খুঁজুন
                               
, ,
           

ঢাকার যানজট কমাতে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ
ঢাকার যানজট কমাতে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা

ঢাকার চলমান যানজট নিরসনে বাস টার্মিনাল পুনর্বিন্যাস, পার্কিং ব্যবস্থা উন্নয়ন, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নসহ একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বৈঠকে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য একটি অ্যাপ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে এ কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের যানজট নিরসনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আগের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ নতুন প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকার কেন্দ্রীয় অংশে যানবাহনের চাপ কমাতে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের আগে ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে আগামী চার মাসের মধ্যে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণ, কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তর এবং সচিবালয়ের আশপাশে পার্কিং ব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ঢাকা শহরে অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন এবং অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর যানজট নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আগামী গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটা কমবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৫১ অপরাহ্ণ
আগামী গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটা কমবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। ফলে আগামী গ্রীষ্মের আগেই ন্যূনতম তিন হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে দেশ। আর এ কারণে আগামী গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটা কমে যাবে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে যশোর পিটিআই অডিটোরিয়ামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নৈতিক শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা ও মানসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করতে হবে। অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে তার দায়িত্ব নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, দলের কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রভাব বিস্তার কিংবা অরাজকতা সৃষ্টি করলে ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ যদি করতে চায়, তার বিরুদ্ধে প্রথমে সাংগঠনিক ও পরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব তো তেলের ওপর ভাসছে। সেখানে কেন তেলের দাম বাড়লো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন তেল-গ্যাসের দাম বাড়লো? বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে। সেখানে আমাদের মতো একটা দেশে সরকার কতদিন সমন্বয় না করে থাকবে?’ তারপরও সরকার জনগণের কথা ভেবে সমন্বয় করছে। এজন্য নিজেদের মধ্যে পরিমিতিবোধ তৈরি করার পাশাপাশি শিশুদেরও পরিমিত ব্যবহার শেখাতে হবে।

যশোর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মানসম্মত ও নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৯ অপরাহ্ণ
গুমের অবসান ও ন্যায়বিচারের পথে নতুন বাংলাদেশ

রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যখন তার নাগরিককে দিনদুপুরে বা রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করে দেয়, তখন তা আর কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ থাকে না—তা রূপান্তরিত হয় এক নারকীয় বন্দিশালায়। ৩০ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ বা বিশ্ব গুম দিবস। এই দিবসটি কেবল পঞ্জিকার পাতা উল্টানোর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি গুম হওয়া হাজারও মানুষের কান্না, অন্ধকারের কুঠুরিতে বন্দী জীবনের নিঃশব্দ আর্তনাদ এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার দিন। গুম কেবল একটি নির্দিষ্ট মানুষকে হারিয়ে যাওয়া বোঝায় না, এটি একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা ভুক্তভোগী পরিবারসহ সমগ্র সমাজকে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে ধ্বংস করে। গুম হওয়া প্রতিটি নাম, প্রতিটি মুখ আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিবেকের কাছে এক একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন।

কোনো শিশুর কাছে তার বাবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নন। তিনি সেই মানুষ, যিনি স্কুল থেকে ফেরার সময় হাত ধরে বাড়ি নিয়ে আসতেন। কোনো গৃহবধূর কাছে নিখোঁজ স্বামী কোনো পরিসংখ্যান নন; তিনি সংসারের নির্ভরতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের সঙ্গী। কোনো বৃদ্ধ মায়ের কাছে নিখোঁজ সন্তান আজও সেই ছোট্ট শিশুই—যে একদিন মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।

তাই একজন মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার অবস্থান অস্বীকার করা মানে শুধু একজন নাগরিককে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়; একটি পরিবারকে জীবন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। মৃত্যুতে অন্তত একটি শেষ খবর থাকে, কবর থাকে, শোকের আনুষ্ঠানিকতা থাকে। গুমের সবচেয়ে নির্মমতা হলো—এখানে শোকেরও কোনো শেষ নেই।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যূত ও পলাতক স্বৈরাচারী শাসন আমলটি চিহ্নিত হয়ে থাকবে গুম, খুন ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে। শেখ হাসিনার শাসন আমলকে টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ার ছিল রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মী, ভিন্নমতালম্বী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের গুম করা। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নারকীয় রূপ ছিল ‘আয়নাঘর’।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা পরিচালিত এই গোপন বন্দিশালাগুলো ছিল আধুনিক যুগের টর্চার সেল। জানলাহীন, আলো-বাতাসহীন, অত্যন্ত ছোট ছোট স্যাঁতসেঁতে কুঠুরিতে বন্দীদের বছরের পর বছর আঁটকে রাখা হতো। দিনে-রাতে সবসময় প্রকাণ্ড ফ্যানের আওয়াজ চালিয়ে রাখা হতো, যাতে বাইরের কোনো শব্দ ভেতরে না আসে এবং ভেতরের আর্তনাদ বাইরে না পৌঁছায়।

