সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দিয়েছে নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট। পুরোনো টিউবওয়েলগুলো থেকে পানি না ওঠায় কয়েক হাজার পরিবার পড়েছে চরম দুর্ভোগে। কোথাও একটি সরকারি টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরশীল ১৫টি পরিবার, আবার কোনো গ্রামে শত শত পরিবারের জন্য অচল হয়ে আছে একাধিক নলকূপ। পানির অভাবে রান্না, গোসলসহ দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চললেও প্রয়োজনীয় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে অনেক পরিবারকে দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় বাধ্য হয়ে পুকুরের দূষিত পানিও ব্যবহার করছেন বাসিন্দারা।
পানির স্তর নেমেছে ৪০-৪৫ ফুট গভীরে
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে হাওড়াঞ্চলে পানির স্থিতিশীল স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট গভীরে চলে গেছে। ফলে প্রচলিত হ্যান্ডপাম্প দিয়ে আগের মতো পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। দিরাই ও শাল্লা উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হ্যান্ডপাম্প থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না।
এক টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর ১৫ পরিবার
দিরাই পৌরসভার পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের সাবিনা বেগম জানান, তাঁদের ১৫টি পরিবারের পানির একমাত্র ভরসা ছিল একটি সরকারি টিউবওয়েল। কিন্তু সেটিতে পানি না ওঠায় সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিশুদের গোসল করানোর জন্য দূরের এলাকায় যেতে হচ্ছে। এমনকি রান্নাবান্নার কাজেও পাশের পুকুরের পচা পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শাল্লা উপজেলার বাসিন্দা সন্দীপন তালুকদার বলেন, তাঁদের গ্রামে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস। সেখানে ১৪টি টিউবওয়েল অচল হয়ে পড়েছে। খাবার পানি সংগ্রহ করতেই মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গোসলসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে চান্দপুর এলাকার বাসিন্দা গীর্ব্বান প্রসাদ রায় শংকু জানান, গ্রামের পুরোনো অধিকাংশ টিউবওয়েলেই পানি উঠছে না। নিরাপদ খাবার পানির জন্য নারীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটতে হচ্ছে। গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময় ভিড়ও তৈরি হচ্ছে।
গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবিতে নারীদের অবস্থান
পানির সংকট নিরসনে বৃহস্পতিবার চান্দপুর গ্রামের অন্তত ৪০ জন নারী উপজেলা পরিষদে অবস্থান নেন। তাঁরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবি জানান। নারীদের অভিযোগ, গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। পুরোনো কোনো টিউবওয়েলেই পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ইউনিয়নভেদে অচল অধিকাংশ টিউবওয়েল
রফিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শৈলেন চন্দ্র দাস জানান, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ টিউবওয়েল থেকে পানি উঠছে না। ইউনিয়নের ১১টি নতুন পাড়ায় একটি টিউবওয়েলও নেই। এতে এসব এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাঁর মতে, ইউনিয়নে দেড়শ গভীর নলকূপ স্থাপন করা গেলে নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে সহায়তা হবে। তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ টিউবওয়েল বিকল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ইউনিয়নে অন্তত ৫০০টি টিউবওয়েল প্রয়োজন।
দুই উপজেলায় প্রয়োজন সাত হাজার টিউবওয়েল
জনস্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার প্রায় ৭৫ হাজার পরিবার এবং চার লাখের বেশি মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে অন্তত সাত হাজার টিউবওয়েল প্রয়োজন। তবে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রচলিত হ্যান্ডপাম্পের পরিবর্তে বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল খান বলেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে তাঁদের আওতাধীন ৯টি ইউনিয়নে পানির স্থিতিশীল স্তর ক্রমাগত নিচে নামছে। অনেক এলাকায় পানির স্তর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট গভীরে নেমে গেছে। তিনি জানান, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে প্রচলিত ৬ নম্বর হ্যান্ডপাম্পের পরিবর্তে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার হ্যান্ডপাম্প থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প ঝুলে আছে
দিরাই পৌরসভায়ও নিরাপদ পানির সংকট প্রকট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় অন্তত ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছ থেকে স্যানিটেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার জানান, পানি পরিশোধন করে সরবরাহের কাজের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে সাবেক মেয়র প্রকল্পের জন্য ভূমি বরাদ্দ দিলেও কাজ বাস্তবায়িত হয়নি। পৌরসভায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের টেন্ডার হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। সব মিলিয়ে দিরাই ও শাল্লার হাওড়াঞ্চলে নিরাপদ খাবার পানির সংকট এখন জনজীবনের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন ও কার্যকর পানি সরবরাহব্যবস্থা চালু করতে হবে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]