নেপালের পরীক্ষিত বন্ধু বাংলাদেশ, সহযোগিতার আশ্বাস মন্ত্রীর
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনে পারস্পরিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে নেপালের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, নেপালের বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোর পুনর্গঠনে বাংলাদেশের সহযোগিতা কামনা করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতে দুই দেশের সম্পর্কের বহুমাত্রিক সম্ভাবনা, শিক্ষা খাতে সহযোগিতা, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
- রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারীর সঙ্গে বৈঠক
- বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনর্গঠনে সম্ভাব্য সহায়তার আশ্বাস
- সার্ক সক্রিয় করা ও দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের তাগিদ
বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নেপালের সহায়তা কামনা
সাক্ষাৎকালে নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী সম্প্রতি তাঁর দেশে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনর্নির্মাণে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। জবাবে মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান নেপালকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবসময় নেপালের পাশে রয়েছে এবং যেকোনো প্রয়োজনে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বন্যা মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। তবে নেপালের পুনর্গঠনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সহায়তার ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সার্ক পুনরুজ্জীবনে আঞ্চলিক ঐক্যের ওপর জোর
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। মন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলাদাভাবে অবস্থান না নিয়ে সম্মিলিতভাবে কথা বললে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, অভিন্ন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। এ বাস্তবতায় সার্ককে কার্যকর করার আহ্বান কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি ও সম্মিলিত দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কৌশলগত প্রস্তাবও।
জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর স্বার্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত অবস্থান গড়ে তোলা গেলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় দেশগুলোর বক্তব্য আরও জোরালো হতে পারে। তবে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা এবং নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ অপরিহার্য।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
মন্ত্রী বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়লে প্রতিবেশী দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধা পাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সহজ হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতির সুরক্ষাও সহজ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-নেপাল বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে শুধু পণ্য বিনিময় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পরিবহন সংযোগ, সীমান্ত ও শুল্ক প্রক্রিয়ার দক্ষতা, বাণিজ্যিক চুক্তির বাস্তবায়ন এবং ব্যবসায়ীদের জন্য কার্যকর সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণ এবং নেপালের জন্য সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগসহ বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংযোগের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
শিক্ষায় সহযোগিতার বিস্তৃত সুযোগ
বাংলাদেশ ও নেপালের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে শিক্ষা। রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে আড়াই হাজারের বেশি নেপালি শিক্ষার্থী চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনা করছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে নেপালি শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণ দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক নির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে উচ্চশিক্ষায় বিনিময়, যৌথ গবেষণা, বৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। শিক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে তা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে না; বরং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও পেশাগত সম্পর্কও শক্তিশালী করতে পারে।
বন্ধুত্বকে কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত ভান্ডারী। তিনি দুই দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির সাদৃশ্য তুলে ধরে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। বৈঠকের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্ককে আরও বহুমুখী করার ক্ষেত্রে তিনটি ক্ষেত্র বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে—দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। এর সঙ্গে সার্ককে কার্যকর করার উদ্যোগ যুক্ত হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামোর সঙ্গেও সংযুক্ত হতে পারে। সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও নেপালের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় ও বহুমুখী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
কালের আলো/এমএএএমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array