিফারের সাফল্য শুধু পুরস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১৫ সালে ফোর্বসের হিসাবে এক বছরে তাঁর আয় ছিল প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। ওই সময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রী ছিলেন তিনি।

২০১৬ সালেও তালিকার শীর্ষে ছিলেন জেনিফার। ওই বছর তাঁর আয় ছিল আনুমানিক ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’-এর শেষ কিস্তির মুনাফার অংশ এবং ‘প্যাসেঞ্জার্স’ সিনেমার বড় অগ্রিম পারিশ্রমিক ছিল তাঁর আয়ের অন্যতম উৎস।

তবে অর্থের এই সাফল্যের পাশাপাশি হলিউডে নারী-পুরুষের পারিশ্রমিক বৈষম্য নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি।

‘আমেরিকান হাসল’ সিনেমার পারিশ্রমিক নিয়ে একসময় প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান জেনিফার। সনি পিকচার্সের ফাঁস হওয়া ই-মেইল থেকে জানা যায়, ছবিটির লাভের অংশে ব্র্যাডলি কুপার, ক্রিশ্চিয়ান বেল ও জেরেমি রেনারের তুলনায় জেনিফার ও অ্যামি অ্যাডামস কম অংশ পেয়েছিলেন।

পুরুষ অভিনয়শিল্পীরা পেয়েছিলেন ৯ শতাংশ করে, যেখানে দুই অভিনেত্রীর অংশ ছিল ৭ শতাংশ। ঘটনাটি জেনিফারের কাছে শুধু অর্থের প্রশ্ন ছিল না; এটি হলিউডে নারী অভিনয়শিল্পীদের অবস্থান ও দর-কষাকষির ক্ষমতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

তারকা হওয়ার সঙ্গে জেনিফারের জীবনে এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু অভিজ্ঞতাও। ২০১৪ সালে হ্যাক করে বহু তারকার ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। জেনিফারও ছিলেন ওই ঘটনার শিকার।

পরে তিনি ঘটনাটিকে নিছক ‘ছবি ফাঁস’ হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর গুরুতর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর থেকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে জেনিফারের সঙ্গে ‘এক্স–মেন’ সহশিল্পী নিকোলাস হল্ট ও পরিচালক ড্যারেন অ্যারোনোফস্কির সম্পর্কের কথা আলোচিত হয়েছে। হল্টের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয় ২০১৪ সালে। পরে ‘মাদার!’ সিনেমার পরিচালক অ্যারোনোফস্কির সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান তিনি; ২০১৭ সালে সেই সম্পর্কও শেষ হয়।

২০১৮ সালে তাঁর জীবনে আসেন শিল্পকর্ম বিক্রেতা কুক মারোনি। এক বছরের মধ্যেই তাঁদের বাগদান হয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে রোড আইল্যান্ডে বিয়ে করেন তাঁরা।

২০২২ সালে এই দম্পতির প্রথম সন্তান সাইয়ের জন্ম হয়। ২০২৫ সালে তাঁদের দ্বিতীয় সন্তানও জন্ম নেয়। ফলে একসময় হলিউডের ব্যস্ততম তারকাদের একজন জেনিফার লরেন্সের জীবনের বড় অংশ এখন পরিবারকে ঘিরে।

২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি জেনিফারের ওপর ছিল প্রচণ্ড কাজের চাপ। ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’, ‘এক্স–মেন’, ‘জয়’, ‘প্যাসেঞ্জার্স’, ‘মাদার!’—একটির পর একটি বড় সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি।

একপর্যায়ে অতিরিক্ত খ্যাতি ও কাজের চাপ তাঁকে ক্লান্ত করে তোলে। ক্যামেরা, গণমাধ্যম ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের অতিরিক্ত আগ্রহ সামলাতে গিয়ে কিছুটা বিরতি নেন অভিনেত্রী।

২০২১ সালে ‘ডোন্ট লুক আপ’ দিয়ে বড় পর্দায় ফেরেন তিনি। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে অভিনীত ছবিটি ছিল তাঁর বড় প্রত্যাবর্তনগুলোর একটি। এরপর ‘কজওয়ে’-এর মতো চরিত্রনির্ভর সিনেমায় অভিনয় করে জানান, শুধু বড় বাজেটের ব্লকবাস্টার নয়, ছোট পরিসরের গল্পেও কাজ করতে আগ্রহী তিনি।

২০১৮ সালে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আ এক্সিলেন্ট ক্যাডেভার’ প্রতিষ্ঠা করেন জেনিফার। শুধু অভিনয় নয়, নিজের পছন্দের গল্প ও প্রকল্পে সৃজনশীল স্বাধীনতা তৈরির লক্ষ্যেই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি।

প্রযোজক হিসেবে ‘কজওয়ে’, ‘ব্রেড অ্যান্ড রোজেস’, ‘নো হার্ড ফিলিংস’সহ বেশ কিছু প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন জেনিফার। ২০২৩ সালের ‘নো হার্ড ফিলিংস’-এ অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাও করেন তিনি।

জেনিফার লরেন্স যতই নতুন চরিত্রে এগিয়ে যান, ক্যাটনিস এভারডিন যেন তাঁর ক্যারিয়ারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে আছে। এ কারণেই ‘দ্য হাঙ্গার গেমস: সানরাইজ অন দ্য রিপিং’-এ তাঁর ফিরে আসা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।

২০২৬ সালে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমাটির গল্প মূল ‘হাঙ্গার গেমস’ সিরিজের ২৪ বছর আগের সময়কে ঘিরে। তরুণ হেমিচ অ্যাবারনেথির চরিত্রে অভিনয় করছেন জোসেফ জাডা। অন্যদিকে জেনিফার লরেন্স আবারও ক্যাটনিস চরিত্রে এবং জশ হাচারসন পিটা চরিত্রে ফিরছেন।

ছোট শহরের এক চঞ্চল কিশোরী থেকে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী, বিশ্বখ্যাত অ্যাকশন ফ্র্যাঞ্চাইজির মুখ থেকে প্রযোজক—জেনিফার লরেন্সের ক্যারিয়ার যেন একাধিক অধ্যায়ের গল্প।

খ্যাতির চূড়ায় থেকেও ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখা, পারিশ্রমিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং নিজের পছন্দের চরিত্রে ফিরে যাওয়ার সাহস—সব মিলিয়ে ৩৬ বছর বয়সেও হলিউডে তাঁর প্রভাব স্পষ্ট। অভিনয়জীবনের শুরুতে যে মেয়েটি নিজেকে ‘বেমানান’ মনে করতেন, তিনিই এখন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ও সফল অভিনেত্রী।

কালের  আলো/এসএ

পদ্মায় ইলিশের সংকট, বিপাকে হাজারো জেলে পরিবার

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:২০ অপরাহ্ণ
পদ্মায় ইলিশের সংকট, বিপাকে হাজারো জেলে পরিবার

মানিকগঞ্জের পদ্মায় জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। মাছের সংকটে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে গিয়ে খরচও উঠছে না অনেকের। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ নৌকা-জাল বিক্রি করে রিকশা চালানোসহ বিকল্প পেশা বেছে নিচ্ছেন।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ পদ্মা ও যমুনার ওপর নির্ভরশীল। এসব এলাকার জেলেদের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল পদ্মার ইলিশ। তবে কয়েক বছর ধরে নদীতে ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন তারা।

মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে হয় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহরণ আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে।

অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন বা প্রায় ৪৬ শতাংশ। শুধু ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যেই আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক হোসেন ব্যাপারী বলেন, শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতে হচ্ছে। তাঁর মতে, নদীর আগের গভীরতা না থাকায় মাছও কমে গেছে।

ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লার ভাষ্য, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক নৌযান ও জাহাজের শব্দের কারণেও ইলিশের বিচরণ কমেছে। আর জীবিকার সংকটে দড়িকান্দি গ্রামের নিবন্ধিত জেলে লিটন নৌকা-জাল বিক্রি করে রিকশা চালানো শুরু করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশের বিচরণে প্রভাব ফেলছে। পলি জমে ডুবোচর ও চর সৃষ্টি হওয়া, পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, বর্জ্যে পানিদূষণ এবং নদীর খাদ্যচক্র নষ্ট হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধনও ইলিশের প্রজননচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ সুরক্ষায় মানিকগঞ্জে ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০৯টি মামলা, ৭০ জনকে কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা, জলযান চলাচল, দূষণ ও অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে। অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও অসচেতনতার কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সুরক্ষায় সরকারি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি 

চট্টগ্রামে শেষ হলো অল উইমেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দ্বিতীয় আসর

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
চট্টগ্রামে শেষ হলো অল উইমেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দ্বিতীয় আসর

ছয় দেশের ৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল অল উইমেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এর দ্বিতীয় আসর।

১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এই চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রামে। নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন, তাঁদের কাজের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং নির্মাতাদের মধ্যে যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ফিল্ম ফর আস ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ফিল্ম ক্লাব যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করে।

