খুঁজুন
                               
, ,
           

সুন্দরবনে কুমিরের ভয়, অবশেষে ফিরছে চঞ্চল চৌধুরীর ‘ফেউ ২’

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১০ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনে কুমিরের ভয়, অবশেষে ফিরছে চঞ্চল চৌধুরীর ‘ফেউ ২’

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে দর্শকদের সামনে আসতে যাচ্ছে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘ফেউ’র দ্বিতীয় সিজন। নির্মাতা সুকর্ণ সাহেদ ধীমান ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরেই সিরিজটির বাকি অংশ মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও মুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে নতুন সিজন ঘিরে দর্শকদের মধ্যে আবারও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সিরিজটির প্রথম সিজন মুক্তির পর থেকেই পরবর্তী অংশ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন দর্শকেরা। বিশেষ করে রহস্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মিশেলে নির্মিত গল্পটি যেভাবে এগিয়েছে, তাতে দ্বিতীয় সিজনে কী ঘটবে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্মাতা ও প্রযোজনা সংশ্লিষ্টরা।

সুন্দরবনে শুটিং, কুমিরের ভয় আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা

‘ফেউ’ সিরিজের শুটিং করতে গিয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। সুন্দরবনের দুর্গম পরিবেশে টানা প্রায় এক মাস শুটিং হয়েছিল সিরিজটির। এর মধ্যে ২০ দিনেরও বেশি সময় শুটিংয়ে অংশ নেন চঞ্চল। রাতের তীব্র ঠান্ডা, লঞ্চে থাকা এবং চারপাশে কুমিরের উপস্থিতি মিলিয়ে শুটিংয়ের দিনগুলো তাঁর জন্য ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং।

নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, শুটিংয়ের সময় প্রচণ্ড ঠান্ডা ছিল। রাতে লঞ্চে ঘুমানোর সময় শীতের পোশাক পরেও ঠান্ডা অনুভব করতেন তিনি। তবে তাঁর কাছে ঠান্ডার চেয়েও বড় ভয়ের কারণ ছিল কুমির।

অভিনেতার ভাষ্য, ‘আমরা যখন শুটিং করেছি তখন ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। মাস খানেক সুন্দরবনে শুটিং হয়েছে, যার মধ্যে আমি ছিলাম ২০ দিনের বেশি। রাতে যখন লঞ্চে ঘুমাতাম, খুব ঠান্ডা লাগত। আমি শীতের জামা-কাপড় পরেই ঘুমাতাম। তবে ঠান্ডার চেয়েও ভয়ের বিষয় ছিল কুমির।’

লঞ্চের পাশেই কুমির, রাতে চলত শুটিং

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে শুটিংয়ের সময় বন্য প্রাণীর উপস্থিতি বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করেছিল। চঞ্চল জানান, তাঁদের লঞ্চ যেখানে নোঙর করা ছিল, সেখানে কুমির দেখা যেত। সকালে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই কুমিরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও পাখি চোখে পড়ত।

শুটিংয়ের জন্য লঞ্চ থেকে ছোট ছোট ট্রলারে করে নির্ধারিত স্থানে যেতে হতো শিল্পী ও কলাকুশলীদের। শুধু দিনের আলোতেই নয়, রাতেও শুটিং করতে হয়েছে তাঁদের। ফলে দুর্গম পরিবেশ, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা এবং বন্য প্রাণীর উপস্থিতির কারণে পুরো কাজটি ছিল বেশ কঠিন।

চঞ্চল চৌধুরীর বর্ণনায়, ‘আমাদের লঞ্চ যেখানে নোঙর করা ছিল, সেখানে ছিল কুমিরটা। সকালে জানালা দিয়ে মুখ বের করলেই কুমির এবং আরও বিভিন্ন পশু-পাখি দেখা যেত। আমরা লঞ্চ থেকে শুটিং স্পটে যেতাম ছোট ছোট ট্রলারে। রাতেও শুটিং করতে হতো, খুব কঠিন পরিস্থিতি ছিল।’

অভিনেতার এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ‘ফেউ’র গল্পকে পর্দায় বাস্তবসম্মত করে তুলতে নির্মাণসংশ্লিষ্টদের প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশেও কাজ করতে হয়েছে।

ইতিহাসের ছায়ায় নির্মিত ‘ফেউ’র গল্প

‘ফেউ’ নির্মিত হয়েছে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মরিচঝাঁপি দ্বীপে ঘটে যাওয়া গণহত্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ছায়া অবলম্বনে। তবে বাস্তব ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সিরিজটির গল্প কাল্পনিক।

সিরিজটির গল্প লিখেছেন সুকর্ণ সাহেদ ধীমান ও রোমেল রহমান। চিত্রনাট্য করেছেন সুকর্ণ সাহেদ ধীমান ও সিদ্দিক আহমেদ।

প্রথম সিজনে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একদল হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষের আশ্রয় নেওয়ার কাহিনি তুলে ধরা হয়। গল্পে ডুমুরঝাঁপি নামের একটি স্থানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। তাঁদের উচ্ছেদ করতে খাবার ও পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘরে আগুন দেওয়া, নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা গল্পের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে আনে।

এই পরিস্থিতির ছবি তুলে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেন মোংলা চার্চের রেভারেন্ড ফটোগ্রাফার সুনীল। কিন্তু একসময় তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার রহস্যই পরবর্তী সময়ে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

বাবার খোঁজে ড্যানিয়েল, রহস্যের কেন্দ্রে পুরোনো ছবি

প্রথম সিজনের গল্পে সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে সামনে আসে সুনীলের ছেলে ড্যানিয়েল। বাবার নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই যুগ পর সুনীলের তোলা কিছু ছবির সন্ধানে নামে সে। ছবিগুলোর সূত্র ধরে ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে অতীতের নানা ঘটনা ও অজানা তথ্য।

একপর্যায়ে ড্যানিয়েল জানতে পারে, যাঁকে তার বাবার কবর বলে জানানো হয়েছিল, সেখানে আসলে কবর দেওয়া হয়েছিল একটি গাছের গুঁড়ি। এই তথ্য তার অনুসন্ধানকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। বাবার প্রকৃত পরিণতি জানতে শুরু হয় ড্যানিয়েলের যাত্রা।

সুনীল বেঁচে আছেন, নাকি বহু আগেই মারা গেছেন—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যায় গল্প। পাশাপাশি পুরোনো ছবি, ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রহস্য আরও গভীর হয়।

দ্বিতীয় সিজনে এই রহস্যের কী পরিণতি হবে, ড্যানিয়েল কি বাবার সন্ধান পাবে, আর অতীতের কোন কোন অজানা ঘটনা সামনে আসবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শকেরা।

২০২৫ সালে প্রথম সিজন, এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা

২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে মুক্তি পেয়েছিল ‘ফেউ’র প্রথম সিজন। সে সময় জানা গিয়েছিল, সিরিজটির দুই সিজনের শুটিং একটানা সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে প্রথম সিজন মুক্তির পর দর্শকদের ধারণা ছিল, খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না পরবর্তী অংশের জন্য।

কিন্তু মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয় সিজনের মুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এতে দর্শকদের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছে। প্রথম সিজনের গল্প অসমাপ্ত থাকায় এবং সুনীলের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের সমাধান না আসায় পরবর্তী অংশ নিয়ে আগ্রহও বজায় রয়েছে।

এবার নির্মাতা ও চরকি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরেই সিরিজটির সম্পূর্ণ গল্প দর্শকদের সামনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নির্মাতাও অপেক্ষায়, তবে চূড়ান্ত হয়নি মুক্তির তারিখ

দ্বিতীয় সিজনের মুক্তি নিয়ে নির্মাতা সুকর্ণ সাহেদ ধীমান জানিয়েছেন, তিনিও সিরিজটির বাকি অংশ দর্শকদের সামনে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে পুরো পরিকল্পনা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।

নির্মাতার ভাষ্য, ‘আমি নিজেও অপেক্ষায় আছি ফেউ সিরিজের বাকি অংশের জন্য। এই বছরে আমরা ফেউ-এর সম্পূর্ণটা রিলিজ দিতে চাই। কিন্তু পুরো পরিকল্পনাটা এখনো অফিশিয়ালি কনফার্ম হয়নি। কনফার্ম হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।’

চরকি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, চলতি বছরেই দ্বিতীয় সিজন মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলেও আভাস পাওয়া গেছে।

তবে পরিকল্পনা থাকলেও নির্দিষ্ট মুক্তির দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তাই দর্শকদের আপাতত অপেক্ষা করতে হচ্ছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য।

চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে অভিনয়ে আরও যাঁরা

‘ফেউ’ সিরিজে চঞ্চল চৌধুরী ছাড়াও অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, তাহমিনা অথৈ, তানভীর অপূর্ব, হোসেন জীবন, রিজভি রিজু ও এ কে আজাদ সেতুসহ আরও অনেকে।

শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী, ইতিহাসের ছায়ায় নির্মিত রহস্যময় গল্প এবং সুন্দরবনের দুর্গম পরিবেশে শুটিং—সব মিলিয়ে সিরিজটি দর্শকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, দ্বিতীয় সিজনে ড্যানিয়েলের অনুসন্ধান কোন পরিণতির দিকে যায় এবং সুনীলকে ঘিরে থাকা রহস্যের কতটা সমাধান মেলে।

চরকি ও নির্মাতার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরেই ‘ফেউ’র দ্বিতীয় সিজন মুক্তি পেলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে দর্শকদের। তবে চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার আগ পর্যন্ত মুক্তির সময়সূচি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

কালের আলো/এসএ

সামান্য সংক্রমণও হতে পারে প্রাণঘাতী, সেপসিসের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:০৫ অপরাহ্ণ
সামান্য সংক্রমণও হতে পারে প্রাণঘাতী, সেপসিসের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে
সাধারণ সংক্রমণও কখনো কখনো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা যখন অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন দেখা দিতে পারে সেপসিস। এটি এমন একটি গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, যা দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা না হলে কিডনি, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগী সেপটিক শকে আক্রান্ত হতে পারেন, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, সেপসিসের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণের লক্ষণের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, নবজাতক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

সেপসিস কী, কেন বিপজ্জনকসেপসিসকে অনেক সময় রক্তদূষণ বলা হলেও এটি শুধু রক্তে জীবাণু প্রবেশ করার ঘটনা নয়। বরং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ায় নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করাই সেপসিসের মূল বৈশিষ্ট্য। রক্তের কালচার পরীক্ষায় জীবাণু শনাক্ত না হলেও সেপসিস হতে পারে।

এ অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে। রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে এবং রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে রোগী সেপটিক শকে আক্রান্ত হতে পারেন। এ পর্যায়ে নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

কোন কোন সংক্রমণ থেকে সেপসিস হতে পারে

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকসহ বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণ থেকে সেপসিস তৈরি হতে পারে। শরীরের কোনো একটি স্থানে শুরু হওয়া সংক্রমণ জটিল হয়ে উঠলে এবং তার বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হলে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

নিউমোনিয়া সেপসিসের অন্যতম পরিচিত কারণ। এ ছাড়া কিডনি ও মূত্রনালির সংক্রমণ, পেটের ভেতরের সংক্রমণ, পেরিটোনাইটিস, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, মেনিনজাইটিস, ত্বকের গভীর সংক্রমণ এবং সংক্রমিত ক্ষত থেকেও সেপসিস হতে পারে। অস্ত্রোপচারের পর কিংবা ক্যাথেটার ব্যবহারের সময় সংক্রমণ হলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে সব সংক্রমণই সেপসিসে রূপ নেয় না। সংক্রমণের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

জ্বর, দ্রুত শ্বাস ও হৃৎস্পন্দন বাড়লে সতর্ক হোন

সেপসিসের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ সংক্রমণের মতো মনে হতে পারে। জ্বর, শরীর কাঁপা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া এবং হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ একা সেপসিস নিশ্চিত করে না; রোগীর সামগ্রিক অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্রমণের পাশাপাশি শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, দ্রুত হৃৎস্পন্দন কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শ্বাস নেওয়া উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ

সেপসিসের বিপজ্জনক দিক হলো, এতে শরীরের একাধিক অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। কিছু লক্ষণ দেখে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠার আশঙ্কা বোঝা যায়।

মস্তিষ্ক: রোগী হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন, অসংলগ্ন কথা বলতে পারেন কিংবা স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে ব্যর্থ হতে পারেন। গুরুতর অবস্থায় অচেতন হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

কিডনি: প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এটি কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

ফুসফুস: শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।

রক্তসংবহন: রক্তচাপ কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা ত্বক ফ্যাকাশে বা ছোপছোপ দেখানোর মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

লিভার ও রক্তের উপাদান: গুরুতর অবস্থায় জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে, রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং ল্যাকটেটের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এসব পরিবর্তন পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়।

এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে সেপসিস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নিজে থেকে নেওয়া উচিত নয়। তবে সংক্রমণের সঙ্গে এমন উপসর্গ থাকলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কারা সেপসিসের বেশি ঝুঁকিতে

বয়স্ক ব্যক্তি, নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের সেপসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী, অস্ত্রোপচারের পর থাকা ব্যক্তি কিংবা যাঁদের শরীরে ক্যাথেটার বা অন্য কোনো চিকিৎসা-সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সংক্রমণের লক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

সেপসিসের চিকিৎসায় কী করা হয়

সেপসিস একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। সন্দেহ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনও হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক ও পরীক্ষা: ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপসিস সন্দেহ হলে চিকিৎসকেরা দ্রুত উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেন। সম্ভব হলে চিকিৎসায় অযথা দেরি না করে আগে রক্তের কালচারসহ প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার ফল, সংক্রমণের উৎস এবং রোগীর অবস্থা অনুযায়ী পরে ওষুধ পরিবর্তন করা হতে পারে।

শিরায় তরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: রক্তচাপ কমে গেলে বা রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী শিরায় তরল দেওয়া হয়। হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির অবস্থা বিবেচনা করে তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয়। প্রয়োজন হলে রক্তচাপ বাড়ানোর ওষুধও দেওয়া হয়।

অক্সিজেন ও অঙ্গের সহায়তা: রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে অক্সিজেন দেওয়া হয়। গুরুতর শ্বাসকষ্টে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে। কিডনি বা অন্য অঙ্গের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে বিশেষায়িত সহায়ক চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ: শরীরে পুঁজ জমলে তা নিষ্কাশন, সংক্রমিত ক্যাথেটার অপসারণ কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ: চিকিৎসার সময় রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশ্বাস, অক্সিজেনের মাত্রা, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। রোগীর অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী চিকিৎসায় সমন্বয় আনা হয়।

সেপসিস প্রতিরোধে যা করবেন

সেপসিস প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

  • খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং হাত ময়লা হলে সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
  • শরীরের কাটা-ছেঁড়া ও ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
  • ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়াসহ প্রাসঙ্গিক সংক্রমণ প্রতিরোধী টিকা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিতে হবে।
  • ডায়াবেটিস, কিডনি ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও মেয়াদ সম্পর্কে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
  • জ্বর বা সংক্রমণের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, প্রস্রাব কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

সেপসিসের ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই সংক্রমণের পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: ডা. খাজা নাজিমুদ্দিন, অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।

কালের আলো/এসএ

বাংলাদেশে ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৮ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবপাচারবিষয়ক প্রতিবেদন ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্ট’-এর বরাতে প্রকাশিত তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। একই তথ্যে বলা হয়েছে, যৌন পেশায় যুক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৪৫ শতাংশ শৈশবেই এ পেশায় প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছেন।

শিশুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের জন্য এ তথ্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ, শিশুদের যৌন শোষণ শুধু তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, বরং শিক্ষা, স্বাভাবিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।

প্রেমের ফাঁদ ও চাকরির প্রলোভনে শোষণের ঝুঁকি

প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভন, চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কর্মকাণ্ডের আড়ালে শিশুদের যৌন শোষণের ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। অপরাধীরা কখনো বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলে, আবার কখনো ভালো ভবিষ্যৎ বা আর্থিক সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার শিশুদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রতারণা, প্রলোভন কিংবা শোষণের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের সচেতন করা জরুরি।

বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রমে বিপুল অবৈধ মুনাফা

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক শ্রম থেকে বছরে প্রায় ২৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধ মুনাফা হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ১৭২ বিলিয়ন ডলার আসে বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে।

এই পরিসংখ্যান মানবশোষণের অর্থনৈতিক বাংলাদেশে ৩০ হাজার কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকারব্যাপ্তি তুলে ধরে। মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পরিচালিত এ ধরনের অপরাধের প্রভাব ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের ওপরও পড়ে।

শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শিশুদের যৌন শোষণ ও পাচার প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক যোগাযোগ তৈরি, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতারণা বা শোষণের লক্ষণ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজ হওয়া, প্রলোভন দেখিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কিংবা শোষণের সন্দেহজনক ঘটনা দেখা গেলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং তাকে দোষারোপ না করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াও জরুরি।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যাগুলোর ভিত্তি, সময়কাল ও হিসাবের পদ্ধতি মূল প্রতিবেদন থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে শিশুদের যৌন শোষণ ও মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর সুরক্ষা, সচেতনতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

কালের আলো /জেএন/এসএ

একসময় ফেলনা, এখন পাটখড়িতেই কৃষকের বাড়তি আয়

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৩ অপরাহ্ণ
একসময় ফেলনা, এখন পাটখড়িতেই কৃষকের বাড়তি আয়
পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর একসময় পাটখড়িকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না কৃষকেরা। রান্নার জ্বালানি কিংবা ঘরের বেড়া তৈরির কাজে ব্যবহার করে বাকি অংশ অনেক সময় ফেলে রাখা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। পাটখড়ির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ায় এখন এটিও হয়ে উঠছে কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস। পাটের আঁশ বিক্রির পাশাপাশি পাটখড়ি বিক্রি করেও অর্থ পাচ্ছেন তাঁরা।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পাটখড়ি সংগ্রহ, শুকানো ও বিক্রিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। পাট কাটার পর কৃষকেরা এখন পাটখড়ি যত্ন করে তুলে রাখছেন। কেউ বাড়ির উঠানে, কেউ রাস্তার পাশে, আবার কেউ খোলা জায়গায় স্তূপ করে রোদে শুকাচ্ছেন। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা সেসব পাটখড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

ফেলনা পণ্য থেকে বাড়তি আয়ের উৎস

সালথা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পাট কাটার পর আঁশ ছাড়ানোর পাশাপাশি পাটখড়ি সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিচ্ছেন কৃষকেরা। আগে যে পাটখড়ি অনেক সময় অবহেলায় পড়ে থাকত, এখন সেটিই বিক্রির উপযোগী করে তুলতে রোদে শুকানো হচ্ছে। ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে পরে তা বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, পাট চাষে বীজ, সার, শ্রমিক ও জমি প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়। পাটের আঁশ বিক্রি থেকে মূল আয় আসে। এর সঙ্গে পাটখড়ি বিক্রির অর্থ যুক্ত হওয়ায় মোট আয় কিছুটা বাড়ছে। ফলে পাটখড়ি আর শুধু কৃষিকাজের উপজাত নয়, বরং কৃষকের কাছে বাড়তি মূল্য পাওয়ার একটি সুযোগ হয়ে উঠেছে।