সেখানে বন্দীদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন—বৈদ্যুতিক শক, ওয়াটার বোর্ডিং, নখ উপড়ে ফেলা এবং হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে পিটানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাবেক সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বহিষ্কৃত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী কিংবা বারিস্টার আরমানদের মতো ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ ৮-৯ বছর পর মুক্তি পেয়ে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো সভ্য সমাজের গল্প নয়; তা যেন মধ্যযুগীয় কোনো হিংস্রতার নামান্তর।

গুমের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ফুটে ওঠে গুম হওয়া পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে। একটি স্বাভাবিক মৃত্যু মানুষকে শোক সইবার শক্তি দেয়, কিন্তু গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া একটি পরিবারকে অনন্তকাল ধরে ঝুলন্ত যন্ত্রণার মধ্যে রাখে। মায়ের আর্তনাদের কোনো শেষ নেই। “আমার বাবা কি বেঁচে আছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে?”—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে কত শত মা চোখ বোজা পর্যন্ত দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। অনেক মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সন্তানের মুখটি আর না দেখেই। ছোট্ট শিশুদের কান্না দেখলে পাষাণ হৃদয়ও কেঁপে ওঠে।

বহু শিশু রয়েছে, যারা যখন ছোট ছিল তখন তাদের বাবাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল; আজ তারা বড় হয়েছে, কিন্তু বাবার ছায়া পায়নি।  ঈদের দিন বা জন্মদিনে অন্য শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়, তখন গুম হওয়া পরিবারের শিশুরা তাদের বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। গৃহবধূর অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না। স্বামী জীবিত না মৃত—এই নিশ্চিত তথ্য না থাকায় বহু নারী সামাজিকভাবে আইনি ও পারিবারিক চরম জটিলতায় পড়েছেন। তাদের এই দীর্ঘ নীরব কান্না রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট-পাথরে আছড়ে পড়ে। ‘মায়ের ডাক’ নামক প্ল্যাটফর্মটি গত এক দশক ধরে এই কান্না ও দাবির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত ৬০০ জনের বেশি গুমের শিকার হয়েছেন।

এদের মধ্যে পরবর্তীতে অনেকের লাশ নদী বা রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে, কাউকে কাউকে কয়েক মাস বা বছর পর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, কিন্তু একটি বড় অংশের কোনো খোঁজ আজও মেলেনি। একই সাথে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৭০৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২০২১ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ “He Didn’t Even Cry: Enforced Disappearances in Bangladesh” শীর্ষক ৮২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সংস্থাটি উল্লেখ করে, তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সমালোচকদের নিশ্চিহ্ন করতে গুমকে একটি পরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তারা ৮৬টি সুনির্দিষ্ট গুমের ঘটনার বিস্তারিত তালিকা জাতিসংঘে জমা দিয়েছিল, যার সদুত্তর শেখ হাসিনার সরকার কখনোই দিতে পারেনি।

পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানায় যে র‍্যাব এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সরাসরি এই গুমের সাথে জড়িত। এসবের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাব এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু গুমের ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপি-র শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়িচালক আনসার আলীকে ঢাকার বনানী থেকে গুম করা হয়, যাদের আজ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর তিনি চিরতরে নিখোঁজ হন।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার শাহীনবাগ এলাকা থেকে ৮ জন যুবকের সাথে সাজেদুল ইসলাম সুমনকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাব-১; পরবর্তীতে সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক হিসেবে গুমবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমাকে ঢাকা থেকে গুম করা হয় এবং তিনি ৫ বছরেরও বেশি সময় আয়নাঘরে বন্দী থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর মুক্ত হন।

একইভাবে ২০১৬ সালের আগস্টে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে ৮ বছর আয়নাঘরে বন্দী রাখার পর ২০২৪ সালের আগস্টে মুক্তি পান মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান ও আবদুল্লাহিল আমান আযমী।

আন্তর্জাতিক আইনে গুম একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance’ বা ‘সব ব্যক্তির গুম হওয়া থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ’ গৃহীত হয়, যার মূল কথা হলো—কোনো অবস্থাতেই, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাহানাতেও কাউকে গুম করা যাবে না।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলন্টারি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গুমের ঘটনাগুলো তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে গুমের অভিযোগগুলো তদন্তের নিরপেক্ষ সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানালেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছিল।

বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ ও বিভিন্ন অঞ্চলে গুম প্রতিরোধে কঠোর আইনি অবকাঠামো রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার সনদ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের (ECHR) অধীনে গুমকে চরম মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফ্রান্সে গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির ক্ষেত্রে অপরাধীদের অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘Global Magnitsky Human Rights Accountability Act’-এর অধীনে আন্তর্জাতিকভাবে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যেকোনো দেশের কর্মকর্তাদের ওপর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক অবরোধ আরোপ করা হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ২০১৭ সালে তাদের নতুন ক্রিমিনাল কোডে গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে গুমের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

শ্রীলঙ্কা ২০১৮ সালে জাতিসংঘের গুমবিরোধী সনদে অনুস্বাক্ষর করে এবং গুম প্রতিরোধ আইন পাস করে, যেখানে গুমের অপরাধে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে পাকিস্তান ও ভারতে গুমের ঘটনা ঘটলেও সেখানে গুমবিরোধী আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ আইনের মারাত্মক অভাব রয়েছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন সোচ্চার।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং গঠিত হয় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার গুমের বিচার ও এটি প্রতিরোধে অভূতপূর্ব ও দৃঢ় অঙ্গিকার প্রদর্শন করেছে। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট জাতিসংঘের গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গুম বন্ধের আইনি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব আইনে পরিণত করা। ২০২৫ সালে Enforced Disappearance Prevention and Redress Ordinance-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট বর্তমান সরকার Enforced Disappearance Prevention and Redress Act, 2026-এর খসড়ায় অনুমোদন দেয়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী খসড়ায় enforced disappearance-কে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত যাওয়ার বিধান এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে; তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ ১২০ দিনের সময়সীমার কথাও বলা হয়েছে।

আমি মনে করি,এখানে সরকারের সামনে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আইনটি দ্রুত কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনটি যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কঠোর শাস্তি থাকাই যথেষ্ট নয়; স্বাধীন তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকার—সবকিছুর সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই,একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে গুমের মতো বিভীষিকার আর কখনো যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য কেবল কমিশন গঠন বা সনদে স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। জাতিসংঘের সনদের আলোকে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে গুমকে একটি পৃথক, জামিনঅযোগ্য ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকবে। ডিজিএফআই, র‍্যাব ও ডিবি-র মতো সংস্থাগুলোকে রাজনীতিকরণের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে এবং কোনো গোয়েন্দা সংস্থা যেন সাধারণ নাগরিক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গোপনে তুলে নিয়ে আটক রাখার এখতিয়ার না পায়, তার জন্য আইনি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপযুক্ত অর্থ ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে গুমের হুকুমদাতা থেকে শুরু করে সরাসরি বাস্তবায়নকারী—তা সে যত বড় প্রভাবশালী বা শীর্ষ কর্মকর্তা হোক না কেন—প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃশ্যমান শাস্তি দিতে হবে। বিশ্ব গুম দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক আর কখনোই রাতের আঁধারে গুম হবে না, কোনো মায়ের কোল আর খালি হবে না, আর কোনো শিশুকে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদতে হবে না। রাষ্ট্রকে তার বিবেকের কাছে সৎ হতে হবে; হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি নামের হিসাব দিতে হবে এবং সুবিচার সুনিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান, বড় স্বপ্ন সরকারের

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ
পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান, বড় স্বপ্ন সরকারের

