খুঁজুন
                               
, ,
           

ইরানের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র, জানালেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ
ইরানের সঙ্গে ফের আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র, জানালেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সোমবার বিকেল থেকেই এই আলোচনা শুরু হতে পারে। এর আগে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন তিনি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে সোমবার (০৩ আগস্ট) এ তথ্য জানানো হয়েছে।

রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছিল। তিনি বলেন, তারা হামলার প্রস্তুতি দেখতে পেয়েছিল। আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি এবং সেটি আগামীকাল বিকেল থেকে শুরু হবে।

এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, চুক্তির পরিধি নিয়ে সমঝোতার অগ্রগতি হওয়ায় ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশ সম্ভাব্য হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।

তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বরাবরই আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের কথা বলে আসলেও অতীতে এমন উদ্যোগের পরও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা আবারও শুরু হয়েছে।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা আমরা দেখব। আমরা প্রস্তুত আছি। তবে আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তাকে সামরিক হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সি ট্রাম্পের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে কোনো অনুরোধ জানায়নি। সংস্থাটি ট্রাম্পের বক্তব্যকে “নতুন একটি মিথ্যা” বলেও মন্তব্য করেছে।

এদিকে ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

তবে সোমবারের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার স্থান কিংবা এতে কারা অংশ নেবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি ট্রাম্প। সূত্র: বিবিসি

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

ড. মোঃ মিজানুর রহমান:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
জাতীয় নিরাপত্তা: সামরিক সাফল্য ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

জাতীয় নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল সীমান্ত রক্ষা কিংবা সামরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সম্প্রীতি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র তার সমগ্র ভূখণ্ডে কার্যকর প্রশাসন, আইনের শাসন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তাকে আজ একটি সমন্বিত রাষ্ট্রনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের দুর্গম রেতলাং এলাকায় পরিচালিত সাম্প্রতিক সফল সামরিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে তাদের তৎপরতা পরিচালনার চেষ্টা করেছে। এসব কার্যক্রম শুধু স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করেনি; বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। এই বাস্তবতায় পরিচালিত অভিযান প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দেশের কোনো অঞ্চলই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

রেতলাংয়ের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই অভিযানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খাড়া পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে বর্ষাকালে দুর্গম পথ এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থান নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অভিযান পরিচালনাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী এবং আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে সফল অভিযান পরিচালনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এটি কেবল একটি ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং প্রতিকূল পরিবেশেও রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভৌগোলিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—তিনটি দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে। বিশেষত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের একটি বড় অংশ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকপাচারের ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র প্রায়ই তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কেবল স্থানীয় বা আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে বান্দরবান বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। পাশাপাশি কৃষি, বনজ সম্পদ, ক্ষুদ্র শিল্প এবং সীমান্ত বাণিজ্য এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণেই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, অন্যদিকে স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটনের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাকে কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযানও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। এটি শুধু একটি সফল সামরিক অভিযান নয়; বরং পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি কৌশলগত নিরাপত্তা কার্যক্রম। সামরিক কৌশলবিদ সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Art of War-এ উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত বিজয় অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্বপ্রস্তুতি, তথ্য এবং সঠিক পরিকল্পনার ওপর। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম, বিশেষায়িত বাহিনীর দক্ষতা এবং সমন্বিত পরিকল্পনাই আজকের নিরাপত্তা অভিযানের সফলতার প্রধান ভিত্তি।

রেতলাং অভিযানের আরেকটি তাৎপর্য হলো এটি স্থানীয় জনগণের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যখন রাষ্ট্র জনগণের জীবন, সম্পদ ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তখন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে সামরিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু অভিযানের ফলাফলে নয়, বরং সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী নিরাপত্তা, জনআস্থা এবং উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সামরিক সাফল্য কোনো সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও তা কখনোই এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিতে হয়। অন্যথায় সাময়িক নিরাপত্তা অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়।

কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক দশক ধরে রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (Revolutionary Armed Forces of Colombia–FARC) নামের মার্ক্সবাদী গেরিলা সংগঠন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদকপাচার এবং সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, যা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার একদিকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সীমিত করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংলাপ, গ্রামীণ উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। এর ফলে পর্যটন, কৃষি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে এবং বহু অঞ্চল ধীরে ধীরে উন্নয়নের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর দেশটি উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পর্যটন উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে। যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবু নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে ফিলিপাইনের মিন্ডানাও অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরাপত্তা অভিযানকে রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় না করলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

এই প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের সফল অভিযানকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। সামরিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক গোয়েন্দা সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার কার্যকর সমন্বয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক অভিযান ভবিষ্যতে একই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিশ্বে অনেক নিরাপত্তা হুমকি জাতীয় সীমারেখা অতিক্রম করে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে নিরাপত্তা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের সক্রিয় অংশীদার বলে অনুভব করলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। এজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সংযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও সংকুচিত হবে। তাই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পর-সম্পূরক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। পরিবেশসম্মত পর্যটন, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য, ফল ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থান তত বাড়বে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও তত শক্তিশালী হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নের এই পারস্পরিক সম্পর্কই আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি।
একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পাশাপাশি বজায় থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য অপরিহার্য।

বান্দরবানের সাম্প্রতিক অভিযান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং কৌশলগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র দেশের যেকোনো অঞ্চলে তার আইনগত কর্তৃত্ব ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তবে এই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই নিরাপত্তায় রূপ দিতে হলে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, অবৈধ অস্ত্র, মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশীদার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তঃসংস্থার কার্যকর সমন্বয়, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

অতএব, সামরিক সাফল্যকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও আধুনিক করা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা, স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীদার করা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ সুযোগ সম্প্রসারণ পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সামরিক সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এই সমন্বিত প্রয়াসই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে আরও কার্যকর, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।ড. মোঃ মিজানুর রহমান
Mizan12bd@yahoo.com

গোপালগঞ্জে ৫ আগস্ট ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা

গোপালগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫৩ অপরাহ্ণ
গোপালগঞ্জে ৫ আগস্ট ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা

‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ ঘিরে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন। জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ৫ প্লাটুন সদস্য। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, সরকারি স্থাপনা ও জনসমাগমস্থলে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) গোপালগঞ্জ শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি এবং নিয়মিত টহল কার্যক্রম।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে জেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যেই আগাম নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও জনসমাগমস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, ‘আগামী ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি যে-কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫০ অপরাহ্ণ
জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনিবার সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে জুলাই আগস্ট মাসে যে আন্দোলন হয়েছিল তা সম্পূর্ণভাবে ছিল জনগণের আন্দোলন। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে বলেই জুলাই আন্দোলন সফল হয়েছে। জনগণ যখন সম্পূর্ণভাবে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে, তখনই আন্দোলন সফল হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পরিষ্কারভাবে সাফ বলে দিয়েছি এই জুলাই আন্দোলনের সফলতার ক্রেডিট এই দেশের সর্বস্তরের জনগণের। এর কৃতিত্ব কোন একক ব্যক্তি, একক কোন রাজনৈতিক দলের এটি কোন ক্রেডিট নয়। বিগত ১৭ বছর এই দেশের মানুষ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী আরও অনেকগুলো রাজনৈতিক দল সবাই ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিল। মাঠ ছেড়ে আমরা কখনো চলে যাইনি। আমরা কখনোই জনগণকে একা ফেলে মাঠ ছেড়ে চলে যাইনি।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ-এ (কেআইবি) ‘গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনিবার সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, অনেক কথা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম কথা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে- এখন সময় হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন করার। এখন সময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এখন সময় হচ্ছে যারা ষড়যন্ত্র করতে চায় তাদের ব্যাপারে ধৈর্য সহকারে ঠান্ডা মাথায় তাদের ষড়যন্ত্রের প্রতি  সজাগ দৃষ্টি রাখা। জনগণকে সতর্ক করা এবং ঠিক একইভাবে আমরা যেই পরিকল্পনা জনগণের সামনে দিয়েছি, আমরা জনগণের জন্য যা করতে চাইছি, দেশকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা যা করতে চাইছি, সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা। জনগণের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা।

