খুঁজুন
                               
, ,
           

ঈদকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর, ৭ দফা বিশেষ নির্দেশনা ডিএমপি কমিশনারের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: সোমবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২২, ১১:৩২ অপরাহ্ণ
ঈদকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর, ৭ দফা বিশেষ নির্দেশনা ডিএমপি কমিশনারের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

প্রতিটি থানা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসবে আকস্মিক।সন্দেহজনক হলেই মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য যানবাহন ও ব্যক্তিকে আনতে হবে তল্লাশির আওতায়। সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সতর্ক দৃষ্টি থাকবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ও ভেতরে নিশ্চিত করতে হবে সিসি ক্যামেরা স্থাপন।

ঈদকে ঘিরে এভাবেই ঢাকা মহানগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর বিষয়ে জোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।মহানগরীতে ছিনতাই প্রতিরোধেও গ্রহণ করা হয়েছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র মতে, সোমবার (১৮ এপ্রিল) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপির সকল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারদের (ডিসি) ৭ দফা বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন ডিএমপি কমিশনার মোহা.শফিকুল ইসলাম। কোন কোন রুট ব্যবহার করে ছিনতাইকারীরা নগরীতে প্রবেশ করে এবং বের হয় সেই বিষয়েই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়েছে হাইকমান্ড। বিশেষ করে ইফতার ও সেহেরির সময় পুলিশকে দায়িত্ব পালনে আরও মনোযোগী হওয়ার কড়া বার্তা দিয়েছেন রাজধানীর পুলিশপ্রধান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিএমপি কমিশনার প্রতি বিভাগের ডিসিদের নিজ নিজ এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করতে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সেই মোতাবেক ডিসিরা নিজ নিজ দায়িত্বে সাজাবেন নিরাপত্তা পরিকল্পনা।

সূত্র মতে, ডিএমপি কমিশনারের বিশেষ নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে- ডিসিরা সকল থানা ও তল্লাশি চৌকি ধারাবাহিকভাবে তদারকি করবেন। ব্যাংকের শাখাগুলোর আশেপাশে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের ঘোরাফেরা চ্যালেঞ্জ করতে হবে। সন্দেহজনক কাউকে দেখলে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। এমনকি তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়েও দিতে হবে। ব্যাংকের আশেপাশে পান সিগারেটের দোকান বসতে দেওয়া যাবে না।

একই সূত্র জানায়, মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ পরিবহনে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতা নিতে হবে। মানি এস্কর্টের বিষয়ে তাদের জানাতে হবে।

থানাগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ডিসি, এডিসি সেহরির আগে ও পরে আকস্মিক থানা পরিদর্শন করবেন। থানার মোটরসাইকেল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল ও তল্লাশি চৌকিও এভাবে তদারকি করতে হবে।

সূত্র মতে, ডিএমপি কমিশনার ইফতারের সময় হতে তারাবির নামাজ পর্যন্ত পুলিশ দায়িত্ব পালনে শিথিলতার অভিযোগের বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন। সিনিয়র অফিসারদের তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি এ সময়ে সবাইকে দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হতে বলেছেন।

এই অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ‘১৫ রোজা শেষ হয়ে গেছে। এখন মার্কেটগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকবে। এ সময় মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি বা টানা পার্টির তৎপরতা বেড়ে যায়। এজন্য টহল টিমকে আরও সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনে স্পেশাল টিম করে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে।

ট্রাফিক বিভাগের উদ্দেশে কমিশনার বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে যানজট বাড়ে। এজন্য ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলার পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে।’

এ সময় ঢাকা ত্যাগ করা নগরবাসীকে দামী স্বর্ণালংকার আত্মীয়ের কাছে রেখে যাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

সূত্র মতে, ডিএমপি কমিশনার আরও একটি বিষয়ে যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তিনি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রদানে ভেরিফিকেশন তথা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আবেদনকারীর বাসায় না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনও মামলা আছে কিনা তা পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) থেকে পরখ করে দ্রুততম সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দিতেও বলেছেন।

ডিএমপি’র অর্ধশত থানার মধ্যে কোন কোন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দিতে কতদিন সময় নিচ্ছেন সদর দপ্তর থেকে সেই বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার বিনিময়ে কোনও পুলিশ সদস্য অর্থ দাবি করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।

