খুঁজুন
                               
, ,
           

পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

এ এইচ এম ফারুক:
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

বাংলাদেশ একটি একক, অবিভাজ্য ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র। কিন্তু দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বজায় রাখার অপচেষ্টা চলছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল স্বায়ত্তশাসন দাবি। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির জন্য উপজাতিয় নেতৃবৃন্দের দাবি দাওয়া নিয়ে জিয়াউর রহমান সরকার আলোচনা শুরু করেন। এরপর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার ৯ বছরে ৬ বার, বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ এর সরকার ৫ বছরে ১৩ বার এবং ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার গঠিত হলে জাতীয় কমিটির সাথে ৭ বার আলোচনা করে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততায় চুক্তিটি স্বাক্ষর করে সম্পাদিত করেছে।

কিন্তু এরপর আবার ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সনদ (ইউএনডিআরআইপি) ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় নতুন তৎপরতা। এখন তা গড়িয়েছে ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ শব্দগত ও পরিচয়গত টানাপোড়েন।

অথচ ১৯৯৭ সালের চুক্তির পক্ষ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও তার শীর্ষ নেতা সন্তু লারমা স্বজ্ঞানে ও আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের ‘উপজাতি’ পরিচয়েই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তবে চুক্তির দীর্ঘ এক দশক পর ২০০৭ সালেরপর কেনো নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ও দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠা করার এক মরিয়া প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—১৯৯৬-৯৭ সালে যে গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করল, এখন তারা হঠাৎ ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবীতে সোচ্চার কেন? এর পেছনে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক রহস্যটাই বা কী?

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল পাঠ পরীক্ষা করলে দেখা যায়, চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ১ নং ধারায় পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ‘খ’ খণ্ডের ১ নং ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে ‘উপজাতি’ শব্দটি বহাল থাকবে। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ বা ‘উপজাতীয়’ শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সন্তু লারমা ও তাঁর প্রতিনিধিরা এই প্রতিটি ধারায় স্বাক্ষর করেছেন। পরবর্তীতে এই চুক্তির আলোকেই গঠিত হয় তিনটি পার্বত্য জেলায় পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮ এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন-২০০১ (সংশোধিত ২০১৬)। এসব আইনের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি’ শব্দটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি ও তার সংগঠন রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় সংলাপে নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনি পরিচয় ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নেন এবং তার ভিত্তিতে বিগত প্রায় ৩ দশক (মানে প্রায় ২৯ বছর) ধরে রাষ্ট্রের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেন, সেখানে আজ তারাই আবার একই কণ্ঠে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করা চরম এক স্ববিরোধিতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ও জনমিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, অঞ্চলটিতে বর্তমানে বসবাসরত মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি নাগরিকই বাঙালি (৫১%)। অবাঙ্গালি বা উপজাতি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমন্বিত হার প্রায় ৪৯%। এর মধ্যে প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা যা প্রায় ২৫% এর মত। আর বাকি ২৪ শতাংশ মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো। অথচ, চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তা কেবল জনসংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, বরং মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সমতার বিচারেও প্রচণ্ড বৈষম্যমূলক।

বাঙালিরা ৫১ শতাংশ হলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে নেতৃত্বে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) রাখা হয়েছে। আর বাকি ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে রাখা হয়েছে ৬৭ শতাংশ। কিন্তু সেটাও লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। যেমন গত বৈষম্যবিরোধী সরকারের সময় পার্বত্য জেলা পরিষদে ১৫ সদস্যের পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে ১৫ সদস্যের জেলা পরিষদে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) অ-উপজাতীয় বাঙালির সদস্য সংখ্যা গড়ে মাত্র চারজন (২৬ শতাংশ), যেখানে অবাঙ্গালি উপজাতিদের প্রতিনিধিত্ব ১১ জন (৭৪ শতাংশ)। চাকরির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উদাহরণস্বরূপ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে সিএইচটি-ইউএনডিপির যৌথ প্রকল্পে গত ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৯ জনের নিয়োগে মাত্র ২ জন (১০ শতাংশেরও কম) বাঙালি নিয়োগ পান, আর অবশিষ্ট ১৭ জনই (৯০ শতাংশের বেশি) অবাঙ্গালি উপজাতীয় সম্প্রদায় থেকে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, যেখানে সমতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ের অর্ধেকেরও বেশি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।