বিএনপি জনগণের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা নিয়ে এগিয়ে চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপিই প্রথম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশের মানুষের সামনে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেছিল, যা পরবর্তীতে রাজপথের মিত্র দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ৩১ দফায় রূপ নেয়। গত সাধারণ নির্বাচনে দেশের জনগণ এই ৩১ দফায় পূর্ণ আস্থা ও ম্যান্ডেট দিয়েছে। ফলে এটি আর কেবল বিএনপির একক রূপরেখা নয়, বরং এটি দেশের সমগ্র জনগণের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে।

সরকার পরিচালনার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখা গেছে স্বৈরাচারী শাসনামলের বিগত ১৭ বছরে দেশের প্রতিটি খাতকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও বিভাজিত প্রশাসনের মধ্য দিয়েই বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার তাতক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখনো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।

জ্বালানি সংকটের সাময়িক কষ্ট স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার ‘পেট্রোনাস’ কোম্পানির সাথে আলোচনা চুড়ান্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কনটেইনারের মাধ্যমে এলএনজি গ্যাস দেশে আনা হবে। এর ফলে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করে দ্রুততম সময়ে জাতীয় গ্রিডে বাড়তি ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশীয় শক্তি বৃদ্ধি করতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অকার্যকর রাখা ‘বাপেক্স’-কে পুনরুজ্জীবিত করে দুটি নতুন রিগ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে বিশাল এলাকায় নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলছে, যেখানে চীনা ও কোরিয়ান বিনিয়োগ আসবে। পাশাপাশি বিটিএমসি-র বন্ধ পড়ে থাকা প্রায় ৫০টি মিল-কারখানা বেসরকারি খাতে চালু করে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ ফান্ড চালু করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যখাতের আমূল পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সকল উপজেলা হাসপাতালে ন্যূনতম ১০ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট চালু করা হবে। ইতিমধ্যেই জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ডায়ালিসিস সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এছাড়া বাজেটে ডিউটি ও ট্যাক্স কমিয়ে হার্টের রিং (স্টেন্টিং), ডায়ালিসিস, চোখের লেন্স এবং আইটি উপকরণের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনা হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শিক্ষা কার্যক্রমকে আনন্দের মাধ্যমে শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) ধারণায় ঢেলে সাজাতে চাই। আমাদের সন্তানরা কী চায়, তা বুঝতে হবে এবং তাদের জন্য সঠিক পথ তৈরি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সর্বদা দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেছেন; সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও জনগণের সেবায় নিবেদিত।

তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি প্রাইমারি স্কুল পর্যায়ে ২২ লক্ষ শিশুর ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং ১২-১৪ বছর বয়সীদের জন্য নতুন গতি স্পোর্টস প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। তরুণদের মেধা ও শক্তি বিকাশে সঠিক পথ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।

জনগণের মৌলিক চাহিদার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সাধারণ মানুষ রাজপথে শান্তি চায়, সন্তানের শিক্ষার সুব্যবস্থা চায়, উন্নত চিকিৎসা চায়, নিরাপত্তা চায় এবং নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ চায়। একই সাথে নাগরিকরা সময়মতো তাদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে চায়। জনগণের এই চাওয়াগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও অসংখ্য অরাজনৈতিক সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকার এবং দলের সাধ্যমতো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছি এবং থাকব।’

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন তাদের সুচিকিৎসা এবং যাদের কর্মসংস্থান প্রয়োজন তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

পরিশেষে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিগত বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পাশাপাশি দেশের শান্তি, অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

বিএনপি’র মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টি কাজী জাফর এর সভাপতি মোস্তফা জামান হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি,গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক নূর, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ডক্টর ফরিদুজ্জামান ফরহাদ,জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এর মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন, ভাসানি জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, যুবদল, সেচ্ছাসেবকদল,কৃষকদল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসএকে