উপাচার্য বদলের হিড়িক, অস্থির ক্যাম্পাস
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগের পর দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত মেয়াদ চার বছর। কিন্তু সেই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক উপাচার্যকে অব্যাহতি, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর কিংবা নতুন করে নিয়োগের ঘটনায় দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কোথাও দায়িত্ব নেওয়ার ৩৭ দিনের মাথায় পরিবর্তন, কোথাও ৫৬ দিনের মধ্যেই নতুন উপাচার্য। আর এসব সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া গড়াচ্ছে ক্যাম্পাসের আন্দোলন, শাটডাউন ও একাডেমিক কার্যক্রমে অচলাবস্থার দিকে। চুয়েটের পর ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়েও নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ সামনে এসেছে। ফলে আলোচনায় এখন শুধু নিয়োগের বৈধতা নয়—উপাচার্য পরিবর্তনের এই ঘনঘটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও একাডেমিক পরিবেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটিও।
৫৬ দিনেই শেষ দায়িত্ব
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর তার স্থলে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
- ৩৭ ও ৫৬ দিনের মাথায় পরিবর্তন
- চুয়েটে শাটডাউন, ঢাকা সেন্ট্রালেও আন্দোলনের হুমকি
- একাডেমিক কার্যক্রমে তৈরি হচ্ছে চাপ
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, অব্যাহতির সময় অধ্যাপক সায়েম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঢাকায় দাপ্তরিক কাজে ছিলেন। সেখানেই তিনি সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারেন বলে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে একাধিক কাজ শুরু করেছিলেন এবং অব্যাহতির দিনও দায়িত্ব পালন করছিলেন। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আগে কোনো ধারণা ছিল না বলেও জানান তিনি।
ঘটনার পরই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু হয়। সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক সমিতির কর্মসূচিতেও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে।
৩৭ দিন পর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে
এর আগে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটেছে আরও দ্রুত পরিবর্তনের ঘটনা। গত ১৯ জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাতকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মাত্র ৩৭ দিন পর ২৫ আগস্ট তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য করা হয়।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নিয়োগের ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে প্রতিটি নিয়োগ বা অব্যাহতির পেছনে আলাদা প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট থাকতে পারে। ফলে এসব ঘটনার কারণ ও সিদ্ধান্তের ভিত্তি পৃথকভাবে পর্যালোচনা করাই বাস্তবসম্মত।
ঢাকা সেন্ট্রালেও ক্ষোভ
উপাচার্য পরিবর্তনের নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাত কলেজ নিয়ে গঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলামকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান।
নতুন নিয়োগের পর শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদায়ী উপাচার্য নুরুল ইসলামকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে দাবি আদায় না হলে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবমুক্ত কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা থেকেই তারা উপাচার্য নিয়োগে ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। নতুন নিয়োগ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তাদের অভিযোগ। চলমান মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বদল শুধু পদে নয়, প্রভাব শ্রেণিকক্ষেও
উপাচার্য পরিবর্তনের অভিঘাত প্রশাসনিক কক্ষের মধ্যেই আটকে থাকে না। শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, একাডেমিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের সঙ্গে উপাচার্যের সিদ্ধান্ত সরাসরি যুক্ত।
শিক্ষাবিদদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে নেতৃত্ব বদলে গেলে নতুন প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় কমে যায় এবং চলমান উদ্যোগে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। চুয়েটের শাটডাউন পরিস্থিতি দেখিয়েছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রমেও পড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ এস এম ফায়েজ মনে করেন, উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটির প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এমন পরিস্থিতি কমানো সম্ভব হতো। তার বক্তব্য, সার্চ কমিটির মাধ্যমে সিভি সংগ্রহ, প্রার্থীদের শর্টলিস্ট ও প্রয়োজন হলে ভাইভা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পরে সম্ভাব্য উপাচার্যদের তালিকা তৈরির কথাও ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের দাবি, নিয়ম মেনেই নিয়োগ
তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নিয়মের বাইরে যাওয়ার অভিযোগ মানছেন না শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, সার্চ কমিটি প্রার্থীদের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল উপস্থাপন হয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আচার্যের কাছে যায়। তার ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়াই নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থিতিশীলতার প্রশ্ন সামনে
বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই বারবার পরিবর্তন হলে প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও একাডেমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা কতটা বজায় থাকে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। চুয়েটে আন্দোলন, গোবিপ্রবিতে দ্রুত স্থানান্তর এবং ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে অসন্তোষ—তিনটি ঘটনা ভিন্ন হলেও একটি অভিন্ন বিষয় সামনে এনেছে: উপাচার্য নিয়োগ শুধু একজন ব্যক্তিকে একটি পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থিতি, একাডেমিক ধারাবাহিকতা এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ। তাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে শুধু নতুন উপাচার্যের নাম নয়—নিয়োগের প্রক্রিয়া, পরিবর্তনের কারণ এবং একটি প্রশাসনকে কাজ করার জন্য দেওয়া সময়—এই তিনটির স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতাও।
কালের আলো/টিই/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array