খুঁজুন
                               
, ,
           

পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

এ এইচ এম ফারুক:
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

বাংলাদেশ একটি একক, অবিভাজ্য ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র। কিন্তু দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বজায় রাখার অপচেষ্টা চলছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল স্বায়ত্তশাসন দাবি। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির জন্য উপজাতিয় নেতৃবৃন্দের দাবি দাওয়া নিয়ে জিয়াউর রহমান সরকার আলোচনা শুরু করেন। এরপর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার ৯ বছরে ৬ বার, বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ এর সরকার ৫ বছরে ১৩ বার এবং ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার গঠিত হলে জাতীয় কমিটির সাথে ৭ বার আলোচনা করে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততায় চুক্তিটি স্বাক্ষর করে সম্পাদিত করেছে।

কিন্তু এরপর আবার ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সনদ (ইউএনডিআরআইপি) ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় নতুন তৎপরতা। এখন তা গড়িয়েছে ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ শব্দগত ও পরিচয়গত টানাপোড়েন।

অথচ ১৯৯৭ সালের চুক্তির পক্ষ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও তার শীর্ষ নেতা সন্তু লারমা স্বজ্ঞানে ও আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের ‘উপজাতি’ পরিচয়েই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তবে চুক্তির দীর্ঘ এক দশক পর ২০০৭ সালেরপর কেনো নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ও দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠা করার এক মরিয়া প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—১৯৯৬-৯৭ সালে যে গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করল, এখন তারা হঠাৎ ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবীতে সোচ্চার কেন? এর পেছনে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক রহস্যটাই বা কী?

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল পাঠ পরীক্ষা করলে দেখা যায়, চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ১ নং ধারায় পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ‘খ’ খণ্ডের ১ নং ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে ‘উপজাতি’ শব্দটি বহাল থাকবে। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ বা ‘উপজাতীয়’ শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সন্তু লারমা ও তাঁর প্রতিনিধিরা এই প্রতিটি ধারায় স্বাক্ষর করেছেন। পরবর্তীতে এই চুক্তির আলোকেই গঠিত হয় তিনটি পার্বত্য জেলায় পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮ এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন-২০০১ (সংশোধিত ২০১৬)। এসব আইনের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি’ শব্দটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি ও তার সংগঠন রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় সংলাপে নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনি পরিচয় ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নেন এবং তার ভিত্তিতে বিগত প্রায় ৩ দশক (মানে প্রায় ২৯ বছর) ধরে রাষ্ট্রের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেন, সেখানে আজ তারাই আবার একই কণ্ঠে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করা চরম এক স্ববিরোধিতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ও জনমিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, অঞ্চলটিতে বর্তমানে বসবাসরত মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি নাগরিকই বাঙালি (৫১%)। অবাঙ্গালি বা উপজাতি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমন্বিত হার প্রায় ৪৯%। এর মধ্যে প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা যা প্রায় ২৫% এর মত। আর বাকি ২৪ শতাংশ মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো। অথচ, চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তা কেবল জনসংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, বরং মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সমতার বিচারেও প্রচণ্ড বৈষম্যমূলক।

বাঙালিরা ৫১ শতাংশ হলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে নেতৃত্বে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) রাখা হয়েছে। আর বাকি ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে রাখা হয়েছে ৬৭ শতাংশ। কিন্তু সেটাও লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। যেমন গত বৈষম্যবিরোধী সরকারের সময় পার্বত্য জেলা পরিষদে ১৫ সদস্যের পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে ১৫ সদস্যের জেলা পরিষদে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) অ-উপজাতীয় বাঙালির সদস্য সংখ্যা গড়ে মাত্র চারজন (২৬ শতাংশ), যেখানে অবাঙ্গালি উপজাতিদের প্রতিনিধিত্ব ১১ জন (৭৪ শতাংশ)। চাকরির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উদাহরণস্বরূপ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে সিএইচটি-ইউএনডিপির যৌথ প্রকল্পে গত ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৯ জনের নিয়োগে মাত্র ২ জন (১০ শতাংশেরও কম) বাঙালি নিয়োগ পান, আর অবশিষ্ট ১৭ জনই (৯০ শতাংশের বেশি) অবাঙ্গালি উপজাতীয় সম্প্রদায় থেকে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, যেখানে সমতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ের অর্ধেকেরও বেশি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।

‘আদিবাসী’ দাবির পেছনের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ (আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এবং ইউএনডিআরআইপি) অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ বা ‘ইনডিজেনাস’ শব্দের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও অধিকারের রূপরেখা রয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠী যদি ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পায়, তবে সেই ভূখণ্ডের ওপর তাদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ (সেলফ-ডিটারমিনেশন), নিজস্ব ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে সেখানে মূল রাষ্ট্র বা দেশের অন্যান্য নাগরিকদের অধিকার খর্ব হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা তৈরি হয়।

নৃবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো (যেমন: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার (আরাকান), ভারত বা ত্রিপুরা থেকে অভিবাসিত হয়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র বা প্রকৃত আদিবাসী বাঙালিরা। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কখনোই ‘আদিবাসী’ নয়, বরং তারা ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’।

১৯৯৭ সালে যখন তারা চুক্তি করেছিলেন, তখন উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে একটি বিশেষ প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করা। পরবর্তীতে যখন তারা দেখলেন যে রাষ্ট্র সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬(২) ও ২৩(ক)-তে দেশের সকল নাগরিককে ‘বাঙালি’ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়কে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করল, তখন তারা কৌশল পরিবর্তন করেন। এখন ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের অশুভ এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, আলাদা মানচিত্র, নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রার মতো বিষয়গুলোর প্রকাশ ঘটিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের অন্তর্দাহ প্রকাশ করেছে।

উচ্চ আদালতের রায় ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও চুক্তির বেশ কয়েকটি সাংবিধানিক অসংগতি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে রিট (মামলা নম্বর ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭) করা হয়েছিল। ২০১০ সালের ১২ ও ১৩ এপ্রিল তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে স্পষ্ট বলা হয়, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইনের অনুচ্ছেদ ৪০ ও ৪১ রাষ্ট্রের একক সত্তাকে খর্ব করে এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১-এ রক্ষিত রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, জেলা পরিষদ আইনের ৬ নম্বর ধারায় কোনো ব্যক্তি ‘উপজাতীয়’ বা ‘অ-উপজাতীয়’ কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সার্কেল চিফ ও হেডম্যানদের হাতে দেওয়া নিশ্চিতভাবে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১-এর লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে একজন বাঙালি নাগরিককে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও জমির মালিকানা থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করা হয়। বর্তমানে এ মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সন্তু লারমাসহ জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা, সকল অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরকারের কাছে সমর্পণ করা এবং তালিকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত প্রায় আড়াই দশকে তারা পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ তো করেইনি, বরং পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে। একটি জেএসএস থেকে এখন ৪টি গ্রুপসহ মোট ৭টি সশস্ত্র সংগঠন পাহাড় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা, বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সভাপতির পদসহ সকল সুবিধা উপজাতি হিসেবে গ্রহণ করার পর, এখন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে ‘আদিবাসী’ পরিচয় দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ে বসবাসকারী ৫১ শতাংশ অ-উপজাতি তথা পার্বত্য বাঙালিকে অধিকারহারা রেখে কোনো টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ বিতর্ক বন্ধ করে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে পাহাড়ের প্রতিটি নাগরিকের—তা সে বাঙালি হোক বা অবাঙ্গালি—সমান অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। নচেৎ, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে চক্রান্ত চলছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

পুলিশকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করার চেষ্টা রুখতে জনসম্পৃক্ততার ডাক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

বিশেষ সংবাদদাতা ও ময়মনসিংহ প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৯ অপরাহ্ণ
পুলিশকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করার চেষ্টা  রুখতে জনসম্পৃক্ততার ডাক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে একটি চক্র নানা ধরনের বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে এককভাবে নির্ভর না করে জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিষয়ে গোপনে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

  • জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় কমিটি গঠনের তাগিদ
  • অপরাধীদের গোপন তথ্য দিতে আহ্বান
  • মাদকবিরোধী অভিযানে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সীমিত পুলিশ, বাড়াতে হবে জনসম্পৃক্ততা
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, একটি থানায় কর্মরত সীমিতসংখ্যক পুলিশ সদস্য দিয়ে এককভাবে পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অপরাধের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ-জনগণের সমন্বয় কমিটি গঠনের ওপর জোর দেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশের ওপর রেখে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তা জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর হলে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতাও বাড়তে পারে—এমন একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরেন তিনি।

‘বিতর্ক সৃষ্টি করে পুলিশকে দুর্বল করার চেষ্টা’
পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে একটি চক্র নানা ধরনের বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তথ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, অপরাধীদের শনাক্ত করতে জনগণকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য গোপনে পুলিশকে দিতে হবে।

একই সঙ্গে একটি নিষিদ্ধ দলের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও তৎপর থাকার আহ্বান জানান তিনি। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে যেন নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী।

মিথ্যা মামলা নয়, আইনের প্রয়োগে সতর্কতা
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, কোনো অবস্থাতেই মিথ্যা মামলা নেওয়া যাবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, সংবাদকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, মিথ্যা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে এলাকায় যাতে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একদিকে পুলিশের সক্রিয়তা, অন্যদিকে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশন—দুই দিকের ভারসাম্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মাদকবিরোধী অভিযানে তালিকা ধরে অভিযান
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে মাদক কারবারিদের তালিকা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকেও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর বক্তব্যে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য, জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং নাগরিক সহযোগিতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। মাদক কারবারিদের শনাক্তকরণ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবাশীষ কর্মকার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এবং নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারুল ইসলাম। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে নান্দাইল উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এর আগে পাঁচ দিনের সফরে মঙ্গলবার দুপুরে ময়মনসিংহের নান্দাইলে পৌঁছান ইয়াসের খান চৌধুরী। সফরের অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জ ও জামালপুরের একাধিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএএএমকে

সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পর ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হোয়াইট হাউসের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৬ অপরাহ্ণ
সংবাদমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার পর ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হোয়াইট হাউসের

দ্য এসেনশিয়ালস স্টেশন’ নামে একটি নতুন ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সম্প্রচার চ্যানেল চালু করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চ্যানেলটির সম্প্রচার শুরু হয়। হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রশাসনের ঘোষণা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও বিভিন্ন পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।

চ্যানেলটি চালুর সময়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ এর কয়েক দিন আগে CNN, পলিটিকো ও MS NOW-এর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর কাভারেজ নিয়ে আপত্তি প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’ প্রচারের অভিযোগ করেন।

সরাসরি প্রশাসনের ভিডিও

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প টিভিতে প্রশাসনের ভিডিও, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও বিভিন্ন ঘোষণা সম্প্রচার করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের অতীতের নির্বাচিত ভিডিও এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফুটেজও এতে দেখানো হচ্ছে।

সরকার ও প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সরাসরি বক্তব্য প্রচারের নজির অবশ্য নতুন নয়। তবে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের চলমান বিরোধের মধ্যে নতুন চ্যানেলটি চালু হওয়ায় বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

তিন সংবাদমাধ্যমের মামলা

হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরে পেতে CNN, পলিটিকো ও MS NOW ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি অভিযোগ করেছে, তাদের সংবাদ কাভারেজের কারণে প্রবেশাধিকার বাতিল করা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মামলায় তারা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার একটি বিশেষ সুবিধা এবং প্রেসিডেন্টের কাভারেজ নিয়ে প্রশাসনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

টেলিভিশন পুলে সংকট

হোয়াইট হাউসে সব টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা একসঙ্গে প্রবেশ করতে না পারায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান সম্প্রচারমাধ্যমগুলো একটি টিভি পুলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান কাভার করে আসছে। CNN, ABC, CBS, NBC ও Fox News এই ব্যবস্থার অংশ।

CNN-কে পুল থেকে বাদ দেওয়ার পর অন্য বড় সম্প্রচারমাধ্যমগুলোও প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত পুল কাভারেজ স্থগিত করে। ফলে ট্রাম্পের কয়েকটি অনুষ্ঠানের ভিডিও কাভারেজে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়।

স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প কি?

ট্রাম্প টিভিতে প্রচারিত ভিডিও ও তথ্য প্রশাসন নিজেই তৈরি, বাছাই ও প্রচার করবে। ফলে এটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মতো বাইরের সাংবাদিকদের অনুসন্ধান, প্রশ্ন, যাচাই বা সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি সংবাদপ্ল্যাটফর্ম নয়।

সমর্থকেরা বলছেন, এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের মধ্যস্থতা ছাড়াই প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম ও প্রেস-স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, সরকারি যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভূমিকা আলাদা।

এদিকে CNN, পলিটিকো ও MS NOW-এর করা মামলার মাধ্যমে বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন।

কালের আলো/এসএ

ফায়ার সার্ভিসের নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
ফায়ার সার্ভিসের নতুন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহেদ কামালকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে।

এর ফলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ। নতুন মহাপরিচালক হিসেবে তিনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন।

কালের আলো/এমএসআইপি