একদিকে বেতন বাড়ার স্বস্তি, অন্যদিকে বাজারে দাম বাড়ার শঙ্কা—নতুন পে-স্কেল ঘিরে তৈরি হয়েছে এমনই দ্বিমুখী বাস্তবতা। সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। কিন্তু তাদের হাতে বাড়তি অর্থ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই বহন করতে হতে পারে।
গত সোমবার (৩০ আগস্ট) মন্ত্রিসভায় নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পর সরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে এর বিপরীতে বেসরকারি খাতের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কর্মজীবীর বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লেও বেসরকারি খাতের আয় একই হারে না বাড়লে দুই খাতের মধ্যে আয়বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাড়তি টাকার প্রথম ধাক্কা বাজারে
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কার মূল জায়গাটি হলো—৩০ লাখ মানুষের হাতে একসঙ্গে বাড়তি অর্থ পৌঁছালে ভোগের চাহিদা বাড়বে। সাধারণত অতিরিক্ত আয় পাওয়ার পর মানুষের প্রথম দিকের ব্যয় যায় খাদ্য, পোশাক, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে। কিন্তু সরবরাহ যদি একই গতিতে না বাড়ে, তাহলে চাহিদার এই বাড়তি চাপ সরাসরি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, পে-স্কেল দেওয়া স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জ। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সরবরাহ না বাড়লে তার প্রভাব দামের ওপর পড়তে পারে।
মূলত তিনটি পথে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। প্রথমত, বাড়তি আয় থেকে ভোগ বাড়লে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারি বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপরও কর্মীদের বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে চাপিয়ে দিলে তৈরি হবে খরচজনিত মূল্যস্ফীতি। তৃতীয়ত, বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকার যদি অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করে, তাহলে অর্থনীতিতে তারল্য বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বছরে বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা
নতুন পে-স্কেল শুধু বাজার নয়, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকেও বড় পরীক্ষার মুখে ফেলছে। পুরো কাঠামো বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এটি এককালীন কোনো ব্যয় নয়; বেতন-ভাতা, পেনশন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধার ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় বর্তমান রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে রাজস্ব আদায় বাড়ানো ছাড়া এ ব্যয় সামলানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই যখন বড় চ্যালেঞ্জ, তখন নতুন করে এত বড় স্থায়ী ব্যয় যুক্ত হওয়ায় বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়বে।
ধাপে বাস্তবায়নে চাপ কমানোর চেষ্টা
সরকার অবশ্য একসঙ্গে পুরো ব্যয়ের চাপ না দিয়ে ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। সরকারের দৃষ্টিতে এই ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন তাৎক্ষণিক রাজস্ব চাপ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাড়তি ব্যয়ের দায় থেকেই যাবে।
রাজস্ব বাড়ানোই টেকসই সমাধান
নতুন ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সরকারের সামনে মূলত তিনটি পথ—রাজস্ব বাড়ানো, অন্য খাতের ব্যয় কমানো অথবা ঋণ নেওয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে টেকসই পথ রাজস্ব বাড়ানো। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, অপ্রয়োজনীয় কর-ছাড় পুনর্বিবেচনা এবং উচ্চ আয় ও সম্পদের ওপর কার্যকর কর নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ কমিয়ে বেতন-ভাতা মেটানো হলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ বেতন ও পেনশন একবার বাড়লে তা কমানো কঠিন; ফলে এগুলো বাজেটের অনমনীয় ব্যয়ে পরিণত হয়।
ঋণ নিলে বাড়বে আরেক ঝুঁকি
২০২৬-২৭ অর্থবছরে অনুদান বাদে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। পে-স্কেলের অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে আরও ব্যাংকঋণ নিতে হলে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও চাপে পড়তে পারে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array