লোডশেডিং সামলাতে বিকল্প খুঁজছে সরকার
দেশের বিদ্যুৎ খাত যেন একসঙ্গে কয়েকটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যেখানে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে চাহিদার তুলনায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। ফলে রাজধানী থেকে গ্রাম—সবখানেই বাড়ছে লোডশেডিং। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল সক্ষমতা থাকার পরও কেন বিদ্যুতের এই হাহাকার? এর উত্তর মিলছে উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের ব্যবধানেই। দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সম্প্রতি ৬২টির উৎপাদন কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ। ফলে কাগজে থাকা সক্ষমতার বড় একটি অংশ বাস্তবে কাজে লাগছে না। এক দিন দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। এর আগে আগস্টে তা উঠেছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে।
বড় ধাক্কা কয়লায়
বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক বড় কারণগুলোর একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ। এতে এক ধাক্কায় প্রায় ৬৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু পায়রা নয়, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ। বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিটেও দেখা দিয়েছে কারিগরি সমস্যা। ফলে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ‘বেসলোড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেগুলোই এখন একসঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সম্প্রতি এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সংকটটি শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভাব নয়; বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখার সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আদানিতেও ভরসা মিলছে না
কয়লার এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ঘাটতি। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্মিত। কিন্তু কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে সেখানকার উৎপাদন কমেছে। দিনে বাংলাদেশ পাচ্ছে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার তুলনায় কয়েকশ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ আসছে। পায়রার একটি ইউনিট বন্ধ এবং আদানির সরবরাহ কমে যাওয়া একই সময়ে ঘটায় জাতীয় গ্রিডে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলামও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা গ্যাসে
তবে বর্তমান সংকটের গভীরে রয়েছে গ্যাসের ঘাটতি। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু গ্যাসের অভাবে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এখানেই বিদ্যুৎ খাতের সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি সামনে আসে—বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে; নেই পর্যাপ্ত জ্বালানি। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় ঘাটতি আরও বেড়েছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সরবরাহে যে ধাক্কা লাগে, তার প্রভাবও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে গ্যাসের সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই। শিল্প, সার কারখানা, পরিবহন ও আবাসিক গ্রাহকরাও এর প্রভাব অনুভব করছেন।
শেষ ভরসা তেল হলেও সেটিও অনিশ্চিত
কয়লা ও গ্যাস—দুই উৎসেই যখন উৎপাদন কমছে, তখন সরকারের সামনে সবচেয়ে দ্রুত কার্যকর করা যায় এমন বিকল্প হয়ে উঠেছে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। উচ্চপর্যায় থেকে এসব কেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট এবং দিনে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই সমাধানেরও বড় মূল্য আছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়লা বা গ্যাসের তুলনায় ব্যয়বহুল। তার ওপর অন্তত ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির তথ্য রয়েছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সব কেন্দ্র চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ সরকার এখন অনেকটা ‘আগুন নেভানোর’ নীতিতে চলছে—যেখানে যে উৎসটি সাময়িকভাবে চালু করা সম্ভব, সেটি দিয়েই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা হচ্ছে। এতে হয়তো তাৎক্ষণিক লোডশেডিং কিছুটা কমানো যাবে, কিন্তু বাড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ।
লোডশেডিংয়ের বড় বোঝা গ্রামাঞ্চলে
সংকটের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। ঢাকায় লোডশেডিং শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোয় সরবরাহ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংকট তীব্র হওয়ায় গত ১২ আগস্ট থেকে ঢাকাতেও পরিকল্পিত লোডশেডিং শুরু করতে হয়েছে। বাস্তবে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের বাইরেও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। একপর্যায়ে সারা দেশে ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের মধ্যে ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াটই ছিল পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ঘাটতি সামলানোর বড় দায়িত্ব কার্যত গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের ওপরই চাপছে।
বিকল্প আছে, কিন্তু নেই সহজ সমাধান
সরকার এখন চারটি পথে এগোতে চাইছে—তেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো, দ্রুত এলএনজি আমদানি ও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, ত্রুটিতে বন্ধ কয়লাভিত্তিক ইউনিট দ্রুত মেরামত এবং ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানো। কিন্তু চারটি পথের প্রতিটিতেই রয়েছে আলাদা ঝুঁকি। বেশি তেল মানে বেশি খরচ, বেশি এলএনজি মানে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, কয়লা মানে সরবরাহ ও কারিগরি ঝুঁকি, আর আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানে জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন প্রশ্ন। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে সংকট তৈরি করছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, দ্রুত ৯ থেকে ১০টি বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে বর্তমান সংকটের চরিত্র আরও গভীর। এটি কোনো একটি কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ফল নয়; বরং গ্যাস, কয়লা, তেল, আমদানি করা বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ব্যবস্থাপনায় একসঙ্গে তৈরি হওয়া দুর্বলতার ফল।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array