পাটখড়ি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা

সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড়গ্রাম এলাকার কৃষক শাহাজুদ্দিন মাতুব্বর বলেন, আগে পাটের আঁশ বিক্রি করাই ছিল প্রধান বিষয়। পাটখড়ি অনেক সময় পড়ে থাকত। এখন ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকেই পাটখড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পাট চাষ থেকে বাড়তি লাভ হচ্ছে।

আরেক কৃষক আজাদ শেখ বলেন, পাটখড়ি শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে পরে বিক্রি করা যায়। এতে বাড়তি কিছু টাকা পাওয়া যায়, যা পরিবারের বিভিন্ন প্রয়োজনে কাজে লাগে।

কৃষকদের মতে, পাটখড়ি বিক্রির সুযোগ বাড়ায় এখন এটি ফেলে রাখার বদলে যত্ন করে সংরক্ষণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে দাম তুলনামূলক কম থাকলেও পরে চাহিদা বাড়লে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রতি পাটখড়ি ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সালথায় প্রতি মোটা পাটখড়ি ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ১০০ মোটা পাটখড়ির দাম ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ টাকা। বাজারে চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন কৃষকেরা।

তবে পাটখড়ির দাম ও বিক্রির পরিমাণ নির্ভর করে এর মান, শুকানোর অবস্থা এবং বাজারের চাহিদার ওপর। তাই সঠিকভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান।

চাহিদা থাকায় সক্রিয় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা

স্থানীয় পাটখড়ি ব্যবসায়ী বাদল হোসেন বলেন, এ বছর পাটখড়ির চাহিদা ভালো। কৃষকদের কাছ থেকে পাটখড়ি সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছেন তাঁরা। চাহিদা থাকায় পাটখড়ি এখন আর ফেলনা পণ্য নয়।

ব্যবসায়ীদের এই তৎপরতায় কৃষকের বাড়ি থেকেই পাটখড়ি সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষকদের আলাদাভাবে পরিবহন করে বাজারে নেওয়ার প্রয়োজনও কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে। একই সঙ্গে সংগ্রহ, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্যও আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পাটখড়ির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব

কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়ির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পাট চাষ আরও লাভজনক হতে পারে। পাটখড়ির বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করা সম্ভব।

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসানুল হাবীব আল আজাদ বাংলানিউজকে বলেন, পাট বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়ির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষকেরা বাড়তি আয় করতে পারবেন। কৃষকদের পাটখড়ি সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, পাটের উপজাত হিসেবে পাটখড়ির অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো গেলে পাট চাষে কৃষকের লাভের পরিমাণও বাড়তে পারে।

পাটখড়িকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, পাটখড়িকে ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হওয়া প্রশংসনীয় ও আশাব্যঞ্জক। একসময় ফেলে দেওয়া পাটখড়ি এখন কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাটচাষিদের সার্বিক সুবিধা-অসুবিধা তদারকি করা হচ্ছে। পাট ও পাটখড়ির সঠিক সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণে কৃষি বিভাগের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, যাতে কৃষকেরা তাঁদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পান।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পাটখড়ির সঠিক ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। এতে পাটের আঁশের ওপর নির্ভরশীল আয়ের বাইরে কৃষকের হাতে অর্থ আসবে, পাশাপাশি গড়ে উঠতে পারে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।

একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা পাটখড়ির এই পরিবর্তন কৃষিপণ্যের প্রতিটি অংশকে কাজে লাগানোর গুরুত্বও তুলে ধরছে। পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা ও বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে সালথার পাটচাষিদের জন্য পাটখড়ি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/এসএ