প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সততা—আধুনিক পুলিশ গড়ার তিন অগ্রাধিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও পেশাদারিত্ব—এই তিন ভিত্তিতে পুলিশ বাহিনীকে আরও সক্ষম করে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলা, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদেশে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘদিন বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত জীবনে পুনর্বাসনকে সামনে রেখে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির চেমেনি মেমোরিয়াল হলে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ব্যাচের ছয় মাসব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী ও সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে পুলিশের আধুনিকায়নের পাশাপাশি জনআস্থা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জবাবদিহিমূলক ভূমিকার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
- সারদায় নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা
- অপরাধ দমনে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জনগণের আস্থা অর্জনে জোর
- আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী গড়তে সরকারের উদ্যোগ
অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে, সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিতে জোর
সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন ও কৌশল পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ ও সাইবার ক্রাইম মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ লক্ষ্যে ফরেনসিক ও কেমিক্যাল ল্যাব সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং দেশে-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরিতে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ দক্ষতা বাড়াতে ‘ট্রেনিং অব দ্য ট্রেইনার্স’ কর্মসূচির আওতায় কর্মকর্তাদের চীনসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে পুলিশকে পরিবর্তিত অপরাধ পরিস্থিতির উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
আধুনিকায়নে অর্থ বরাদ্দ আটকে থাকবে না
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ খাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোনো অর্থ বরাদ্দ পেন্ডিং থাকবে না বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি। পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, অবকাঠামো এবং কার্যকর লজিস্টিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রীর বক্তব্যে এসব ক্ষেত্রে সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।
বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনে সরকারের উদ্যোগ
দীর্ঘদিন চাকরি ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং স্বৈরাচারী ও একদলীয় শাসনব্যবস্থার কারণে অনেকে অন্যায়ভাবে চাকরি ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বর্তমান সরকার আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে তাঁদের চাকরিতে পুনর্বহাল এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে বলে জানান তিনি। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মর্যাদার সঙ্গে পেশাগত জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
জনগণের আস্থাই মূল
প্রশিক্ষণ শেষ করা নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণ দিনশেষে পুলিশের কাছেই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করে। পুলিশের সততা, কর্মনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের ওপর সরকারের ভাবমূর্তিও নির্ভর করে। দেশ ও জনগণের সেবা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের জন্য তিনি নবীন কর্মকর্তাদের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে পুলিশের পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি জনসাধারণের সঙ্গে আচরণ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনে সততার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক পুলিশ গড়ার পরিকল্পনায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি মানবিক ও পেশাগত গুণাবলিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে সরকারের বক্তব্য
এর আগে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের গত আট মাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তাঁর মতে, এটি দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন। তবে জনকল্যাণে সরকারকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ দ্রুত অপরাধী শনাক্ত, গ্রেপ্তার, তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে সক্ষম হচ্ছে। তাঁর এসব বক্তব্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের অবস্থান তুলে ধরে।
উপনির্বাচন ও আইনের সমতার প্রশ্ন
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে চলছিল এবং দুপুর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। নির্বাচন চলাকালে কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি। ভোটাররা যাতে স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। অন্যদিকে, নাটোরের এক সংসদ সদস্যের সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদার প্রিন্সিপাল (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. মাইনুল হাসান। এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ও একাডেমির প্রশিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/ডিএইচ/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]