পুকুর থেকে বঙ্গোপসাগর, মৎস্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতার ডাক বিজিবি মহাপরিচালকের
মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতার ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানেই মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। তাঁর মতে, মাছ চাষের জন্য বড় জলাশয়ের অপেক্ষায় থাকার প্রয়োজন নেই; ছোট পুকুর ও অন্যান্য উপযুক্ত জলাশয়ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে জাতীয় উৎপাদনে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
‘জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬’-এর কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের শহীদ ক্যাপ্টেন আশরাফ হল সংলগ্ন পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করে ‘বিজিবির মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিজিবি মহাপরিচালক।
উৎপাদন বাড়াতে চাই সর্বস্তরের অংশগ্রহণ
কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, দেশের মৎস্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে সর্বস্তরে মাছ চাষ ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান—যেখানে মাছ চাষের উপযোগী জলাশয় রয়েছে, সেগুলোকে উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে হবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত মৎস্য উৎপাদনকে শুধু পেশা বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড হিসেবে নয়, বরং খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় খাত হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
মিঠাপানির মাছে দ্বিতীয় বাংলাদেশ, সামনে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা
বিজিবি মহাপরিচালক উল্লেখ করেন, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। যথাযথ উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা গেলে ভবিষ্যতে এ খাতে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থান অর্জন করতে পারে। তাঁর এই বক্তব্যে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় মৎস্য খাতকে আরও পরিকল্পিত ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের বিপুল সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদও যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বড় জলাশয় নয়, পরিকল্পনাই হতে পারে মূল শক্তি
মাছ চাষের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণা—বড় পুকুর বা জলাশয় না থাকলে উৎপাদন সম্ভব নয়—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানও এসেছে বিজিবি মহাপরিচালকের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ছোট পুকুরসহ বিভিন্ন উপযুক্ত জলাশয়েও নানা প্রজাতির মাছ চাষ করা সম্ভব। এর ফলে দেশের অসংখ্য ছোট ও অব্যবহৃত জলাশয়কে উৎপাদনের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পর্যায়ে মাছের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
খাদ্য ও পুষ্টির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির বহুমাত্রিক সুফলের কথাও তুলে ধরেন বিজিবি মহাপরিচালক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন বাড়লে একদিকে মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও মৎস্য খাত বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। অর্থাৎ, মাছ চাষকে কেবল খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত না রেখে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অব্যবহৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত জলাশয়কে উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
বিজিবির জলাশয়গুলোও হবে উৎপাদনমুখী
সরকারের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগকে সফল করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক। একই সঙ্গে বিজিবির বিভিন্ন স্থাপনা ও ইউনিটে থাকা পুকুর ও জলাশয়গুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করে মাছ চাষের পরিধি আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিজিবির নিজস্ব জলাশয়গুলোকে একদিকে যেমন উৎপাদনমুখী সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির সদস্যদের মধ্যেও মাছ চাষ ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে।
দুই সপ্তাহের কর্মসূচিতে পোনা অবমুক্তকরণ ও সচেতনতা
মাছের পোনা অবমুক্ত করার মধ্য দিয়ে দুই সপ্তাহব্যাপী ‘বিজিবির মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় বিজিবির বিভিন্ন স্থাপনা ও ইউনিটে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে। পাশাপাশি মাছ চাষে উদ্বুদ্ধকরণ এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ—সমন্বিত উদ্যোগই বড় চ্যালেঞ্জ
বিজিবি মহাপরিচালকের বক্তব্যে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের সামনে থাকা সম্ভাবনা ও করণীয়—দুই দিকই স্পষ্ট হয়েছে। দেশের মিঠাপানির মৎস্য উৎপাদনে শক্ত অবস্থান থাকলেও ভবিষ্যতে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; জলাশয়ের সঠিক ব্যবহার, আধুনিক চাষপদ্ধতি, রোগ নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত পোনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছোট জলাশয়কে উৎপাদনের আওতায় আনার যে আহ্বান এসেছে, তা বাস্তবায়িত হলে মৎস্য উৎপাদনকে আরও বিকেন্দ্রীভূত করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জলাশয় ব্যবহারের উদ্যোগ সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে। সব মিলিয়ে, ‘বিজিবির মৎস্য পক্ষ-২০২৬’ কেবল পোনা অবমুক্ত করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি অব্যবহৃত জলাশয়কে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো এবং জাতীয় মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি কার্যকর বার্তা বহন করছে। মিঠাপানির মাছের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের মৎস্য খাত ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার আরও শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array