আগামী পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন ফাউন্ডেশনগুলোকে নতুন কাঠামোয় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে এসব ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সমন্বয় করে ক্লাস্টারভিত্তিকভাবে কাজ করানো হবে। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতকে এই পরিকল্পনার আওতায় আনা হচ্ছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি অডিটরিয়ামে ২২টি ফাউন্ডেশনের ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগোতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল অনুমোদন করেছে। এই কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ফাউন্ডেশনগুলোর কাজ হবে এক ছাতার নিচে
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ফাউন্ডেশনগুলো এতদিন নিজ নিজ ম্যান্ডেট অনুযায়ী আলাদাভাবে কাজ করেছে। কোথাও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কোথাও দারিদ্র্য বিমোচন, কোথাও নারী উন্নয়ন কিংবা স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় এসব কার্যক্রমকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফাউন্ডেশনগুলোকে ক্লাস্টারভিত্তিকভাবে কাজ করানোর ফলে একই ধরনের প্রকল্পে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার। তবে এই সমন্বয় বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে পরিকল্পনার অন্যতম বড় পরীক্ষা।

‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ হবে কর্মসংস্থানের হাতিয়ার
কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ ধারণার আলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনাময় পণ্যকে কেন্দ্র করে ফাউন্ডেশনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি এলাকার বিশেষ পণ্যকে ঘিরে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনের ব্যবস্থা করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক, নারী উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা গেলে কর্মসংস্থানের সুফল রাজধানী বা বড় শহরের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

সৌরবিদ্যুতে পাঁচ গিগাওয়াটের লক্ষ্য
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে সরকার। বিদ্যুতের গ্রাহকদের শুধু ভোক্তা হিসেবে না রেখে উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাঁচ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এর মধ্যে ফাউন্ডেশনগুলো ইতোমধ্যে দুই গিগাওয়াট উৎপাদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়লে সৌর প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি ও কারিগরি সেবায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতেও তৈরি হবে দক্ষ জনবল
অর্থনৈতিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র স্বাস্থ্য খাত। দেশের রোগের ধরন বদলে যাওয়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। একসময় সংক্রামক রোগ ছিল প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি। এখন হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ জীবনযাপনজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে শুধু চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ানো নয়, দক্ষ জনবল তৈরিও জরুরি। নার্স, টেকনিশিয়ান এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরিতে ফাউন্ডেশনগুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে কিডনি ডায়ালাইসিস ও করোনারি কেয়ার ইউনিটের মতো সেবায় দক্ষ নার্স ও টেকনিশিয়ানের চাহিদা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাতে একদিকে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন অর্থায়নের ভাবনা
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকেও দীর্ঘমেয়াদি ও জীবনচক্রভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিবন্ধন ও সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তায় বিকল্প অর্থায়নের উৎস খোঁজা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যাকাতকে কীভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শুধু ভাতা প্রদান নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা।

এক কোটি কর্মসংস্থান—কতটা বাস্তব?
সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ঘোষণা এসেছে কর্মসংস্থান নিয়ে। বিভিন্ন ফাউন্ডেশন আগামী পাঁচ বছরে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সে বিষয়ে নিজেদের লক্ষ্য জানিয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান একাই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির নিশ্চয়তা দিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য কর্মসংস্থান যোগ করলে মোট সংখ্যা এক কোটিরও বেশি হতে পারে।।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—এই এক কোটি কর্মসংস্থানের কতটি হবে সরাসরি চাকরি, কতটি আত্মকর্মসংস্থান এবং কতটি হবে পরোক্ষ কর্মসংস্থান? এই সংজ্ঞা ও হিসাবের পদ্ধতি স্পষ্ট না হলে ভবিষ্যতে লক্ষ্য ও অর্জনের তুলনা করা কঠিন হবে। কারণ বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের জন্য শুধু চাকরি নয়, টেকসই আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

লক্ষ্যের চেয়ে বড় বাস্তবায়নের পরীক্ষা
২২টি ফাউন্ডেশনের অর্থায়ন ও কাজের ধরনও এক নয়। কোনোটি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত, কোনোটি নিজস্ব অর্থায়নে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে সরকারের সহায়তা পেয়েছে। তাই তাদের এক ছাতার নিচে এনে একই অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না। প্রয়োজন বিনিয়োগ, বাজার, দক্ষতা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা। ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ সফল করতে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার নিশ্চিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ ও গ্রিড সংযোগ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে সেই জনবলের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে সরকারের সামনে শুধু এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নয়, সেই কর্মসংস্থানকে টেকসই ও উৎপাদনশীল করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২২টি ফাউন্ডেশনের সমন্বিত উদ্যোগ যদি স্থানীয় উৎপাদন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এখন অপেক্ষা—এক কোটি কর্মসংস্থানের বড় প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব সাফল্যে রূপ নেয়।

কালের আলো/এম/এএইচ