মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনা নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করাই এখন ঢাকার অধস্তন আদালতে মামলার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় অগ্রাধিকার। আর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রায়ের পরিসংখ্যানে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে রায়ে নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় আসামিদের সাজা পাওয়ার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪২ শতাংশে।
আগের দুই সরকারের সময়ে এই হার ছিল ২২ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্রতি ১০০ আসামির মধ্যে প্রায় ১৪ জন বেশি সাজা পাচ্ছেন। বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার ‘কোয়ালিটি ডিসপোজাল’ বা গুণগত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই এই পরিবর্তন এসেছে। ঢাকার সিএমএম আদালতের ৪৭ মাসে রায়ে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সাক্ষী হাজিরে নতুন উদ্যোগ
বর্তমান সিএমএম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে মামলার গুণগত নিষ্পত্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের যথাযথভাবে আদালতে হাজির করা এবং তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। সাক্ষীদের প্রসেস যথাযথভাবে দেওয়া হচ্ছে কি না, প্রসেস কার্যকর হচ্ছে কি না—তা নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোনো সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হলে তাকে ফিরিয়ে না দিয়ে যথাসম্ভব সেদিনই সাক্ষ্যগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব সাক্ষীর মোবাইল নম্বর রয়েছে, তাদের এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তারিখ জানানো হচ্ছে। এক মাস আগে, তিন দিন আগে এবং সাক্ষ্য দেওয়ার আগেও দেওয়া হচ্ছে স্মরণবার্তা। এতে সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি এবং সাক্ষ্য রেকর্ডের হার বেড়েছে।
প্রমাণনির্ভর মামলায় দ্রুত নিষ্পত্তি
মামলার গুণগত নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে চুরি, মারামারি ও অন্যান্য প্রমাণনির্ভর মামলা চিহ্নিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব মামলায় আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে আদালতের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়াও এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে শুধু মামলার সংখ্যা কমানোর জন্য নিষ্পত্তির পরিবর্তে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় সাক্ষীরা আদালতে হাজির হওয়ায় এবং তাদের সাক্ষ্য রেকর্ড হওয়ায় মামলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিচারকের সামনে আসছে। ফলে যেসব মামলায় আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে, সেসব মামলায় সাজা দেওয়ার সুযোগও বাড়ছে।
সাজা শুধু প্রমাণিতদের
গুণগত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো—একটি মামলায় একাধিক আসামি থাকলেও সবাইকে একসঙ্গে সাজা দেওয়া হচ্ছে না। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে, শুধু তাকেই সাজা দেওয়া হচ্ছে। আর পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে দেওয়া হচ্ছে খালাস। আদালতসংশ্লিষ্টরা জানান, সিএমএম আদালতের বিচারকদের মধ্যে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে সাজার হার সবচেয়ে বেশি। তার আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণকে গুরুত্ব দিয়ে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা এবং প্রমাণিত না হলে খালাস দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২৩ মাসে রায়ে নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় আসামিদের সাজা পাওয়ার হার ছিল ২২ দশমিক ২১ শতাংশ। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে হার ছিল ২২ দশমিক ২৯ শতাংশ। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সাজার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪২ শতাংশে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি থাকা সাজার হার ছয় মাসে ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়াকে বিচারসংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সাক্ষ্যগ্রহণে গতি, সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রমাণনির্ভর মামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে বিচারিক কার্যক্রম আরও কার্যকর হয়েছে।
সামনে আরও ভালো ফলের প্রত্যাশা
সাজার হার বাড়লেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামি খালাস পাচ্ছেন। বিচারসংশ্লিষ্টদের মতে, এর বড় কারণ তদন্তের দুর্বলতা, পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারা এবং সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে ব্যর্থতা।
তবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে সাজার হার আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন। একই সঙ্গে মামলার গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে দুর্বল ও ভিত্তিহীন মামলার সংখ্যাও কমে আসবে। সব মিলিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array