‘আদিবাসী’ দাবির পেছনের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ (আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এবং ইউএনডিআরআইপি) অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ বা ‘ইনডিজেনাস’ শব্দের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও অধিকারের রূপরেখা রয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠী যদি ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পায়, তবে সেই ভূখণ্ডের ওপর তাদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ (সেলফ-ডিটারমিনেশন), নিজস্ব ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে সেখানে মূল রাষ্ট্র বা দেশের অন্যান্য নাগরিকদের অধিকার খর্ব হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা তৈরি হয়।

নৃবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো (যেমন: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার (আরাকান), ভারত বা ত্রিপুরা থেকে অভিবাসিত হয়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র বা প্রকৃত আদিবাসী বাঙালিরা। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কখনোই ‘আদিবাসী’ নয়, বরং তারা ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’।

১৯৯৭ সালে যখন তারা চুক্তি করেছিলেন, তখন উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে একটি বিশেষ প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করা। পরবর্তীতে যখন তারা দেখলেন যে রাষ্ট্র সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬(২) ও ২৩(ক)-তে দেশের সকল নাগরিককে ‘বাঙালি’ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়কে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করল, তখন তারা কৌশল পরিবর্তন করেন। এখন ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের অশুভ এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, আলাদা মানচিত্র, নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রার মতো বিষয়গুলোর প্রকাশ ঘটিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের অন্তর্দাহ প্রকাশ করেছে।

উচ্চ আদালতের রায় ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও চুক্তির বেশ কয়েকটি সাংবিধানিক অসংগতি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে রিট (মামলা নম্বর ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭) করা হয়েছিল। ২০১০ সালের ১২ ও ১৩ এপ্রিল তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে স্পষ্ট বলা হয়, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইনের অনুচ্ছেদ ৪০ ও ৪১ রাষ্ট্রের একক সত্তাকে খর্ব করে এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১-এ রক্ষিত রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, জেলা পরিষদ আইনের ৬ নম্বর ধারায় কোনো ব্যক্তি ‘উপজাতীয়’ বা ‘অ-উপজাতীয়’ কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সার্কেল চিফ ও হেডম্যানদের হাতে দেওয়া নিশ্চিতভাবে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১-এর লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে একজন বাঙালি নাগরিককে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও জমির মালিকানা থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করা হয়। বর্তমানে এ মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সন্তু লারমাসহ জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা, সকল অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরকারের কাছে সমর্পণ করা এবং তালিকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত প্রায় আড়াই দশকে তারা পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ তো করেইনি, বরং পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে। একটি জেএসএস থেকে এখন ৪টি গ্রুপসহ মোট ৭টি সশস্ত্র সংগঠন পাহাড় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা, বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সভাপতির পদসহ সকল সুবিধা উপজাতি হিসেবে গ্রহণ করার পর, এখন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে ‘আদিবাসী’ পরিচয় দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ে বসবাসকারী ৫১ শতাংশ অ-উপজাতি তথা পার্বত্য বাঙালিকে অধিকারহারা রেখে কোনো টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ বিতর্ক বন্ধ করে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে পাহাড়ের প্রতিটি নাগরিকের—তা সে বাঙালি হোক বা অবাঙ্গালি—সমান অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। নচেৎ, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে চক্রান্ত চলছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গৃহীত, অবিলম্বে কার্যকরের প্রজ্ঞাপন জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৫ অপরাহ্ণ
ইশরাকের পদত্যাগপত্র গৃহীত, অবিলম্বে কার্যকরের প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল। ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার পর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীসহ পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছেন ২৭ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৩ জন।মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে পদত্যাগ কার্যকরের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ইশরাক হোসেনের দায়িত্ব আর থাকছে না।

