হরমুজ প্রণালী চালুর আলোচনা, কমেছে তেলের দাম
হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পরিচালনা নিয়ে ইরান ও প্রতিবেশী ওমানের মধ্যে আলোচনা আবারও শুরু হয়েছে—তেহরানের এমন ঘোষণার পর বুধবার (২৬ আগস্ট) জ্বালানি তেলের বাজারে দরপতন দেখা যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৭৮ ডলার বা ২ শতাংশ কমে ৮৬.৮০ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচার্সের দাম ১.৪৯ ডলার বা ১.৮ শতাংশ কমে ৮০.৮৭ ডলারে দাঁড়ায়।
এর আগে মঙ্গলবারও উভয় বেঞ্চমার্কের তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমেছিল। ফলে টানা দুই দিনের দরপতনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ফুজিটমি সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক মিতসুরু মুরাইশির মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে পরিস্থিতি এখনো তেলের বাজারের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে এবং তেলের বিক্রির চাপ বেড়েছে।
তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এ কারণে তেলের দাম একটানা বড় ধরনের পতনের বদলে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকার মধ্যেই হরমুজ প্রণালী পরিচালনার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করেছে তেহরান। ফলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে হয়তো একটি সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো।
ইরান ও ওমান গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রণালীর পরিচালনা ও জাহাজ চলাচল নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার দুই দেশ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি ‘যৌথ অস্থায়ী নেভিগেশনাল করিডোর’ চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই করিডোর মাইনমুক্ত করার বিষয়েও তারা সম্মত হয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনে আবারও কর্মী পাঠাতে শুরু করেছে। সংঘাতের আশঙ্কায় আগে যেসব মিশন থেকে কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বা কর্মীসংখ্যা কমানো হয়েছিল, সেগুলোতে ধীরে ধীরে জনবল ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে স্বল্প মেয়াদে ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে কয়েকটি দূতাবাস শুরুতে পূর্ণ সক্ষমতায় নয়, সীমিত কর্মী নিয়ে কার্যক্রম চালাতে পারে।
অন্যদিকে, গত সোমবার ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর চাপ বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জরিমানা আরোপ করা হবে না বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ওমানের আশ শিশার এলাকা থেকে প্রায় ৯ নটিক্যাল মাইল বা ১৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অচল হয়ে পড়ে।
ঘটনাটি হরমুজ ও এর আশপাশের জলপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে ইরান ও ওমানের আলোচনার পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও তেলের বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজার থেকেও তেলের দাম কমার পক্ষে কিছুটা চাপ এসেছে। বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২১ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৪২ লাখ ব্যারেল বেড়েছে।
মজুত বৃদ্ধির অর্থ হলো বাজারে সরবরাহের চাপ তুলনামূলকভাবে বাড়তে পারে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যুক্ত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান-ওমানের আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মার্কিন তেল মজুত বৃদ্ধির খবর—এই তিনটি বিষয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি তৈরি করেছে। তবে নৌপথের নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত হওয়ায় তেলের দামে বড় ধরনের স্থিতিশীলতা আসতে আরও সময় লাগতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array