ছিনতাইয়ের আতঙ্কে ঢাকা: দিনেও নিরাপদ নয় রাজধানী
দিনের ব্যস্ত সড়ক। চারপাশে মানুষের ভিড়। তবুও হঠাৎ ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র। কয়েক সেকেন্ডেই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মোবাইল, টাকা কিংবা সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রী। প্রতিবাদ করলে হামলা—কখনো রক্তাক্তও হচ্ছেন ভুক্তভোগী। এ যেন আর নির্দিষ্ট কোনো সময় কিংবা এলাকার গল্প নয়। রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত—সন্ধ্যার পর নির্জন সড়ক তো বটেই, দিনের ব্যস্ত এলাকাতেও ছিনতাইকারীদের দাপটে বাড়ছে নগরবাসীর আতঙ্ক।
চারশো বছরের ইতিহাসের ঢাকা আজ কোটি মানুষের জীবিকার ঠিকানা। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে ছুটছেন নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অথচ এই চলাচলের পথেই ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের ভয়ে অনেকে এখন সন্ধ্যার পর একা বের হতে চান না। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, আগারগাঁও, মতিঝিল, রমনা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা ও রামপুরার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি বসিলা এলাকায় রিকশায় যাওয়ার সময় এমনই এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন মাহিন। কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনিয়ে নেয় নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন। মাহিনের দাবি, মোহাম্মদপুর এলাকায় এমন ঘটনা এখন প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। অর্থাৎ শুধু রাতের অন্ধকার নয়, দিনের আলোতেও নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না নগরবাসী। তাজমহল রোডের এক বাসিন্দাও বলছেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী চক্রের আতঙ্ক এখনো কাটেনি।
ছিনতাই হচ্ছে, কিন্তু মামলায় ‘হারিয়ে যাচ্ছে’ ফোন
ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে অভিযোগ নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া। বনানীর কাকলী এলাকায় বিভিন্ন সময়ে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন অন্তত দুই সংবাদকর্মী। একই এলাকায় আরও একাধিক ব্যক্তি একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, থানায় গিয়ে ছিনতাইয়ের মামলা করতে চাইলেও তাদের ক্ষেত্রে মামলা না নিয়ে করা হয়েছে সাধারণ ডায়েরি। সেখানে ছিনতাইয়ের কথা উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, ফোন ‘হারিয়ে গেছে’। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগই যদি যথাযথভাবে নথিভুক্ত না হয়, তাহলে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র কতটা উঠে আসছে পুলিশের পরিসংখ্যানে?
বাসের ভেতরেও ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারী
শুধু রাস্তা নয়, নিরাপদ নয় গণপরিবহনও। নিউমার্কেট থেকে গাবতলী, টঙ্গী থেকে আব্দুল্লাহপুর কিংবা যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন রুটের লোকাল বাসে যাত্রীদের মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী আবার পুলিশে অভিযোগই করেন না। ফলে নথিভুক্ত না হওয়া এসব ঘটনা থেকে যায় হিসাবের বাইরে। আর ছিনতাইয়ের সময় বাধা দিলে ঘটছে হামলার ঘটনাও। অর্থাৎ কয়েক হাজার টাকার একটি মোবাইল ফোন কিংবা মানিব্যাগের জন্যই ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের জীবন।
অন্ধকার সড়ক যেন ছিনতাইকারীদের ‘নিরাপদ জোন’
সন্ধ্যা নামলেই নগরের অনেক এলাকায় বাড়ে আতঙ্ক। বিশেষ করে যেসব সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই, সেসব জায়গায় ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের ধরতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযানের খবর অনেক সময় আগে থেকেই ফাঁস হয়ে যায়। ফলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সরে পড়ে অপরাধীরা। হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়ে ওঠে কঠিন।
পরিসংখ্যান বলছে বড় সংকটের কথা
পুলিশের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪৭ হাজারের বেশি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৭৫টি এবং ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৮৩টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জ এলাকায় রেকর্ড হয়েছে ১৫ হাজার ৪১৯টি মামলা। তবে পুলিশের খাতায় থাকা এই সংখ্যাই পুরো চিত্র নয়। কারণ ছিনতাইয়ের পর অনেকেই মামলা করেন না। আবার কোথাও ছিনতাইয়ের বদলে ‘হারিয়ে গেছে’ হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
গ্রেপ্তার হচ্ছে, ফিরছে একই অপরাধে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, আগের তুলনায় ছিনতাই কমেছে। তালিকা ধরে অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। কিন্তু এখানেই দেখা দিচ্ছে আরেক সমস্যা—গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, বেকারত্ব ছিনতাই বাড়ার অন্যতম কারণ। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা। তাই ঢাকার ছিনতাই ঠেকাতে শুধু অভিযান আর গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অপরাধপ্রবণ এলাকাভিত্তিক নজরদারি, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, গণপরিবহনে নিরাপত্তা, পুলিশের অভিযানের তথ্য সুরক্ষা এবং গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে ফেরার পথ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। কারণ একটি মেগাসিটির নিরাপত্তা শুধু পরিসংখ্যানে কমছে কি না, তা দিয়ে মাপা যায় না। ঢাকার মানুষ দিনের আলোয় কিংবা রাতের অন্ধকারে—ভয় ছাড়াই ঘরে ফিরতে পারছেন কি না, নিরাপত্তার আসল পরীক্ষা সেখানেই।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array