এর আগে সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়। পরদিন মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর আগে গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় রেললাইন-সংলগ্ন স্থানে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ইশরাক হোসেন।

ঘটনাটির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা ও পরবর্তী সময়ে পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় আসে। তবে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ এবং বিতর্কিত অভিযানের সঙ্গে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি। মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

দেশে অনাহারেও কিমের অবকাশে কোটি ডলারের নৌযান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক , কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৮ অপরাহ্ণ
দেশে অনাহারেও কিমের অবকাশে কোটি ডলারের নৌযান

উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের একাংশ যখন দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকট, অপুষ্টি ও কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, তখন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং–উনের অবকাশযাপনের জন্য রয়েছে বিলাসবহুল নৌযানের বহর। উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান উপকূলে কিমের অবকাশকেন্দ্রের আশপাশে চারটি বড় নৌযানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, নৌযানগুলোর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৫০, ৫৫, ৬০ ও ৮০ মিটার। এগুলো কিম ও তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত বিনোদনের কাজে ব্যবহৃত হয় বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। নৌযানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ মিটার বা ২৬৩ ফুট। এর ডেকে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সুইমিংপুল, যার এক প্রান্তে রয়েছে ওয়াটার স্লাইড। দীর্ঘদিন একটি মেরামতকেন্দ্রে থাকার পর গত জুলাইয়ের শুরুতে নৌযানটিকে ওয়ানসানের কালমা উপদ্বীপের উপকূলীয় জলসীমায় দেখা যায়। জুলাই থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্যাটেলাইট ছবিতে নৌযানটির উপস্থিতি বারবার ধরা পড়েছে। বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শুধু বড় নৌযানটিই নয়, কিমের অবকাশকেন্দ্রের আশপাশে থাকা অন্য নৌযানগুলোর চলাচলও নজরে এসেছে। এসব নৌযানের মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে উত্তর কোরিয়ার সাবেক কর্মকর্তা, দেশত্যাগী নাগরিক এবং বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশটির শাসকগোষ্ঠীর বাইরে কারও পক্ষে এ ধরনের ব্যয়বহুল নৌযানের মালিক হওয়া অত্যন্ত কঠিন।

কিমের অবকাশকেন্দ্র ঘিরে চার নৌযানের আনাগোনা
বিবিসির শনাক্ত করা চারটি নৌযানের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৫০, ৫৫, ৬০ ও ৮০ মিটার। চলতি বছর বিভিন্ন সময়ে এগুলোকে ওয়ানসানের কালমা উপদ্বীপ এবং আশপাশের দ্বীপগুলোর জলসীমায় দেখা গেছে। এর মধ্যে ৮০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটির উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে শনাক্ত হয়েছে। ৫০ ও ৫৫ মিটার দীর্ঘ দুটি নৌযানকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ওয়ানসানের কাছে তে ও সিন দ্বীপের আশপাশে বারবার দেখা গেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে ৫০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটির পাশে চারটি ছোট নৌকাও দেখা যায়। অন্যদিকে, ৬০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটিকে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কিমের অবকাশকেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব নৌযানের অবস্থান ও চলাচল কিমের ব্যক্তিগত অবকাশযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে স্যাটেলাইট ছবিতে কোনো নৌযানকে নির্দিষ্ট স্থানে দেখা গেলেই সেখানে কিম বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

নৌযানগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হয়
উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির ‘৩৯ নম্বর দপ্তরে’ একসময় কাজ করতেন রি জং হো। দেশটির শাসকগোষ্ঠীর বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এই দপ্তর জড়িত বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি উত্তর কোরিয়া ছেড়ে চলে যান। রি জং হোর ভাষ্য অনুযায়ী, শীতকালে এসব নৌযান জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে রাখা হয়। গ্রীষ্ম এলে সেখান থেকে সরিয়ে কিমের ভিলা বা কালমা উপদ্বীপের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সাঁতার কাটা এবং বিনোদনের কাজে এগুলো ব্যবহার করেন বলে তিনি জানান। স্যাটেলাইট ছবিতে নৌযানগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পাওয়া তথ্য এবং সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। তবে নৌযানগুলোর মালিকানা, সুনির্দিষ্ট ব্যবহার কিংবা প্রতিটির প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

ওয়ানসান কেন কিম পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ
উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ওয়ানসান দীর্ঘদিন ধরে কিম পরিবারের অবকাশযাপনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। শহরটির আশপাশে রয়েছে উপকূলীয় ভিলা, ব্যক্তিগত বিনোদনকেন্দ্র এবং বিভিন্ন অবকাশসুবিধা। কিম জং–উন শৈশবের একটি বড় সময় তাঁর মায়ের সঙ্গে ওয়ানসানে কাটিয়েছেন বলে জীবনীকার ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য থেকে জানা যায়। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত কিম জং–ইলের ভিলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক দেশত্যাগী ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওই এলাকার ভিলাগুলোতে মূলত অভিজাত ব্যক্তিরাই যাতায়াত করতেন। গ্রীষ্মকালে সেখানে শিশু-কিশোরদের পানিতে স্কি করতেও দেখেছেন তিনি। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে কিমের ব্যক্তিগত অবকাশযাপনের বিস্তারিত সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। তাঁর বিভিন্ন সফরকে বরং সরকারি কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে উত্তর কোরিয়া ছেড়ে আসা কয়েকজন বিবিসিকে জানিয়েছেন, কিম পরিবারের ওয়ানসানে অবকাশযাপনের বিষয়টি দেশটির অন্তত কিছু মানুষের জানা।

অবকাশকেন্দ্রে পর্যটন সুবিধা বাড়াচ্ছে উত্তর কোরিয়া
ওয়ানসান কালমা অবকাশকেন্দ্রকে পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বহুতল হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, ক্রীড়াসুবিধা এবং জলবিনোদনকেন্দ্র রয়েছে। প্রায় ২০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব বলেও দাবি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর রুশ পর্যটকদের সেখানে ভ্রমণের ছবি প্রকাশ করেছে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যটকদের জন্যও কেন্দ্রটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদমাধ্যম নাম প্রকাশ না করা এক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার কিছু স্থানীয় বাসিন্দার জন্য চার রাতের ভ্রমণ প্যাকেজের দাম প্রায় ১০০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে দেশটির অধিকাংশ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় এ পরিমাণ অর্থও বড় অঙ্কের।

সাধারণ মানুষের সংকটের বিপরীতে শাসকের বিলাসী জীবন
উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। দেশটির শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় জাতীয় বাজেট, ব্যক্তিগত সম্পদ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট নয়। তবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দেশটিতে দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর সমস্যা উঠে এসেছে। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষ কঠোর মানবাধিকার পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং অনেককে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকটের কারণে দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কিমের অবকাশকেন্দ্রের কাছে একাধিক বড় নৌযানের উপস্থিতি দেশটির শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। তবে নৌযানগুলোর প্রকৃত মূল্য এবং রক্ষণাবেক্ষণে কত অর্থ ব্যয় হয়, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। একই ধরনের বিলাসবহুল প্রমোদতরির দাম কয়েক কোটি ডলার থেকে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে। এর আগে কিমের ব্যবহৃত ২৯ মিটার দীর্ঘ একটি প্রিন্সেস প্রমোদতরির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭০ লাখ ডলার বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে এই হিসাবকে নতুন শনাক্ত হওয়া চারটি নৌযানের প্রকৃত দাম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

স্যাটেলাইট ছবিতে নৌযানের চলাচল কেন গুরুত্বপূর্ণ
উত্তর কোরিয়ার মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত দেশে শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। এ কারণে কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সামরিক অবকাঠামো এবং শীর্ষ নেতাদের ব্যবহৃত স্থান পর্যবেক্ষণের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিম জং–উন দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকলে কখনো কখনো এসব বিলাসবহুল নৌযানের চলাচল বেড়ে যায়। তবে এ ধরনের সময়গত মিল থেকে কিমের অবস্থান বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। নৌযানগুলো ঠিক কোন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে ২০০২ সালেও ওয়ানসানে একই ধরনের একটি বড় নৌযান দেখা গিয়েছিল। সে সময় উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন কিম জং–ইল।

এতে বোঝা যায়, ওয়ানসান উপকূলকে কেন্দ্র করে কিম পরিবারের বিলাসবহুল নৌযান ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। সাবেক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান ২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়া সফরের সময় কিম জং–উনের সঙ্গে ওয়ানসানে সময় কাটানোর কথা জানিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সফরের বড় একটি অংশ তাঁরা সেখানে কাটিয়েছিলেন। ওই সময়ে তাঁরা জেট স্কি চালিয়েছেন এবং ঘোড়ায় চড়েছেন। রডম্যান আরও জানিয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযান ব্যবহার করেছিলেন, যা দেখতে ফেরি ও ডিজনিল্যান্ডের ক্রুজের সংমিশ্রণের মতো ছিল। তবে তাঁর বর্ণিত নৌযানটি বিবিসির সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে শনাক্ত হওয়া ৬০ মিটার দীর্ঘ নৌযানটিই কি না, তা নিশ্চিত নয়।

সাধারণ মানুষের ছুটিও অনেকের কাছে বিলাসিতা
উত্তর কোরিয়ায় অবকাশযাপন ও স্বাধীনভাবে ভ্রমণের সুযোগ সাধারণ মানুষের জন্য সীমিত। দেশত্যাগী কয়েকজন বিবিসিকে জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী শ্রমিক, দপ্তরের কর্মী এবং সমবায় খামারের কৃষকদের বছরে ১৪ দিনের ছুটি পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এই নিয়ম নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হয় না। ছুটি পেলেও এক শহর বা জেলা থেকে অন্য এলাকায় যেতে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। ফলে দেশের ভেতরে অবাধে ভ্রমণ করা অনেকের জন্য কঠিন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে ছুটি কাটানোও অনেকের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থান যে অনেক দুর্বল, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল আনুমানিক ৬৬৭ ডলার, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার ছিল ৩৬ হাজার ২২৭ ডলার। রি জং হোর বক্তব্য অনুযায়ী, কিমকে রাষ্ট্রীয় প্রচারে জনগণের জন্য আত্মত্যাগী নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ সাধারণ মানুষ যখন খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন শাসকের অবকাশকেন্দ্র ঘিরে রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল নৌযান। এই বৈপরীত্যই উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাকাঠামো, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শাসকগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সব মিলিয়ে, ওয়ানসানের উপকূলে চারটি বড় নৌযানের উপস্থিতি কিম জং–উনের ব্যক্তিগত অবকাশযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে এনেছে। তবে নৌযানগুলোর মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না থাকায় স্যাটেলাইটের ছবি, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, জাতিসংঘ

কালের আলো/আরআইকে/এসএ

ছুটির প্রভাবে ঢাকার বাজারে বেচাকেনায় ভাটা, কমেছে মাছ-মাংসের বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৩ অপরাহ্ণ
ছুটির প্রভাবে ঢাকার বাজারে বেচাকেনায় ভাটা, কমেছে মাছ-মাংসের বিক্রি

দুর্গাপূজার টানা ছুটির প্রভাব পড়েছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে। ক্রেতা ও বিক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় মাছ-মাংসের বেচাকেনাও আগের তুলনায় কমেছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। তবে ক্রেতার উপস্থিতি কমলেও মাংসের দামে তেমন স্বস্তি নেই। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মিরপুরের ২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকার বাজার এবং মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনা তুলনামূলক কম দেখা গেছে। ফার্মগেট ও সেগুনবাগিচার সিটি করপোরেশন বাজারেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।

মিরপুর ২ নম্বর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মাংসের আটটি দোকানের মধ্যে তিনটি বন্ধ রয়েছে। খোলা দোকানগুলোতেও বিক্রি তুলনামূলক কম। একটি দোকানে হোটেলে জবাই করা গরুর মাথা, পা ও কম দামের বিভিন্ন অংশ বিক্রি করতে দেখা যায়। বন্ধ থাকা একটি মাংসের দোকানের বিক্রেতা মো. জসিম বলেন, এবার দুর্গাপূজার ছুটি ঈদের ছুটির মতো দীর্ঘ হয়েছে। গতকাল থেকেই বাজারে মানুষের আনাগোনা কমেছে। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে—এমন ধারণা থেকে অনেক বিক্রেতা গরু জবাই করেননি। জসিমের ভাষ্য, গরুর দামও বেশি। সব মিলিয়ে গরুর মাংসের দাম বেশি পড়ছে। অন্য সময়ে কিছুটা কম দামে মাংস বিক্রি করা গেলেও বর্তমানে প্রতি কেজি ৮০০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর বাজারগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দামে। দেশি কৈ মাছ প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, বড় বোয়াল ৮০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ১ হাজার ২০০ টাকা, ভেনামি চিংড়ি ৮০০ টাকা এবং রূপচাঁদা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশি ছোট চিংড়ি প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, শরপুঁটি ২৫০ টাকা, ট্যাংরা ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা, মাঝারি বাইম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় বাইম ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য মাছের মধ্যে বাটা প্রতি কেজি ২৮০ টাকা, ছোট সিলভার কার্প ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বড় সিলভার কার্প ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাজলি মাছের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা, শোল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, গুঁড়া মাছ ৬০০ টাকা, কাচকি ৫৫০ টাকা এবং পাবদা ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা।

ওজনভেদে রুই মাছের দামেও পার্থক্য রয়েছে। এক কেজির কম ওজনের রুই প্রতি কেজি ২৯০ টাকা এবং দুই কেজি পর্যন্ত ওজনের রুই ৩৮০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রায় একই দামে বিক্রি হচ্ছে কাতল মাছ। অন্যদিকে, এক কেজি ওজনের আইড় মাছের দাম ৬০০ টাকা। মাছটির ওজন বেশি হলে দাম বেড়ে ৭০০ টাকা পর্যন্ত হচ্ছে।

মিরপুর বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. সজল বলেন, গত শুক্রবারের তুলনায় এবার বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা—দুজনের সংখ্যাই কম। টানা ছুটির কারণে চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অনেক মাছ ব্যবসায়ীও বাড়ি গেছেন কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এতে বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে। অন্যদিকে ক্রেতার উপস্থিতিও কম থাকায় সামগ্রিকভাবে বেচাকেনা কম হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যাঁরা কেনাকাটা করতে আসছেন, তাঁদের অনেকেই দ্রুত প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে চলে যাচ্ছেন। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাজারে মানুষের ভিড় কম।

মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী আলী আসগর বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সাধারণত বাজারে ক্রেতার ভিড় বেশি থাকে। এ সময় মাছও তুলনামূলক তাজা পাওয়া যায়। তবে মঙ্গলবার বাজারে ক্রেতার ভিড় কম ছিল, মাছ বিক্রেতার সংখ্যাও ছিল কম। সব মিলিয়ে দুর্গাপূজার ছুটিতে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়ায় মাছ-মাংসের বেচাকেনায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে বাজারে ক্রেতা কম থাকলেও গরু ও খাসির মাংসের দাম এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উচ্চমূল্য ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি