সম্প্রতি একটি পারফর্মিং আর্টের কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি তার সঙ্গীকে কখনো উত্তেজিতভাবে ঝাঁকিয়ে কথা বলছেন, আবার কিছুক্ষণ পরই তাকে কাছে টেনে আদর করছেন। আচরণের এমন আকস্মিক পরিবর্তন অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় নির্যাতন ও অতিরিক্ত স্নেহের এমন পুনরাবৃত্ত চক্র কখনো কখনো ‘ট্রমা বন্ডিং’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি এমন এক ধরনের জটিল আবেগীয় সংযুক্তি, যেখানে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ক্ষতিকর সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও মানসিকভাবে সেই সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে আটকে থাকতে পারেন।
তবে কোনো সম্পর্কে ঝগড়া, মতবিরোধ বা আচরণের পরিবর্তন দেখা গেলেই সেটিকে ‘ট্রমা বন্ডিং’ বলা যায় না। এখানে নির্যাতন, ভয়, নিয়ন্ত্রণ এবং পরবর্তী সময়ে ইতিবাচক আচরণের পুনরাবৃত্ত চক্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘ট্রমা বন্ডিং’ কী?
‘ট্রমা বন্ডিং’ বলতে সাধারণত এমন আবেগীয় সংযুক্তিকে বোঝানো হয়, যা নির্যাতন, ভয়, অপমান বা নিয়ন্ত্রণের মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মধ্যেও তৈরি হতে পারে। একটি পর্যায়ে কষ্ট বা নির্যাতন এবং অন্য পর্যায়ে ভালোবাসা, ক্ষমা চাওয়া কিংবা অতিরিক্ত যত্ন—এভাবে আচরণের বারবার পরিবর্তন ভুক্তভোগীর মধ্যে শক্তিশালী আবেগীয় নির্ভরতা তৈরি করতে পারে।
এই ধারণাকে জনপ্রিয়ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন মার্কিন মনোবিজ্ঞানী প্যাট্রিক কার্নেস। তার ব্যাখ্যায়, নির্যাতন ও ইতিবাচক আচরণের পুনরাবৃত্ত চক্র একটি সম্পর্ককে ভুক্তভোগীর কাছে একইসঙ্গে কষ্টদায়ক এবং আবেগগতভাবে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে
ট্রমা বন্ডিংয়ের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি সম্পর্কটি ক্ষতিকর বুঝতে পারলেও সেখান থেকে বের হতে না-ও পারেন। বারবার নির্যাতনের পরও সঙ্গীকে ক্ষমা করে দেওয়া কিংবা নির্যাতনের ঘটনাকে ছোট করে দেখা বা অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
পরিবার ও বন্ধুদের সতর্কতাকেও কেউ কেউ গুরুত্ব দিতে চান না। আবার নির্যাতনের পর সঙ্গীর সামান্য ভালো আচরণ, ক্ষমা চাওয়া বা যত্নেও সম্পর্কটি আবার ভালো হয়ে যাবে—এমন আশাবাদ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সম্পর্কের নেতিবাচক দিক অন্যদের কাছ থেকে গোপন করা এবং ধীরে ধীরে পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক পরিসর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো আচরণও দেখা যেতে পারে।
কেন সম্পর্ক থেকে বের হওয়া কঠিন?
ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি শুধু আবেগের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে আত্মবিশ্বাস, নিরাপত্তা, সামাজিক পরিস্থিতি, সন্তান, আর্থিক নির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার ফলে নির্যাতনকারী ব্যক্তির সঙ্গেই গভীর আবেগীয় নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। ফলে সম্পর্ক শেষ করার চিন্তা করলে একাকিত্ব, ভয় কিংবা অসহায়ত্বের অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—‘এবার হয়তো বদলে যাবে’—এই আশা। নির্যাতনের পর সঙ্গী হঠাৎ ক্ষমা চাইলে, যত্ন নিলে বা ভালো আচরণ করলে ভুক্তভোগীর মনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সেই আশাই তাকে আবার সম্পর্কটির মধ্যে ফিরিয়ে নিতে পারে।
আত্মবিশ্বাসে আঘাতও বড় কারণ
দীর্ঘদিনের অপমান, নিয়ন্ত্রণ বা মানসিক নির্যাতন একজন মানুষের আত্মমর্যাদাকে দুর্বল করে দিতে পারে। একপর্যায়ে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, তিনি এর চেয়ে ভালো কোনো সম্পর্ক পাওয়ার যোগ্য নন। ফলে ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার আত্মবিশ্বাসও কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে সম্পর্ক শেষ করার পর কোথায় যাবেন, কীভাবে জীবন চালাবেন, সন্তানদের কী হবে কিংবা নির্যাতনকারী আরও ক্ষতি করতে পারেন কি না—এসব প্রশ্নও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
নির্যাতনের পর ভালো আচরণ কেন বিভ্রান্ত করে?
নির্যাতনের পর হঠাৎ ভালোবাসা, ক্ষমা চাওয়া কিংবা অতিরিক্ত যত্ন ভুক্তভোগীর মধ্যে সাময়িক স্বস্তি তৈরি করতে পারে। এরপর আবার নির্যাতন ফিরে এলে সম্পর্কটি তীব্র আবেগীয় ওঠানামার মধ্যে পড়ে।
এই চক্রের কারণে একজন মানুষ একই ব্যক্তির কাছ থেকেই একদিকে ভয় বা কষ্ট এবং অন্যদিকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি পেতে পারেন। ফলে সম্পর্কটি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাই আগে
নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বস্ত পরিবার, বন্ধু কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা সহায়ক হতে পারে। একা পরিস্থিতি সামলানোর পরিবর্তে নিরাপদ একটি সহায়তার নেটওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি।
পরিস্থিতি নিরাপদ হলে নির্যাতনকারী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত বা বন্ধ করার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যোগাযোগ বন্ধ করলে যদি ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে, তাহলে আগে নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
কী ধরনের আচরণ বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তা তারিখসহ সংরক্ষণ করাও প্রয়োজনের সময় কাজে আসতে পারে। এতে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো পরিষ্কারভাবে বোঝার পাশাপাশি প্রয়োজনে সহায়তা চাইতেও সুবিধা হতে পারে।
পেশাদার সহায়তা নেওয়া জরুরি হতে পারে
দীর্ঘদিনের নির্যাতনে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিজের প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সম্পর্কে শারীরিক নির্যাতন, হুমকি বা তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে স্থানীয় সহায়তা ও জরুরি সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সম্পর্ক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিরাপদভাবে বের হওয়ার পরিকল্পনা করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সম্পর্ক শেষ হওয়া মানেই ব্যর্থতা নয়
একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সবসময় সাফল্যের পরিচয় নয়। কোনো সম্পর্ক যদি একজন মানুষের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও মানসিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে পরিবার ও কাছের মানুষদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ করা বা ‘কেন সম্পর্ক ছাড়ছেন না’—এমন প্রশ্ন করার পরিবর্তে তার কথা শোনা, পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিরাপদভাবে সহায়তা করার চেষ্টা করা বেশি কার্যকর।
ট্রমা বন্ডিং ভাঙার ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে নিজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সম্পর্কের ক্ষতিকর দিকটি স্বীকার করা। আর কেউ যদি তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে থাকেন, তাহলে সম্পর্ক ছাড়ার আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array