ইরানকে কাছে রাখছে বেইজিং!
কূটনীতিতে কখনো নীরবতাই সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে চীনের আচরণ যেন সেই পুরোনো কূটনৈতিক পাঠেরই নতুন উদাহরণ। ইরানের বিরুদ্ধে ‘সামরিক হামলার’ নিন্দা জানিয়ে এসসিও যখন সম্মিলিত অবস্থান ঘোষণা করল, চীনও তার বাইরে যায়নি।
কিন্তু একই সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়নি। ইরানি সংবাদমাধ্যম দুই নেতার সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের খবর দিলেও বেইজিং এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এই ব্যবধানই চীনের কৌশলের আসল চিত্র তুলে ধরে। ইরানকে প্রয়োজনের সময় সমর্থন করবে চীন, কিন্তু তেহরানের সংঘাতের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে জড়াবে না, যাতে তার বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়ে।
চীনের কাছে যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ ইরান
চীনের কাছে ইরান গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, জ্বালানি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি তেল তুলনামূলক কম দামে পাওয়ার সুযোগ চীনের জন্য আকর্ষণীয়। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ও বাণিজ্যপথে ইরানের কৌশলগত অবস্থান। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় তেহরান বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। কিন্তু ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতারও মূল্য আছে। তেহরানের পক্ষে দৃশ্যমানভাবে দাঁড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও নিরাপত্তা—বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক এমনিতেই উত্তপ্ত। এর মধ্যে ইরান ইস্যুতে সরাসরি অবস্থান নিলে চীনের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আসল পরীক্ষাটি উপসাগরে
চীনের হিসাব আরও জটিল করে তুলেছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক। সৌদি আরব চীনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদার। আরব আমিরাত হয়ে উঠেছে চীনের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ দুই দেশই ইরানকে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে তেহরানের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে রিয়াদ ও আবুধাবির আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর এই ঝুঁকি নেওয়ার মতো অবস্থায় চীন নেই। বেইজিংয়ের লক্ষ্য তাই মধ্যপ্রাচ্যে পক্ষ বেছে নেওয়া নয়; বরং এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী থাকে।
এসসিওতে ঐক্য, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সংযম
ইরানের পক্ষে এসসিওর বিবৃতি অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। চীন ও রাশিয়ার প্রভাববলয়ে থাকা এই জোট পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে আগ্রহী। তবে যৌথ বিবৃতি আর চীনের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান এক নয়। বেইজিং এসসিওর সম্মিলিত নিন্দাকে সমর্থন করেছে, কিন্তু ইরান ইস্যুকে নিজের দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির কেন্দ্র বানায়নি। শি ও পেজেশকিয়ানের আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হওয়া এবং তাদের কথোপকথন নিয়ে চীনের নীরবতা সেই সীমারেখাটিই স্পষ্ট করেছে। বার্তাটি যেন এমন—ইরানকে একা ফেলে দেওয়া হবে না, কিন্তু ইরানের হয়ে লড়তেও নামবে না চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন অঙ্ক
চীনের এই ভারসাম্যনীতি ওয়াশিংটনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই চীনকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ধরে নিতে পারবে না। আবার বেইজিং তেহরানের পাশে সব ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়াবে—এমন ধারণাও ভুল। চীনের হিসাব সরল, যেমন—যেখানে ইরান চীনের স্বার্থে প্রয়োজনীয়, সেখানে ঘনিষ্ঠতা; যেখানে ইরান ঝুঁকির কারণ, সেখানে দূরত্ব। বিশকেকে চীনের নীরবতা তাই দ্বিধা নয়, কৌশল। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় শক্তিগুলোর সঙ্গেও দরজা খোলা রাখার এই নীতি মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠছে।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array