মসজিদ উড়িয়ে দিতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন সাবেক মার্কিন সেনা
ঘৃণা থেকে জন্ম নিয়েছিল হামলার পরিকল্পনা
রিচার্ড ম্যাককিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মুনসি শহরের বাসিন্দা। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে প্রায় ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করা এই ব্যক্তি একসময় মুসলিমদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। তাঁর মনে মুসলিমদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তৈরি হয়। সেই বিদ্বেষ থেকেই মুনসি শহরের একটি মসজিদে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেন তিনি।
তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রাণহানি ঘটানো। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে মসজিদটির পরিবেশ সম্পর্কে জানার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর ধারণা ছিল, সেখানে গিয়ে এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা মুসলিমদের প্রতি তাঁর বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
কিন্তু মসজিদে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তা ছিল তাঁর প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত।
শত্রু ভেবে যাঁদের কাছে গিয়েছিলেন, তাঁরাই আপন করে নিলেন
মসজিদে উপস্থিত মুসলিমরা রিচার্ডকে শত্রু হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁর সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলেন, সৌজন্য দেখান এবং তাঁকে আপন করে নেন। তাঁদের এই আচরণ রিচার্ডের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
যাদের সম্পর্কে এত দিন ভয়, সন্দেহ ও ঘৃণা পুষে রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যেই তিনি দেখতে পান সহমর্মিতা ও মানবিকতা। বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ধারণার বড় ধরনের অমিল তাঁকে নিজের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন, সেই ঘটনাই তাঁর চিন্তাজগতে পরিবর্তনের সূচনা করে। মুসলিমদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর মধ্যে। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন, এত দিন যাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছেন, তাঁদের জীবন, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান কতটা সীমিত ছিল।
কোরআন পড়া থেকে ইসলাম গ্রহণ
মসজিদে পাওয়া অভিজ্ঞতার পর রিচার্ড ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। পবিত্র কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়েন। ইসলামের শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।
এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে নিজের পুরোনো ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনার সুযোগ পান তিনি। একপর্যায়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন রিচার্ড। মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয় তাঁদের বিশ্বাস ও জীবনধারা সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপলব্ধিতে।
তাঁর এই পরিবর্তনের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মসজিদের মুসল্লিদের আচরণ। তাঁরা তাঁর পূর্ববর্তী বিদ্বেষ সম্পর্কে জানতেন কি না, কিংবা তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন—এসব অভিজ্ঞতা প্রামাণ্যচিত্রটির বর্ণনায় বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
অস্কার মনোনয়ন পাওয়া ‘Stranger at the Gate’
রিচার্ড ম্যাককিনির জীবনের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র Stranger at the Gate। ২০২৩ সালে এটি অস্কারের সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়।
প্রামাণ্যচিত্রটিতে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে মুসলিমদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করা এক ব্যক্তি মসজিদে হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেন। তাঁর জীবনের এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতি আচরণ, পারস্পরিক পরিচিতি এবং পূর্বধারণা ভাঙার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
মানবিক আচরণ কীভাবে বদলে দিতে পারে দৃষ্টিভঙ্গি
রিচার্ড ম্যাককিনির গল্প কেবল একজন মানুষের ধর্মান্তরের ঘটনা নয়; এটি ঘৃণা ও পূর্বধারণার বিপরীতে মানবিক আচরণের প্রভাব নিয়েও ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে লালন করা বিদ্বেষের কারণে তিনি যে ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা করেছিলেন, বাস্তব মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর সেই ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
তবে তাঁর অভিজ্ঞতাকে সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য কোনো নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই ঘটনা দেখায়, কোনো গোষ্ঠী সম্পর্কে দূর থেকে তৈরি ধারণা এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা এক নাও হতে পারে।
রিচার্ডের জীবনের এই পরিবর্তন তাই পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে।
সূত্র: আলজাজিরা
কালের আলো/জেএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array