কালের আলো/এসবি/এমএম

৪০০ বছর আগে যে ১০টি নিরীহ আচরণকে ঘিরে তৈরি হতে পারত জাদুবিদ্যার অভিযোগ

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫১ অপরাহ্ণ
৪০০ বছর আগে যে ১০টি নিরীহ আচরণকে ঘিরে তৈরি হতে পারত জাদুবিদ্যার অভিযোগ

আজ আপনি বাড়িতে বিড়াল পুষছেন, অসুস্থ প্রতিবেশীকে ভেষজ ওষুধ দিয়ে সাহায্য করছেন কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজের মতামত স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন—এসবই স্বাভাবিক জীবনের অংশ। কিন্তু প্রায় ৪০০ বছর আগে, অর্থাৎ সপ্তদশ শতকের কোনো কোনো সমাজে, এমন সাধারণ আচরণও কারও কারও চোখে সন্দেহজনক হয়ে উঠতে পারত। পরিস্থিতি, সামাজিক অবস্থান ও স্থানীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে আপনার বিরুদ্ধে উঠতে পারত জাদুবিদ্যা চর্চার অভিযোগ। আর সেই অভিযোগ কখনো কখনো ডেকে আনত বিচার, সামাজিক বর্জন, এমনকি নির্মম নির্যাতন।

কল্পনা করুন, এমন এক সময়ে আপনি বাস করছেন, যখন রোগের কারণ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত, প্রকৃতির অনেক রহস্যের ব্যাখ্যা অজানা, আর ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকজ কুসংস্কার দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। কোনো শিশুর অসুস্থতা, গবাদিপশুর মৃত্যু, ফসলহানি কিংবা হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ভাগ্যের পেছনে অদৃশ্য শক্তির হাত রয়েছে বলে কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ কিংবা সমাজের প্রচলিত রীতির বাইরে থাকা মানুষকে ঘিরে সন্দেহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারত।

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকার কিছু উপনিবেশে ডাইনি শিকার ও বিচার ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। এসব অভিযোগের শিকার হয়েছেন নারী-পুরুষ উভয়ই। তবে অনেক অঞ্চলে নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে ছিলেন। সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় আতঙ্ক, গুজব ও ব্যক্তিগত বিরোধ কখনো কখনো নিরীহ মানুষকে অভিযুক্ত করার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

আজকের চোখে যে আচরণগুলো একেবারেই স্বাভাবিক, সেগুলোর কয়েকটি নিয়েই ছিল নানা ধরনের কুসংস্কার। ইতিহাসের সেই প্রেক্ষাপটে ফিরে তাকালে দেখা যায়, শুধু অপরাধ নয়, কখনো কখনো সাধারণ জীবনযাপনও কাউকে সন্দেহের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারত।

১. বাড়িতে বিড়াল পোষা, বিশেষ করে কালো বিড়াল
আজকের দিনে বিড়াল অনেকের আদরের পোষা প্রাণী। কিন্তু ইউরোপের কিছু অঞ্চলে বিড়ালকে ঘিরে প্রচলিত ছিল নানা অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস। বিশেষ করে কালো বিড়ালকে অশুভ শক্তি কিংবা জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা লোককথা ও কুসংস্কারে দেখা যায়।

ধরুন, আপনি বাড়িতে একটি বিড়াল পুষেছেন। রাতে সেটি ঘুরে বেড়ায়, অন্ধকারে তার চোখ জ্বলে ওঠে, কখনো প্রতিবেশীর বাড়ির আশপাশেও দেখা যায়। এসব স্বাভাবিক আচরণকেই সন্দেহপ্রবণ কেউ অশুভ কিছুর ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা পরিবারে দুর্ভাগ্য নেমে এলে বিড়ালটিকে ঘিরেও গুজব ছড়াতে পারত।

অবশ্য বিড়াল পোষা মানেই ডাইনি সন্দেহে পড়তে হতো, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম ছিল না। বরং প্রাণীটিকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে থেকেই থাকা সন্দেহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারত।

২. ভেষজ উদ্ভিদ ও লোকজ চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা
গাছপালা ও ভেষজ উপাদান সম্পর্কে আপনার ভালো ধারণা আছে। গ্রামের কেউ মাথাব্যথা বা অন্য কোনো সমস্যায় ভুগলে আপনি তাকে পরিচিত ঔষধি গাছ দিয়ে তৈরি পানীয় খেতে দিলেন। রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে আপনার জ্ঞানকে সবাই প্রশংসা করবে—এমন নিশ্চয়তা তখন ছিল না।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে বিভিন্ন সমাজে মানুষ ভেষজ উপাদান ও লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করত। ধাত্রী, ভেষজ চিকিৎসক এবং পরিচর্যাকারীরা মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু চিকিৎসার ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে ভালো কিংবা খারাপ হলে কেউ কেউ তার ব্যাখ্যা খুঁজতেন অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের মধ্যে।

