পাবনার সুজানগরের ‘শস্যভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত গাজনার বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কচুরিপানা। এতে চলতি মৌসুমে বোনা আমন ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। শুধু আমন ধান নয়, আসন্ন শুকনো মৌসুমে পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আয়তনের গাজনার বিলের বড় একটি অংশ কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। সাময়িকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও বছরের পর বছর সমস্যাটির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাই স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
১০ হাজার হেক্টরের বিলে কচুরিপানার বিস্তার
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গাজনার বিলে এ বছর প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে বোনা আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। বর্ষায় বিলে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় মৌসুমের শুরুতে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন কৃষকরা। সাধারণত পানির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বোনা আমন ধানের গাছও বেড়ে ওঠে। কিন্তু এবার কচুরিপানার ব্যাপক বিস্তারে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে বিলের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর অংশ কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নিজেদের চেষ্টায় কচুরিপানা সরাতে পারছেন না কৃষকরা
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষার আগে কচুরিপানা ধ্বংস করতে সরকারি উদ্যোগে কীটনাশক বা রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। এতে কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে কচুরিপানা পচে নষ্ট হলেও বর্ষা শুরু হলে আবারও এর বিস্তার ঘটে। ফলে বছরের পর বছর একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের।
গাজনার বিল এলাকার সাধুপুর গ্রামের আমন চাষি গফুর বলেন, জমিতে এত কচুরিপানা জমেছে যে নিজেরা চেষ্টা করেও তা সরাতে পারছেন না। এতে ধানগাছের ক্ষতি হচ্ছে এবং ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খয়রান এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, কচুরিপানার কারণে বছরের পর বছর ধান ও পেঁয়াজের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এ সমস্যা থেকে কৃষকদের মুক্তি দিতে কৃষি বিভাগের স্থায়ী সমাধান বের করা উচিত। উলাট গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন মনে করেন, শুধু বিষ প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে কচুরিপানা ধ্বংসের চেষ্টা না করে শুকনো মৌসুমে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করে বিল থেকে এগুলো তুলে ফেলা প্রয়োজন। এতে কৃষকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমতে পারে।
কৃষি বিভাগের উদ্যোগ, স্থায়ী সমাধানের দাবি
কচুরিপানা অপসারণের বিষয়ে সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সরকারি উদ্যোগে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশনায় কৃষক, শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কচুরিপানা সরানোর কাজ করছেন। ফসল উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর রাশেদুজ্জামান দাবি করেছেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার বিলে কচুরিপানার পরিমাণ কম রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, শুরু থেকেই কীটনাশক প্রয়োগ করে কচুরিপানা ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। শুকনো মৌসুমে অবশিষ্ট কচুরিপানা অপসারণ করা হবে। পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, গাজনার বিল থেকে কচুরিপানা অপসারণে কৃষি বিভাগের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জমির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
রাসায়নিক প্রয়োগে জলজ পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা
কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভাবে কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কচুরিপানা অপসারণে যান্ত্রিক পদ্ধতি কিংবা শ্রমিকের মাধ্যমে তুলে ফেলার মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কচুরিপানা হতে পারে জৈব সারের কাঁচামাল
কচুরিপানাকে শুধু সমস্যা হিসেবে না দেখে কৃষিকাজে ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুকনো মৌসুমে বিল থেকে কচুরিপানা তুলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরি করা যেতে পারে। এতে একদিকে বিলের পানি ও কৃষিজমি কচুরিপানার চাপ থেকে মুক্ত হবে, অন্যদিকে কৃষকরা ফসল উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য জৈব সার পাবেন।
দোতলা কৃষি পদ্ধতির উদ্ভাবক কৃষিবিদ জাফর সাদেক বলেন, নিয়ম মেনে বিষ প্রয়োগ করলে মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে তাঁর মতে, কচুরিপানাকে কৃষি ও কৃষকের জন্য সম্পদে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। এগুলো তুলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ব্যবহার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। গাজনার বিলের কচুরিপানা সমস্যা সমাধানে তাই শুধু সাময়িক রাসায়নিক প্রয়োগ নয়, পরিকল্পিতভাবে অপসারণ, পরিবেশের সুরক্ষা এবং জৈব সার উৎপাদনের মতো উদ্যোগও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠেছে। কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমন ধানের ফলন এবং পরবর্তী মৌসুমের পেঁয়াজ চাষে কৃষকদের অনিশ্চয়তা থেকেই যেতে পারে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]