এবারের উৎসবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফিকশন, ডকুমেন্টারি ও ডিজিটাল স্টোরিটেলিং—এই তিন বিভাগে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন দেশের নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ছিল নির্বাচিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বিশেষ আয়োজন।

প্রথমবার যুক্ত হলো ডিজিটাল স্টোরিটেলিং

এবারের আসরে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয় ডিজিটাল স্টোরিটেলিং কম্পিটিশন বিভাগ। চলচ্চিত্রের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে ছবি, ভিডিও, লেখা, শব্দ, অ্যানিমেশনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে গল্প বলার কাজগুলোকে এই বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আয়োজকদের মতে, নতুন এই বিভাগ তরুণ নির্মাতা ও ডিজিটাল মাধ্যমে গল্প বলায় আগ্রহীদের জন্য ভিন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

ইরানি নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন

উৎসবের অন্যতম বিশেষ আয়োজন ছিল ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। ইরানের নারী নির্মাতাদের নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে আয়োজিত এই বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে চট্টগ্রামের দর্শকদের তাঁদের কাজ, ভাবনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বিশেষ করে তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই আয়োজন ছিল ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। উৎসবের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক, শিক্ষার্থী ও তরুণ নির্মাতাদের অংশগ্রহণ ছিল।

তিন বিভাগে পুরস্কার

১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সঙ্গীতা রায়মাঝি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিজয়ী নির্মাতাদের হাতে উৎসবের ক্রেস্ট তুলে দেন।

এবারের উৎসবে তিন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন—

  • বেস্ট ফিকশন: তাবাসসুম তানহা — What If
  • বেস্ট ডকুমেন্টারি: সুরাইয়া তাসনিন সাথী — Reshma
  • বেস্ট ডিজিটাল স্টোরিটেলিং: ফাতিমা তকাওয়ি

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর উৎসবের প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর ড. গুরুপদ চক্রবর্তী।

নির্মাতা ও দর্শকের যোগাযোগকে গুরুত্ব

উৎসবের পরিচালক ও ফিল্ম ফর আস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাসুদুর রহমান বলেন, নারী নির্মাতাদের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য, যেখানে তাঁরা নিজেদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

তিনি বলেন, দুই বছর পর এসে তাঁরা মনে করছেন, ধীরে ধীরে সেই জায়গা তৈরি হচ্ছে। এ বছর ছয় দেশের ৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে এবং নতুন করে ডিজিটাল স্টোরিটেলিং বিভাগ যুক্ত হয়েছে।

তাঁর মতে, উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্মাতা, শিক্ষার্থী ও দর্শকদের একসঙ্গে এসে চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হওয়া।

অধ্যাপক মাসুদুর রহমান আরও বলেন, চলচ্চিত্র উৎসবকে শুধু প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্মাতা ও দর্শকদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চান তাঁরা। একজন নির্মাতা তাঁর দর্শক খুঁজে পাওয়া, কোনো চলচ্চিত্র দেখে একজন শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হওয়া কিংবা উৎসবে পরিচিত হওয়া দুই নির্মাতার ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করা—এসবকেও তাঁরা উৎসবের সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখেন।

সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

এবারের আয়োজনে স্পন্সর হিসেবে সহযোগিতা করেছে ‘কানেক্ট হার’। উৎসবের কো-অর্গানাইজার ছিল এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ফিল্ম ক্লাব। এছাড়া লিখালিখি ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রাম উৎসবটির সঙ্গে সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজও এবারের আয়োজনকে সমর্থন করেছে।

আয়োজনে যুক্ত ছিলেন ফিল্ম ফর আস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া আফরিন, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ফিল্ম ক্লাবের সভাপতি তাসনিম তাবাস্সুম সুবাহ এবং লিখালিখির প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদা ফারজানা জামান রুপা।

সমাপনীতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে উৎসবে অংশ নেওয়া সব চলচ্চিত্র নির্মাতা, জুরি সদস্য, অতিথি, স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষার্থী, দর্শক, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

কালের আলো/এসএ

সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনযুগ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১০ অপরাহ্ণ
সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনযুগ

১১ বছরের ব্যবধানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো জারি করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় একদিকে সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর মোট বেতন ভাতাসহ ৩৩ হাজার টাকার বেশি হবে, অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মতো বিশেষ গ্রেডের কর্মকর্তাদের মোট বেতন দাঁড়াবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। শুধু বেতন নয়, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ, পেনশন বৃদ্ধি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিভিন্ন বিশেষ ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

  • সর্বনিম্ন মোট বেতন ৩৩ হাজারের বেশি
  • সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা
  • মূল বেতন, পেনশন ও ভাতায় বড় স্বস্তি
  • পদোন্নতি ছাড়াও উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ

তবে নতুন কাঠামোর পুরো আর্থিক সুবিধা একসঙ্গে মিলছে না। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। অধিকাংশ নতুন ভাতা কার্যকর হবে আরও প্রায় দেড় বছর পর, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার নতুন দিগন্ত খুলছে, অন্যদিকে এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বড় আর্থিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার, ঢাকায় আরও বেশি
নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কর্মস্থলভেদে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মুঠোফোন ভাতা যুক্ত হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় একই গ্রেডে মোট বেতন হবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা।

অন্যদিকে বিসিএসসহ নবম গ্রেডে যোগ দেওয়া তরুণ কর্মকর্তাদের মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। ভাতাসহ তাঁদের মোট আয় ৬০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি চাকরির প্রবেশপর্যায়ের বেতনেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে।

সর্বোচ্চ বেতন প্রায় আড়াই লাখ
নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ঢাকায় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, মুঠোফোন ও ধোলাই ভাতা মিলিয়ে তাঁদের মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক গাড়িসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় বেতন ব্যবস্থার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তর—দুই প্রান্তেই পরিবর্তন এসেছে।

তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন আদেশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও কর্মচারীরা সেদিন থেকেই পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাচ্ছেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে পূর্ণ বেতন কার্যকর হবে। নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা প্রথম পর্যায়ে বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, পরের ধাপে ৭৫ শতাংশ এবং শেষ পর্যায়ে শতভাগ কার্যকর হবে। ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় অঙ্কের ব্যয়ের চাপ কিছুটা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পদোন্নতি ছাড়াও বাড়বে বেতন
নতুন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো পদোন্নতি না পেলেও নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ। একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে এবং রেকর্ড সন্তোষজনক থাকলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে। পরবর্তী পর্যায়েও নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিশেষ করে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত এমন পদে দীর্ঘদিন কাজ করা কর্মচারীদের জন্য এটি আর্থিক অগ্রগতির বিকল্প পথ তৈরি করবে। ফলে শুধু পদোন্নতির ওপর নির্ভর না করেও চাকরির মেয়াদ ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকছে।

পেনশনে বড় স্বস্তি
অবসরপ্রাপ্তদের জন্যও নতুন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার কমে ৫৫ শতাংশে নামবে। তবে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে নিম্ন পেনশনভোগীদের আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড় পরিবর্তন আসছে।

ভাতায়ও নতুন চিত্র
নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়ার হার কর্মস্থল ও গ্রেডভেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয়েছে। চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াত, শিক্ষা সহায়তা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের ভাতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে অধিকাংশ নতুন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

বাড়তি ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে?
নতুন বেতনকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বেতন নিয়ে নয়, অর্থায়ন নিয়ে। মূল বেতন ও ভাতা বাড়ার ফলে সরকারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। চলতি অর্থবছরেই বর্ধিত মূল বেতনের দুই ধাপ বাস্তবায়নে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, আগামী দেড়-দুই বছরে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে। ঋণনির্ভর অর্থায়ন বা ব্যয় সংকোচনের পথ নিতে হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তবে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারও রাজস্ব আয় বাড়ানো, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় সময় পাচ্ছে। ফলে নতুন কাঠামোর সাফল্য শুধু বেতন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজস্ব সংগ্রহ ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর সক্ষমতাও।আয় বাড়ার সঙ্গে বাড়ুক সেবার মাননতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে প্রণোদনা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রবেশপর্যায়ের বেতন বৃদ্ধি, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ এবং পেনশন বৃদ্ধির ফলে সরকারি চাকরি আরও কাঠামোবদ্ধ আর্থিক সুবিধার আওতায় আসছে।

এখন চ্যালেঞ্জ হবে এই বাড়তি সুবিধার সঙ্গে সরকারি সেবার মান ও কর্মদক্ষতার প্রত্যাশিত উন্নতি নিশ্চিত করা। কারণ একটি আধুনিক বেতনব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য শুধু কর্মচারীর বেতন কত বাড়ল, তা দিয়ে নয়; সেই বিনিয়োগের বিনিময়ে রাষ্ট্র কতটা দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব সেবা দিতে পারল—শেষ পর্যন্ত তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কাঠামোর পূর্ণ সার্থকতা।

এম/এএইচ