দামি ইলিশ বেচেও পকেট ফাঁকা, দাদনের কিস্তিতে বন্দি জেলেরা
মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের দেখা মিললেও স্বস্তি নেই ভোলার চরফ্যাশনের জেলেদের জীবনে। দিনের পর দিন নদী-সাগরে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরলেও দাদনের ঋণ আর আড়তদারদের কমিশনের চাপে মাছ বিক্রির অর্থের বড় অংশই চলে যাচ্ছে মহাজনের কিস্তি পরিশোধে। ফলে দামি ইলিশ ধরেও অনেক জেলের পকেট থাকছে প্রায় শূন্য।
চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাটে নোঙর করা নৌকায় বসে জাল সেলাই করতে করতে ৩২ বছর বয়সি জেলে আবদুল বলেন, চার দিন আগে পাঁচজন মাঝি-মাল্লা নিয়ে নদীতে গিয়ে ৬৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। তবে সেই অর্থের সিংহভাগই চলে গেছে মহাজনের দাদনের কিস্তিতে। হাতে থাকা টাকা দিয়ে সংসারের চাল-ডাল কিনতে আবারও তাকে ধার করতে হয়েছে।
একই ঘাটে জাল মেরামত করা রফিক মাঝি, ইদ্রিস, আব্বাস উদ্দিন ও রত্তন মাঝির কথাতেও উঠে আসে একই হতাশার চিত্র। তাদের ভাষ্য, নদী-সাগরে মাছ পাওয়া গেলেও দাদনের ঋণ পরিশোধের পর হাতে তেমন কিছুই থাকে না।
চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি নিবন্ধিত জেলে ৪৪ হাজার ২৮১ জন এবং অনিবন্ধিত প্রায় ৪৬ হাজার। এ ছাড়া সমুদ্রগামী নিবন্ধিত ট্রলার রয়েছে ১ হাজার ৩৬৫টি।
জেলেদের অভিযোগ, ট্রলারের জাল কেনা, জ্বালানি সংগ্রহ এবং মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার চালাতে মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিতে হয়। সেই ঋণ নেওয়ার পর নির্দিষ্ট আড়তদারের কাছে মাছ বিক্রি করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। মাছ বিক্রির সময় কমিশন কেটে নেওয়ার পর ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে হয়। ফলে এক খেপের আয় দিয়ে আগের দেনা মেটাতেই নতুন করে ঋণ নিতে হয় অনেককে।
সামরাজ ঘাটের কাশেম মাঝি ও কবির মাঝি বলেন, ট্রলার চালানোর দৈনন্দিন খরচ এবং আড়তদারের কিস্তি পরিশোধ করার পর হাতে টাকা থাকে না। ফলে বছরের পর বছর দেনার বোঝা টানতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সামরাজ মৎস্যঘাটের আড়তদার হেলাল উদ্দিন টিপুর দাবি, ঘাটের ৯৮ জন আড়তদার প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দাদন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন। আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় জেলেরা সেই দাদন পরিশোধ করতে পারছেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে মৎস্যঘাটে জেলেদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারাও নানা অনিয়মের অভিযোগ করছেন। মাইনউদ্দিন মৎস্যঘাটে ইলিশ কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ভরা মৌসুমেও এক হালি মাঝারি আকারের ইলিশ কিনতে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, আড়তদাররা নানা অজুহাতে ইলিশের দাম বাড়াচ্ছেন। পাশাপাশি ইলিশে ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য মাছে ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হচ্ছে।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তবে বাজারে দাম চড়া। জেলেদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, দাদন দেওয়ার কারণে আড়তদাররা জেলেদের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে থাকতে পারেন। তবে সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকেও কমিশন নেওয়ার বিষয়টি তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে মৎস্যঘাটের আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array