খুঁজুন
                               
, ,
           

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি: মন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫১ অপরাহ্ণ
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি: মন্ত্রী

ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে দক্ষ মানবসম্পদ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরে ২৭তম বিসিএস টেলিযোগাযোগ ক্যাডারে যোগদানকৃত সহকারী বিভাগীয় প্রকৌশলীদের সঙ্গে আয়োজিত পরিচিতিমূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশও দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে দক্ষ মানবসম্পদ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিকায়ন ও সবার জন্য উন্নত মানের যোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে প্রকৌশলীদের মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে কাজে লাগাতে হবে।’

যোগদানকৃত প্রকৌশলীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি দায়িত্ব শুধু চাকরি নয়, এটি জনগণের সেবা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততা, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও দেশপ্রেমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ’

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে নিয়মিতভাবে সমৃদ্ধ করার জন্যও আহ্বান জানান তিনি।

ফকির মাহবুব আনাম আরও বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ সেবা পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও জনবান্ধব টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।’

সভায় ২৭তম বিসিএস টেলিযোগাযোগ ক্যাডারে যোগদানকৃত সহকারী বিভাগীয় প্রকৌশলীরা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়নে তাদের প্রত্যাশা ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে মতবিনিময় করেন।

পরিচিতি সভার শুরুতে মন্ত্রী টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরে অবস্থিত সাইবার থ্রেট ডিটেকশন এন্ড রেসপন্স (সিটিডিআর) সেন্টারের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।

টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফ হোসেন সভায় সভাপতিত্ব করেন। এতে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং নবনিযুক্ত সহকারী বিভাগীয় প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

আঞ্চলিক সংবাদপত্র বাঁচাতে তথ্যমন্ত্রীর কাছে বিএএসপির তিন দফা দাবি

বিশেষ সংবাদদাতা:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২৪ অপরাহ্ণ
আঞ্চলিক সংবাদপত্র বাঁচাতে তথ্যমন্ত্রীর কাছে বিএএসপির তিন দফা দাবি

বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংবাদপত্র পরিষদ (বিএএসপি) নেতৃবৃন্দ তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের কাছে আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংবাদপত্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিন দফা দাবি পেশ করেছেন।বুধবার (১৯ আগস্ট) বেলা ১টায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “স্বচ্ছ গণমাধ্যম হচ্ছে রাষ্ট্রের আয়না।” গণমাধ্যম সরকারের ভুল-ত্রুটির সমালোচনা করার পাশাপাশি সরকারের ভালো দিকও জনগণের সামনে তুলে ধরবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে কোনো মহল বা গোষ্ঠীর প্রভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বার্তা প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দূষিত করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। গণমাধ্যমের জন্য একটি নীতিমালা থাকা জরুরি উল্লেখ করে তিনি জানান, এ নীতিমালার কাঠামো তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমের সব স্তরের নেতৃবৃন্দের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

বিএএসপির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন মনজুর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনের মহাসচিব জাফর আহমেদ, সহ-সভাপতি শামসুল আলম খান, শওকত হোসেন, গোলাম কিবরিয়া, মাহবুবুর রহমান, যুগ্ম-মহাসচিব মোবিনুল ইসলাম মবিন, আমজাদ হোসেনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সভায় বক্তারা আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখতে বিদ্যমান বিজ্ঞাপন নীতিমালা সংশোধনের জোরালো দাবি জানান। বিএএসপির তিন দফা দাবি হলো ১.মিডিয়া তালিকাভুক্ত মফস্বলের পত্রিকায় সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে কমপক্ষে দুটি পত্রিকায় প্রদান করতে হবে, ২. বাজার মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি কলাম ইঞ্চি বিজ্ঞাপনের হার ন্যূনতম ১,০০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ৩. বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে পিপিআর ২০০৩ এবং বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র নীতিমালা ২০০৮-এর ২ নম্বর ধারার (ঙ) উপধারা ও ৩ নম্বরে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পরস্পরবিরোধী ভাষা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

কলকাতার হোটেলে আগুন: ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু, দায়ীদের বিচারের দাবি

সিরাজুল ইসলাম:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫৩ অপরাহ্ণ
কলকাতার হোটেলে আগুন: ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু, দায়ীদের বিচারের দাবি

কলকাতার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশীসুলভ নয়; ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, ব্যবসা ও পারিবারিক যোগাযোগের কারণে এ শহরের সঙ্গে রয়েছে গভীর আত্মিক বন্ধন। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কলকাতায় পাড়ি জমান। তাদের একটি বড় অংশ হাসপাতালের বাইরে তুলনামূলক কম খরচের হোটেল ও গেস্টহাউসে থাকেন। ফলে এসব আবাসিক স্থাপনায় বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনদের উপস্থিতি নিয়মিতই দেখা যায়।

কিন্তু সেই পরিচিত শহরেই এবার নয় বাংলাদেশির জীবন থেমে গেল এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। ১৯ আগস্ট গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে আগুন লাগে। হোটেলটির অবস্থান কলকাতা ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের কাছেই। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘন ধোঁয়ায় ভবনের ভেতরে আটকে পড়েন অনেকে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কলকাতা পুলিশ ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের বরাতে বলা হয়েছে, নিহত নয়জনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং আহত হয়েছেন অন্তত আটজন। তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন এবং মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে অবস্থান করছিলেন।

অন্যদিকে যুগান্তরের প্রতিবেদনে নিহত নয়জনের মধ্যে আটজন বাংলাদেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আহতের সংখ্যা ১৫ বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ভবনটির ভেতরে সংকীর্ণ কক্ষ, সরু চলাচলের পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা এবং বিকল্প বের হওয়ার পথ না থাকার অভিযোগের কথা এসেছে।

এই তথ্যের পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৃতদের জাতীয়তা ও পরিচয় কোনো সংবাদ-প্রতিবেদনের অনুমানের বিষয় হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রত্যেক নিহতের পরিচয় দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে, এই ভয়াবহ ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি সম্ভবত অন্য জায়গায়। এই মানুষগুলো কলকাতায় গিয়েছিলেন বাঁচার জন্য।

কেউ হয়তো নিজের দীর্ঘদিনের অসুস্থতার চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন। কেউ হয়তো প্রিয়জনের চিকিৎসার জন্য সঙ্গে গিয়েছিলেন। কেউ হয়তো অনেক কষ্টে জমানো টাকা নিয়ে উন্নত চিকিৎসার আশায় সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। তারা যুদ্ধ করতে যাননি, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যাননি, অবৈধ কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে যাননি। তারা গিয়েছিলেন চিকিৎসা নিতে- স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আশায়। আর সেই মানুষগুলোরই মৃত্যু হলো এমন একটি হোটেলে, যেখানে প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তার মৌলিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট ছিল না।

এখানেই প্রশ্নটি শুধু একটি দুর্ঘটনার প্রশ্ন থাকে না। এটি হয়ে ওঠে দায়িত্বের প্রশ্ন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে একজন আবাসিক অতিথির বক্তব্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর পুরো হোটেল ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, মানুষ আটকা পড়েন এবং হোটেলের প্রবেশপথ ছিল সরু ও অপ্রশস্ত। সেখানে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পাঁচতলা ভবনটির বিভিন্ন তলায় বিভিন্ন নামে একাধিক হোটেল চলছিল এবং এসব হোটেলে বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকদের যাতায়াত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে আরও গুরুতর কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। ভবনের বিভিন্ন তলায় ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করা, সংকীর্ণ চলাচলের পথ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং আগুন লাগার পর বিকল্প পথে বের হওয়ার সুযোগ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। ভবনটির অনুমোদন, নির্মাণ পরিকল্পনা এবং ব্যবসা পরিচালনার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে দায় শেষ করার সুযোগ নেই।

একটি ভবনে হোটেল পরিচালনার অনুমতি কে দিয়েছে? অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল কি না? নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছে কি না? ভবনের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কক্ষ ও চলাচলের ব্যবস্থা ছিল কি না? এক ভবনের বিভিন্ন তলায় একাধিক হোটেল কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল? জরুরি বহির্গমন পথ কোথায় ছিল? আগুন লাগার সময় হোটেলে মোট কতজন মানুষ ছিলেন? তাঁদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি? এই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

কারণ একটি প্রাণহানি আমাদের কাছে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। নয়জন মানুষ মানে নয়টি পরিবার। নয়টি ঘর। নয়টি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। নয়টি পরিবারের কাছে হয়তো আজও বিশ্বাস হচ্ছে না- যে মানুষটি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন, তিনি আর ফিরবেন না। এই জায়গায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রথম দাবি হওয়া উচিত- মৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতের সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ওপর যেন মরদেহ দেশে আনার প্রশাসনিক, কাগজপত্রের বা আর্থিক বোঝা না পড়ে। কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করা যেতে পারে। বাংলাদেশ মিশনের নিয়মিত কনস্যুলার সেবার মধ্যেই মৃতদেহ দেশে ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও নো-অবজেকশন সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। দ্বিতীয় দাবি- নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

ক্ষতিপূরণের অর্থ কোনো পরিবারের শোকের মূল্য হতে পারে না। একটি প্রাণের মূল্য টাকা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে গেলে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়, রাষ্ট্র ও দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সেই দায় থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ, হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বীমা বা আইনি কাঠামোর অধীনে যে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার নিহতদের পরিবারগুলোর রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে সক্রিয় কূটনৈতিক ও আইনি সহায়তা দিতে হবে।

প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব কল্যাণ তহবিল থেকেও জরুরি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। কারণ বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হলে তার পরিবার যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে পড়ে না যায়-সেটা নিশ্চিত করা এটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি—অগ্নিকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত।
আগুনের কারণ কী?
শর্টসার্কিট?
বৈদ্যুতিক ত্রুটি?
অগ্নিনিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন?
অবহেলা?
অবৈধ নির্মাণ?
হোটেল পরিচালনায় অনিয়ম?
নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অপরাধমূলক কারণ ছিল?

এখনই কোনো একটি কারণকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিটের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সেটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না। একইভাবে, কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা সাবোটাজ হয়েছিল- এমন দাবিও এখনই করা দায়িত্বশীল হবে না। তবে প্রশ্নটি তদন্তের আওতায় অবশ্যই থাকতে হবে।

কারণ একটি অগ্নিকাণ্ডে নয়জন বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশ বা সবাই বাংলাদেশি নাগরিক বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সুতরাং আগুনের প্রকৃত উৎস, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, ভবনের নকশা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, হোটেল পরিচালনার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি- সবকিছুর ফরেনসিক ও প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।

শুধু ‘তদন্ত চলছে’ বললেই জনগণের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। তদন্ত শেষে কী পাওয়া গেল, কার গাফিলতি ছিল, কোনো বিধি লঙ্ঘন হয়েছিল কি না, ভবনটির অনুমোদন যথাযথ ছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী কী ঘাটতি ছিল এবং সেই ঘাটতির জন্য কে দায়ী- এসব স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে আনতে হবে। প্রয়োজনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার অন্যান্য হোটেল ও গেস্টহাউসে অবস্থানরত বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ মির্জা গালিব স্ট্রিট বা নিউমার্কেট এলাকায় এ ধরনের আবাসিক হোটেলে বাংলাদেশি নাগরিকদের থাকার প্রবণতা নতুন নয়। একটি দুর্ঘটনার পর আরেকটি দুর্ঘটনা ঠেকাতে হলে এখনই ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলগুলো পরিদর্শন করা প্রয়োজন। আর এখানে একটি বৃহত্তর প্রশ্নও আছে। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা কে দেখবে?

আমাদের নাগরিকরা যখন ভারতে চিকিৎসার জন্য যান, তখন তাদের বড় একটি অংশ কলকাতায় অবস্থান করেন। হাসপাতাল-কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকলেও থাকার জায়গা, পরিবহন, জরুরি যোগাযোগ, স্থানীয় সহায়তা- এসব বিষয়ে তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেন। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশি মিশনগুলোর মাধ্যমে নিরাপদ আবাসন সম্পর্কে তথ্য, জরুরি যোগাযোগ নম্বর এবং ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল সম্পর্কে সতর্কতামূলক তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের কাছে নিরাপত্তার বিষয়টি চিকিৎসারই অংশ। কারণ একজন রোগী যখন সীমান্ত পেরিয়ে চিকিৎসা নিতে যান, তখন তার কাছে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ নয়; তার থাকার জায়গাটিও নিরাপদ হতে হবে। তার সঙ্গে থাকা স্বজনেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে হবে। আগুন লাগলে কীভাবে বের হবেন, জরুরি নম্বরে কোথায় যোগাযোগ করবেন, কাছাকাছি কোন হাসপাতাল বা কনস্যুলার সহায়তা পাওয়া যাবে- এসব তথ্য তার জানা থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের জায়গা থেকেও ঘটনাটিকে দেখতে হবে। দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ যত বাড়বে, ততই এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে যাবে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন- সব ক্ষেত্রেই এই যাতায়াত অব্যাহত থাকবে। তাই কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখলে চলবে না। একইভাবে কোনো ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে এসে বিপদে পড়লেও বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে আমরা একই ধরনের দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করব। এটাই প্রতিবেশী সম্পর্কের মানবিক ভিত্তি।

বাংলাদেশ ভারতের কাছে কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছে না। চাইছে একটি স্বাভাবিক, ন্যায্য ও মানবিক আচরণ। মৃতদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক। আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হোক। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অগ্নিনিরাপত্তা, ভবনের অনুমোদন ও হোটেল পরিচালনার বৈধতা নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করা হোক। সাবোটাজ বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হোক। এবং সর্বোপরি-তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এই দাবিগুলো কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরির দাবি নয়। কোনো দেশের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির দাবিও নয়। এটি মৃত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার দাবি। বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত এই ঘটনায় আবেগের পাশাপাশি দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া। কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনকে নিহতদের পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে একটি বিশেষ সেল গঠন করে মরদেহ ফেরত, পরিচয় নিশ্চিতকরণ, নথিপত্র, ক্ষতিপূরণ এবং তদন্ত- সবকিছুর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

আজ নয়জনের পরিবার কাঁদছে। কিন্তু প্রশ্নটি শুধু নয়টি পরিবারের নয়। প্রশ্নটি হলো-বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের জীবনের মূল্য রাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে? আমরা চাই না এই মৃত্যু কয়েক দিনের সংবাদ হয়ে হারিয়ে যাক। চাই না তদন্তের কথা বলে কয়েক মাস পর ফাইলটি কোনো দপ্তরের আলমারিতে পড়ে থাকুক। চাই না ক্ষতিপূরণের দাবি কাগজপত্রের স্তূপে চাপা পড়ে যাক। চাই না মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার পর রাষ্ট্র মনে করুক তার কাজ শেষ।

এই নয়টি মৃত্যু আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় শুধু কলকাতার একটি অগ্নিদগ্ধ হোটেল দেখা যাচ্ছে না; দেখা যাচ্ছে নাগরিক নিরাপত্তা, বিদেশে বাংলাদেশিদের অধিকার, কূটনৈতিক দায়িত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মানবিক চরিত্র। তাই এবার রাষ্ট্রকে কথা বলতে হবে- দৃঢ়ভাবে, দায়িত্ব নিয়ে।

কলকাতার আগুনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা আর ফিরে আসবেন না। তাদের পরিবারের শূন্যতা কোনো তদন্ত, কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো সরকারি বিবৃতি পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর অন্তত একটি কাজ করা সম্ভব-সত্যটা বের করে আনা। আর সেই সত্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা- এমন মৃত্যু যেন আর কোনো বাংলাদেশি পরিবারের দরজায় গিয়ে কড়া না নাড়ে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

কলকাতার আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু: শোকের পাশাপাশি চাই জবাবদিহি

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
কলকাতার আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু: শোকের পাশাপাশি চাই জবাবদিহি