কোনো রোগী সুস্থ হলে সন্দেহ করা হতে পারত, চিকিৎসক অস্বাভাবিক কোনো ক্ষমতার অধিকারী। আবার রোগীর অবস্থার অবনতি হলে অভিযোগ উঠতে পারত, তার ক্ষতি করা হয়েছে। অর্থাৎ সাহায্য করার উদ্দেশ্যে অর্জিত জ্ঞানও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে সন্দেহের কারণ হয়ে উঠতে পারত।

৩. নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা
কাজ করতে করতে নিজের মনে কথা বলা, কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের প্রস্তুতি নেওয়া—মানুষের পরিচিত আচরণ। কিন্তু চার শতাব্দী আগে এমন দৃশ্যকে সবাই একইভাবে দেখত না।

কুসংস্কারে বিশ্বাসী কেউ আপনার বিড়বিড় করে কথা বলাকে অদৃশ্য আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ, মন্ত্রপাঠ কিংবা অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের লক্ষণ বলে ধরে নিতে পারতেন। অথচ আপনি হয়তো বাজারের হিসাব করছেন কিংবা কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।

সপ্তদশ শতকের সমাজে এমন আচরণ দেখলেই কাউকে ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হতো, এমন প্রমাণ নেই। তবে মানুষের অজানা আচরণকে রহস্যময় বা ভীতিকর হিসেবে দেখার প্রবণতা আগে থেকে থাকা সন্দেহকে আরও উসকে দিতে পারত।

৪. নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা—বিশেষ করে নারী হলে
আপনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলেন কিংবা প্রভাবশালী কারও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। বর্তমান সময়ে এগুলো ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাভাবিক প্রকাশ। কিন্তু অতীতের অনেক সমাজে সামাজিক নিয়ম ভেঙে কথা বলার মূল্য দিতে হতো।

বিশেষ করে নারীদের আচরণ নিয়ে ছিল নানা সামাজিক প্রত্যাশা। কোনো নারী প্রচলিত ভূমিকার বাইরে গিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করলে বা প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ালে তিনি অপছন্দের পাত্র হয়ে উঠতে পারতেন। সেই বিরোধের সঙ্গে ধর্মীয় আতঙ্ক কিংবা জাদুবিদ্যা সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস মিশে গেলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পরিবেশ তৈরি হতে পারত।

তবে ডাইনি শিকারের ইতিহাসকে শুধু স্পষ্টভাষী নারীদের নিপীড়নের ইতিহাস হিসেবে দেখাও যথাযথ নয়। অভিযোগের পেছনে সম্পত্তি, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক বিরোধ, স্থানীয় রাজনীতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসসহ নানা কারণ কাজ করেছে। অঞ্চলভেদে অভিযুক্তদের সামাজিক পরিচয় ও পরিস্থিতিও ছিল ভিন্ন।

৫. বাঁ হাতে লেখা বা কাজ করা
বাঁ হাতে লেখেন, খাবার খান কিংবা দৈনন্দিন কাজ করেন? বর্তমান বিশ্বে এটি মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাঁ দিককে ঘিরে নেতিবাচক ধারণা ও প্রতীকী অর্থ প্রচলিত ছিল।

ইংরেজি sinister শব্দটির লাতিন উৎসের অর্থ ছিল ‘বাম’ বা ‘বাঁ দিক’; পরবর্তী ব্যবহারে শব্দটি অশুভ বা ভয়ংকর অর্থও ধারণ করে। ভাষার এই ইতিহাস বাঁ দিক সম্পর্কে পুরোনো নেতিবাচক ধারণার একটি উদাহরণ।

তবে বাঁহাতি হলেই সপ্তদশ শতকে কাউকে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো—এমন সাধারণ নিয়ম ছিল না। বরং সমাজের প্রচলিত ধারণা থেকে কোনো ব্যক্তির ভিন্নতা, তার বিরুদ্ধে থাকা গুজব কিংবা স্থানীয় কুসংস্কার একসঙ্গে কাজ করলে সেই পার্থক্যকে সন্দেহের পক্ষে ব্যবহার করা হতে পারত।

৬. অজানা রোগে আক্রান্ত হওয়া, কিংবা অন্যদের চেয়ে সুস্থ থাকা
গ্রামে হঠাৎ অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ খিঁচুনিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, কেউ অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, আবার কারও আচরণে দেখা দিচ্ছে আকস্মিক পরিবর্তন। কিন্তু রোগের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে কখনো কখনো অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের আশ্রয় নিত।

