জসীমের ছাত্রদের কেউ খলনায়ক, কেউ ফাইট ডিরেক্টর—আজও স্মৃতিতে ওস্তাদ
ঢালিউডের অ্যাকশন সিনেমার ইতিহাসে চিত্রনায়ক জসীমের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। অভিনয়ের পাশাপাশি ফাইটিং প্রশিক্ষক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তাঁর হাত ধরে চলচ্চিত্রে এসেছেন অনেক ফাইটার, স্টান্টম্যান ও অভিনেতা। তাঁদের কেউ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন খলনায়ক হিসেবে, কেউ কাজ করছেন ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে। জসীমের মৃত্যুর ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও শিষ্যদের স্মৃতিতে আজও অমলিন তাঁদের প্রিয় ‘ওস্তাদ’।
জনপ্রিয় খল অভিনেতা পারভেজ গাঙ্গুয়া জসীমের কাছেই মারপিট ও অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। একসঙ্গে অভিনয়ও করেছেন তাঁরা। ‘মাস্তান রাজা’ সিনেমায় কসাই চরিত্রে অভিনয়ের স্মৃতি তুলে ধরে গাঙ্গুয়া জানান, চরিত্রটির পোশাক নিয়ে জসীমের পরামর্শ থাকলেও তিনি নিজের মতো করে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। জসীমের ‘কসাই’ সিনেমায় অভিনয়ের ধরন তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
শুটিংয়ের দিন নিজের পোশাক নিয়ে জসীমের সামনে যেতে ইতস্তত করছিলেন গাঙ্গুয়া। পরে দৃশ্যের শুটিং শুরু হলে তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন জসীম। দৃশ্যটি দেখে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি গাঙ্গুয়া।

জসীম ফাইটারদের নিয়ে ‘জ্যাম্বস’ নামে একটি দলও গঠন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দলটি বন্ধ হয়ে যায়। গাঙ্গুয়া বলেন, জসীমের হাত ধরে অনেকেই ঢালিউডে এসেছেন। তিনি সব সময় ওস্তাদকে স্মরণ করেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করেন। বর্তমানে ব্যবসা করে জীবন চালাতে পারলেও অনেক সহকর্মী চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।
জসীমের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসা আরমান চার দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য সিনেমায় ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর কাছে জসীমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। আরমান বলেন, জসীমের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার তুলনা হয় না। তিনি সব সময় ওস্তাদের মতো কাজ করার চেষ্টা করেছেন এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে চলেছেন।
আরমানের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জ্বলন্ত আগুন’ সিনেমাকে ঘিরে। সিনেমাটিতে ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। ছবিটি দেখে জসীম তাঁকে বুকে জড়িয়ে প্রশংসা করেছিলেন। নিজের কাজের প্রতি জসীমের সেই স্বীকৃতি ও স্নেহ আজও আরমানের কাছে বড় প্রাপ্তি।
তবে বর্তমান চলচ্চিত্র অঙ্গনে ফাইটারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ আরমান। তাঁর মতে, সিনেমা নির্মাণ কমে যাওয়া, প্রেক্ষাগৃহে দর্শকসংকট ও কাজের অভাবে এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেক ফাইটার অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুনদের জন্যও এই পেশায় নিরাপদ ভবিষ্যৎ দেখছেন না তিনি।
জসীম জীবদ্দশায় ‘জুনিয়র জ্যাম্বস’ নামে আরেকটি ফাইটিং দল গঠন করেছিলেন। ওই দলে প্রায় ২০০ সদস্য ছিলেন। তাঁদের একজন ফাইট ডিরেক্টর ও স্টান্টম্যান সুমন রেজা জুম্মন। তিনি জানান, জসীমের ছাত্রদের মধ্যে অল্প কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই এখন অন্য পেশায় চলে গেছেন।
জুম্মনের মতে, বর্তমানে চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ ও সম্মান কমেছে। পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিকও যথাযথ নয়। অনেক সিনেমায় বাজেট বেশি থাকলে ফাইটিংয়ের কাজের জন্য বাইরের লোক আনা হয়। ফলে স্থানীয় ফাইটারদের কাজের সুযোগ আরও সংকুচিত হচ্ছে।
জসীমের প্রতিষ্ঠিত ফাইটিং দলের সদস্য হলেও তাঁর সঙ্গে পর্দায় অভিনয়ের সুযোগ হয়নি জুম্মনের। তবে প্রশিক্ষণের সময় জসীমের নিখুঁত কাজের ধরন, হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি ও মানবিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। জুম্মন জানান, একটি শট পুরোপুরি নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত জসীম বারবার সেটি ধারণ করতেন। মানের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতেন না তিনি।
নিয়মিত শুটিং না থাকায় সংসার চালাতে নিজের এলাকায় ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন জুম্মন। শুটিং থাকলে বাইরে যান, আর কাজ না থাকলে দোকানে বসেন। সম্প্রতি গাজীপুরে একটি সিনেমার শুটিংয়ে ১০ দিন ব্যস্ত ছিলেন। অভিনয়-সংশ্লিষ্ট কাজ ও ছোট ব্যবসা মিলিয়েই কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

জসীমের শিষ্যদের স্মৃতিতে তাঁর শিক্ষা ও স্নেহ আজও অমলিন। তবে তাঁদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে ঢালিউডের অ্যাকশন জগতের বর্তমান সংকট—কাজের অভাব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও জীবিকা টিকিয়ে রাখার কঠিন লড়াই।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array