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে গভীর রাতে আগুনে শিশুসহ অন্তত নয় বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি একই সঙ্গে একটি মানবিক বিপর্যয়, হোটেল নিরাপত্তাব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য একটি সংবেদনশীল পরীক্ষা। ১৯ আগস্ট ভোররাতের এ ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত ছয় থেকে আটজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুই নারী ও একটি শিশু রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। পরবাসে প্রাণ হারানো এসব নিরপরাধ মানুষের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—যে মানুষগুলো উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশের বাইরে গিয়েছিলেন, তাদের জীবনই শেষ হয়ে গেল একটি হোটেলের অগ্নি নিরাপত্তাহীনতায়। আগুনের তীব্রতা হয়তো সীমিত ছিল, কিন্তু ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবন গ্রাস করে। সরু পথ, পর্যাপ্ত বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকা, জানালাবিহীন বা দুর্বল বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তোলে। প্রাথমিক তদন্তে এসি বিস্ফোরণ ও শর্টসার্কিটকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।

এখানেই আমি প্রশ্ন তুলতে চাই যে,এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো নাশকতা, অপরাধমূলক অবহেলা কিংবা পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনাও ছিল?

আমি কোনো প্রমাণ ছাড়া নাশকতার অভিযোগকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। বরং ঠিক উল্টোটা বলছি—নাশকতার সম্ভাবনা থাকলে যেমন তা তদন্ত করতে হবে, তেমনি দুর্ঘটনা হলে দুর্ঘটনার কারণও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। আগুনের সূত্রপাত কোথায়, বৈদ্যুতিক সংযোগের অবস্থা কী ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ কী বলছে, দরজা-জানালা ও জরুরি বহির্গমনপথ সচল ছিল কি না, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও অ্যালার্ম ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, হোটেলের অনুমোদন ও ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট ছিল কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগুন লাগার আগে হোটেলটির নিরাপত্তা পরিদর্শন হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে সেই পরিদর্শনের নথি কী বলে। কারণ কোনো ভবন যদি বছরের পর বছর নিরাপত্তা বিধি না মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে, তাহলে শুধু হোটেল মালিক নয়—নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে ভবনটির চরিত্র। একই পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন তলায় একাধিক হোটেল বা গেস্টহাউস পরিচালিত হওয়ার তথ্য এসেছে। স্থানীয়ভাবে এসব আবাসিক স্থাপনায় বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রার্থীদের অবস্থানের কথাও উঠে এসেছে।

অতএব তদন্ত শুধু ‘কীভাবে আগুন লাগল’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রশ্ন করতে হবে—কেন এত মানুষ বের হতে পারলেন না?

নিহতদের পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে তাদের মোকাবিলা করতে হবে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, চিকিৎসা ব্যয়, আহতদের চিকিৎসা, যাতায়াত, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তার নির্মমতা।

এখানে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব শুধু মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করে লাশ দেশে পাঠানো নয়। বরং যদি হোটেল কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন, ভবন ব্যবস্থাপনার ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো দায় প্রমাণিত হয়, তাহলে নিহত ও আহত প্রত্যেক বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ে রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে।

সুতরাং বাংলাদেশ সরকারের উচিত কলকাতায় একটি আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা সেল গঠন করা, যাতে নিহত ও আহতদের পরিবার প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পায়। শুধু কাগজপত্রের কাজ করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; ক্ষতিপূরণ দাবি, বীমা, চিকিৎসা ব্যয়, মরদেহ পরিবহন এবং প্রয়োজনে আদালতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ বিষয়টিকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখেছে; ভারত জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং দুই দেশই সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এই সম্পর্ককে নিঃসন্দেহে সংবেদনশীল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় নয় বাংলাদেশির মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনা।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী—যিনি দীর্ঘদিনের কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান ও বাংলাদেশি অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে পরিচিত—তার সরকারের সময় এই ঘটনা ঘটেছে। তাই কোনো ধরনের রাজনৈতিক পূর্বধারণা দিয়ে ঘটনাটিকে বিচার করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি রাজনৈতিক পরিবেশের বাস্তবতাকে তদন্তের বাইরে রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

আমার বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার: নিহতরা বাংলাদেশি বলেই তাদের সঙ্গে কোনো বৈষম্য হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত; আবার বাংলাদেশি হওয়ার কারণেই ঘটনাটিকে নাশকতা হিসেবে ধরে নেওয়াও যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি না।

ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার কথা সামনে এসেছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে তারাপীঠের একটি হোটেল অগ্নিকাণ্ডেও বহু প্রাণহানি ঘটেছিল।

একই সপ্তাহে পরপর প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড হলে প্রশাসনের উচিত এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা সংকেত হিসেবে দেখা।

বিশেষ করে যেসব হোটেলে বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রার্থীরা নিয়মিত থাকেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা নিরাপত্তা অডিট করা প্রয়োজন। জরুরি বহির্গমনপথ, ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক তারের নিরাপত্তা, রান্নাঘর ও এসি ইউনিটের ঝুঁকি, ভবনের ধারণক্ষমতা এবং অতিথিদের জরুরি নির্দেশনা—সবকিছু নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

এই ট্র্যাজেডির আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো যে , নিহতদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাত, তাহলে কি তাদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে হতো?

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যায়। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় হলো মানুষের আস্থা হারানো।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে এসে আমাদের প্রশ্ন করতেই হবে—কেন এখনো জটিল চিকিৎসার জন্য মানুষকে দেশের বাইরে যেতে হয়? কেন সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত চিকিৎসা, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকবে? কেন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা যাবে না, যেখানে একজন সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করতে পারেন—দেশেই তার চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টা হবে? কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের সেই ব্যর্থতার কথাও মনে করিয়ে দিল।

নয়জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। কিন্তু তার সঙ্গে তাদের পরিচয়, চিকিৎসা ইতিহাস, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনি নথিপত্র সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারগুলো যেন ক্ষতিপূরণ পাওয়ার লড়াইয়ে একা না হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সহায়তা কাঠামো গঠন করা প্রয়োজন। ভারতের তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়, পোস্টমর্টেম ও ফরেনসিক রিপোর্ট সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, হোটেলের লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা নথি পরীক্ষা এবং দায় নির্ধারণ—সবকিছু স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া দরকার। এই তদন্তে বাংলাদেশকে শুধু দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না।

এখানে আরেকটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো যে, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কূটনৈতিক টানাপোড়েন থাকবে, সীমান্ত ও পানি থেকে শুরু করে প্রত্যর্পণ—বহু বিষয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু একজন বাংলাদেশি নাগরিক যখন ভারতের মাটিতে বিপদে পড়েন, তখন তার নাগরিক পরিচয় যেন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের কাছে পরাজিত না হয়। কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু নয়টি পরিবারের কান্না নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতার পরীক্ষাও বটে।

সুতরাং আগুন কীভাবে লাগল—তার নিরপেক্ষ উত্তর চাই। কার গাফিলতিতে মানুষ মরল—তার জবাব চাই। নাশকতা হলে তার প্রমাণ ও বিচার চাই। অপরাধমূলক অবহেলা হলে দায়ীদের শাস্তি চাই। আহতদের পূর্ণ চিকিৎসা চাই। নিহতদের মরদেহ দ্রুত ও মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফেরত চাই। আর নিহত ও আহতদের পরিবারকে ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চাই।

পরিশেষে বলতে চাই, এই ঘটনাটি কেবল পত্রিকার পাতায় কয়েকদিনের খবরের শিরোনাম হয়ে মিলে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কলকাতা উপ-হাইকমিশনকে অবিলম্বে একটি বিশেষ সেল গঠন করে নিহতদের পরিবারের কাছে দ্রুত লাশ পৌঁছানোর কাজ শেষ করতে হবে। একই সাথে, আহতদের সুচিকিৎসা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুয়ায়ী হোটেল কর্তৃপক্ষ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর মামলা দায়ের করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যাতে এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো নাশকতামূলক বা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল কিনা তা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতার সাথে খতিয়ে দেখা হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশকে শক্ত বার্তা দিতে হবে। আর নিজ ভূখণ্ডে আমাদের নীতি-নির্ধারকদের এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের ভেঙে পড়া চিকিৎসাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার সৎ উদ্যোগ নিতে হবে, যেন আর কোনো নাগরিককে চিকিৎসার খোঁজে ভীতি ও মৃত্যুর মুখে পরবাসে দিন কাটাতে না হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com