অতীতে রোগের বহু কারণ মানুষের অজানা ছিল। ফলে কিছু অস্বাভাবিক শারীরিক বা মানসিক উপসর্গকে অভিশাপ, অশুভ আত্মা কিংবা জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করা হতো। কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরও কেউ সুস্থ থাকলে, বিশেষ করে তার সঙ্গে অন্যদের বিরোধ থাকলে, তাকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হতে পারত।

তবে শুধু অসুস্থ হওয়া বা সুস্থ থাকার কারণে কাউকে ডাইনি বলা হতো—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের সময় কিছু মানুষ কীভাবে প্রমাণের বদলে কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করত।

৭. অন্যদের তুলনায় অসাধারণ দক্ষতা বা সাফল্য থাকা
আপনার বাগানে অন্যদের চেয়ে বেশি ফসল হয়। আপনি রান্নায় দক্ষ, পশুপালনে অভিজ্ঞ কিংবা এমন কোনো কাজ জানেন, যা আশপাশের অনেকের অজানা। এসবই আপনার পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ফল হতে পারে। কিন্তু কুসংস্কারে আচ্ছন্ন পরিবেশে ব্যতিক্রমী সাফল্যও কখনো সন্দেহের জন্ম দিতে পারত।

ধরুন, আপনার জমিতে ভালো ফসল হয়েছে, অথচ পাশের জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বাস্তবে মাটি, আবহাওয়া, বীজ কিংবা পরিচর্যার পার্থক্য এর কারণ হতে পারে। কিন্তু আগে থেকেই আপনার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন এমন কেউ ঘটনাগুলোর মধ্যে অযৌক্তিক সম্পর্ক খুঁজে নিতে পারেন।

কোনো ব্যক্তির সাফল্যকে অন্যের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই প্রবণতা গুজব ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে যখন সমাজে জাদুবিদ্যা সম্পর্কে ভয় ও অবিশ্বাস আগে থেকেই সক্রিয় থাকে।

৮. প্রতিবেশীর সঙ্গে তর্ক কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা
ডাইনি শিকারের ইতিহাসে ব্যক্তিগত বিরোধ ও পারস্পরিক অভিযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরির জন্য সব সময় ব্যতিক্রমী আচরণের প্রয়োজন হতো না; কখনো কখনো প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারত।

ধরুন, গ্রামের একজনের সঙ্গে আপনার তর্ক হয়েছে। কয়েক দিন পর তার গবাদিপশু মারা গেল কিংবা ফসল নষ্ট হলো। তিনি যদি বিশ্বাস করেন যে আপনি তাকে অভিশাপ দিয়েছেন, তাহলে ওই দুর্ভাগ্যের জন্যও আপনাকে দায়ী করার চেষ্টা করতে পারেন।

বাস্তবে তর্কের সঙ্গে গবাদিপশুর মৃত্যু বা ফসলহানির কোনো সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। কিন্তু গুজব, সন্দেহ এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ একত্র হলে সাধারণ ঘটনাও অভিযোগের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই ডাইনি বিচারের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—অভিযোগ সব সময় কোনো বাস্তব অপরাধের প্রমাণের ওপর নির্ভর করত না। কখনো কখনো মানুষের পারস্পরিক অবিশ্বাসই নিরীহ কাউকে বিপদের মুখে ঠেলে দিত।

৯. অদ্ভুত স্বপ্ন দেখা কিংবা স্বপ্নের কথা অন্যকে বলা
এক রাতে আপনি স্বপ্ন দেখলেন, আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেন কিংবা এমন কাউকে দেখলেন, যার সঙ্গে বাস্তবে কখনো দেখা হয়নি। সকালে সেই স্বপ্নের কথা বন্ধুদের বললেন। বর্তমান সময়ে এটি নিছক কৌতূহলোদ্দীপক গল্প হতে পারে। কিন্তু অতীতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সমাজে নানা বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

কিছু মানুষ স্বপ্নকে ভবিষ্যতের সংকেত, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা কিংবা অদৃশ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবে দেখতেন। তবে এসব ধারণা অঞ্চল, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও লোকজ সংস্কৃতি অনুযায়ী ভিন্ন ছিল।

শুধু অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার কারণে কাউকে ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হতো—এমন সর্বজনীন ঐতিহাসিক নিয়ম ছিল না। কিন্তু আপনার স্বপ্নের গল্প যদি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে আগে থেকেই ছড়িয়ে থাকা গুজব কিংবা অশুভ বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যেত, তাহলে সেটির ভুল ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকত।

১০. অন্যদের চেয়ে আলাদা জীবনযাপন করা
এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—কখনো কখনো কোনো বিশেষ কাজের চেয়ে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান ও পরিচিত নিয়মের বাইরে থাকা বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারত।

আপনি হয়তো একা থাকতে পছন্দ করেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কম মেলামেশা করেন, আপনার পোশাক বা কথাবার্তা অন্যদের থেকে আলাদা। এসবের কোনোটিই অপরাধ নয়। কিন্তু ছোট সম্প্রদায়ে পরিচিত রীতিনীতি থেকে বিচ্যুত কাউকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হলে তার সাধারণ আচরণও নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

আগে থেকেই কোনো অভিযোগ থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারত। একজনের মুখে ছড়ানো কথা অন্যের কাছে নতুন রূপ নিত, আর সময়ের সঙ্গে গুজবই যেন প্রমাণের বিকল্প হয়ে দাঁড়াত। অভিযোগের মুখে পড়া ব্যক্তির পক্ষে নিজের নির্দোষিতা প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারত।

অতীতের ডাইনি শিকার আজও যে প্রশ্ন রেখে যায়
সপ্তদশ শতকের ডাইনি শিকারের ইতিহাস শুধু অতীতের কুসংস্কারের গল্প নয়। এটি দেখায়, ভয়, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় আতঙ্ক, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও গুজব একসঙ্গে কাজ করলে কীভাবে নিরীহ মানুষ নিপীড়নের শিকার হতে পারেন।

তবে মনে রাখা জরুরি, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সব অঞ্চলে ডাইনি বিচার একইভাবে পরিচালিত হয়নি। সময়, স্থান, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযোগের ধরন এবং তার পরিণতিও ভিন্ন ছিল। একইভাবে তালিকায় থাকা প্রতিটি আচরণই ডাইনি অভিযোগের স্বীকৃত বা প্রচলিত কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ইতিহাসকে অতিসরল করে দেখা হবে।

এই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অজানা কোনো ঘটনা ঘটলেই তার পেছনে অশুভ শক্তি বা ষড়যন্ত্র খুঁজে নেওয়া বিপজ্জনক। কোনো ব্যক্তির ভিন্নতা, অসুস্থতা, মতামত কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। যুক্তি, প্রমাণ ও মানবিকতার বদলে যখন গুজব ও অন্ধবিশ্বাস সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তখন সমাজের যে কেউ অন্যায়ের শিকার হতে পারেন।

চারশ বছর আগের সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে এসেছে পৃথিবী। কিন্তু কাউকে না বুঝেই সন্দেহ করা, গুজবের ভিত্তিতে বিচার করা কিংবা ভিন্নতার কারণে কাউকে অপছন্দ করার প্রবণতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাই ডাইনি শিকারের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়—কোনো মানুষকে অভিযুক্ত করার আগে প্রমাণের গুরুত্ব বোঝা এবং তার প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা শুধু আধুনিক মূল্যবোধ নয়, মানবিক সমাজেরও অপরিহার্য শর্ত।

কালের আলো/এএএন/জেএন

জাহাজবাড়িতে অভিযান নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানি নভেম্বরে

আদালত প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৭ অপরাহ্ণ
জাহাজবাড়িতে অভিযান নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানি নভেম্বরে

রাজধানীর কল্যাণপুরের ‘জাহাজবাড়ি’তে অভিযান চালিয়ে নয় তরুণকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আট আসামির এ মামলায় পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) আসামিপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। ২০১৬ সালে কল্যাণপুরের একটি বাড়িতে পুলিশের অভিযানে নয় তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলাটি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অভিযানে কথিত জঙ্গি আস্তানার পরিচয় দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

আসামিপক্ষের আবেদনে শুনানি পেছাল
মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির জন্য বুধবার দিন নির্ধারিত ছিল। তবে আসামিপক্ষ সময় আবেদন করায় ট্রাইব্যুনাল শুনানি পিছিয়ে ১৭ নভেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের কল্যাণপুর অভিযানে কথিত জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নয় তরুণকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির পর মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।

২০১৬ সালে কল্যাণপুরে ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনার পর ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের ‘তাজ মঞ্জিল’ নামের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ভবনটির আকৃতির কারণে স্থানীয়দের কাছে বাড়িটি ‘জাহাজবাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল।

‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ নামে পরিচালিত ওই অভিযানে নয় তরুণ গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় হাসান নামে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং আরেকজন পালিয়ে যান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযানটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই অভিযানে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নয় তরুণকে হত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়।

কারাগারে দুই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা
মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। এ ছাড়া মামলার ছয় আসামি পলাতক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় এবং তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন।

পরবর্তী শুনানি ১৭ নভেম্বর
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ১৭ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করায় ওই দিন মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে নজর থাকবে। অভিযোগ গঠন হলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো বিচারাধীন। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারিত হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

‘ইসলামবিরোধী’ দাবি করে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ, দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে শত শত আফগান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪১ অপরাহ্ণ
‘ইসলামবিরোধী’ দাবি করে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ, দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে শত শত আফগান

‘ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়’—এমন যুক্তি দেখিয়ে চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। এতে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা হারাতে পারেন দেশটির শত শত মানুষ। চিকিৎসকেরা বলছেন, দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ ও বিভিন্ন আঘাতে কর্নিয়ার ক্ষতি হওয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য এই অস্ত্রোপচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তালেবান কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির আশঙ্কা থাকায় চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার চালিয়ে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে দেশটিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের যে কার্যক্রম সম্প্রতি গড়ে উঠেছিল, তা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।

কয়েক মাসের উদ্যোগেই বাধা
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের কার্যক্রম চালু করতে স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছিল একটি চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা। চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের বাইরে আফগানিস্তানেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো।

কাবুলের নূর চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক নূর জামান হাশিম জানান, কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁদের কর্মীরা ৯০টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করেছিলেন। হাসপাতালে এ চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের অধিকাংশই তরুণ-তরুণী।

আঘাত, জখম, বিস্ফোরণ এবং ঝালাইয়ের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কারণে এসব রোগীর অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ছিল।

পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও কর্নিয়ার সংকট
আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত।

নূর জামান হাশিম বলেন, ‘কয়েক দশকের সহিংসতায় আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত চক্ষুবিশেষজ্ঞ আমাদের নেই। স্থানীয়ভাবেও প্রয়োজনীয় কর্নিয়া পাওয়া যায় না।’

তালেবান কর্তৃপক্ষের নির্দেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তালেবান কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে আমাদের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। কঠোর শাস্তির ভয়ে কেউ তাদের নির্দেশ অমান্য করার সাহস পাচ্ছেন না।’

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে যাঁদের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে বা হারিয়ে গেছে, তাঁদের জন্য বিকল্প চিকিৎসার সুযোগ সীমিত।

পাকিস্তান থেকে কর্নিয়া সরবরাহের উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা (এপিপিএনএ) ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। অঙ্গদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা এসব কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগীদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।

চলতি বছরের শুরুতে সংস্থাটি আফগানিস্তানেও এ কর্মসূচি চালু করে। এর ফলে দেশটিতে ১৫০টিরও বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এসব অস্ত্রোপচার পরিচালনার জন্য তিনজন আফগান চক্ষু বিশেষজ্ঞকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এপিপিএনএর কর্নিয়া কর্মসূচির প্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জাফর মীর ফাউন্ডেশনের প্রধান চিকিৎসক ফাওয়াদ জাফর বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে আমরা পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছি। এ পর্যন্ত ১০ হাজার মানুষ এই কর্মসূচি থেকে উপকৃত হয়েছেন।’

আফগানিস্তানে কর্মসূচি সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রায় চার মাস আগে আমরা আফগানিস্তানেও এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করি। দেশটিতে শত শত মানুষের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তালেবান সরকারের নির্দেশে কর্মসূচিটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।’

চিকিৎসাসেবা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
২০২১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তালেবান সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণে আফগানিস্তানে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনে নিষেধাজ্ঞা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চোখের ক্ষতিগ্রস্ত স্বচ্ছ অংশ বদলে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে আঘাত বা দুর্ঘটনায় কর্নিয়া নষ্ট হওয়া রোগীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা। এ কার্যক্রম বন্ধ থাকলে অনেক রোগীর চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

নিষেধাজ্ঞার ফলে শুধু চলমান কর্মসূচিই থেমে যায়নি, ভবিষ্যতে নতুন রোগীদের চিকিৎসার সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন থাকা মানুষের জন্য এখন বড় প্রশ্ন—কবে আবার এই চিকিৎসা চালু হবে।

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন