প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য অনিরাপত্তা, জ্বালানি সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একই সময়ে একাধিক ধাক্কার মুখোমুখি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত কর্মসংস্থান। ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক—দুই ধরনের চাপই ক্রমে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়ন বলছে, এসব ঝুঁকি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি সংকট আরেকটিকে আরও গভীর করে তুলছে। জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়লে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের ওপর তার প্রভাব পড়ছে।
দুর্বল অর্থনীতির ওপর নতুন ধাক্কা
২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ০.৮ শতাংশ এবং সরকারি কোষাগারের ঘাটতি ৪.৪ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হয়েছে। রাজস্ব পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৫ অর্থবছরে গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। অন্যদিকে টানা তিন বছর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমছে না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ব্যাংকিং খাত নিয়ে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নির্ধারিত সর্বনিম্ন ১০ শতাংশের অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। ফলে অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের বহুমুখী প্রভাব
বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির বড় অংশই আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই নির্ভরতার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিতেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। খোলা বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪-২৮ ডলারে পৌঁছেছে—আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এর ফলে ২০২৬ অর্থবছরে জ্বালানি ভর্তুকির সম্ভাব্য বোঝা ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি এবং সামাজিক খাতের ব্যয়েও চাপ তৈরি হবে। বিশ্বব্যাংকের এই হিসাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জ্বালানি সংকটকে আর একক কোনো খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতি ও জনজীবনের একাধিক স্তরে একযোগে প্রভাব ফেলছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাও জ্বালানি ও আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সার ও জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, কৃষি উপকরণের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। দেশে হেক্টরপ্রতি সারের ব্যবহার ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। গ্যাস সংকটের কারণে ছয়টি ইউরিয়া কারখানার পাঁচটিই উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বাজারে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষকের ওপর চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি খাদ্যপণ্যের দামও নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
স্বাস্থ্য খাতেও জ্বালানি সংকটের ছায়া
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবায়ও। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনাগত চাপে রয়েছে। সরকারি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর বিদ্যুৎ বিলেই প্রতি মাসে প্রায় ০.৬ থেকে ১.১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিনির্ভর চিকিৎসা উপকরণের উচ্চ ব্যয়। হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত সামগ্রীর ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর এবং সেগুলোর ওপর ৩৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। এই চাপের মধ্যেই ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এতে ৪০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান—শেষ আঘাতটি এখানে
অর্থনীতির বহুমুখী ঝুঁকির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে। সীমিত কর্মসংস্থান ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৫ সালে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও অন্যান্য বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে ২০২৬ সালে প্রত্যাশিত ১৭ লাখের পরিবর্তে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে প্রায় ছয় লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দিয়ে এই ঝুঁকি ব্যাখ্যা করা যায় না। বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটাতে না পারলে পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে।
এক সংকটের সঙ্গে আরেক সংকটের যোগ
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের মূল বার্তাটি এখানেই—বাংলাদেশের ঝুঁকিগুলো আলাদা আলাদা নয়। জলবায়ু দুর্যোগ খাদ্য উৎপাদনে আঘাত করে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম মূল্যস্ফীতি বাড়ায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমায়, দুর্বল ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে এবং কম বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সংকটকে আরও গভীর করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনো একটি খাতের সংকট মোকাবিলা নয়; বরং পরস্পরকে শক্তিশালী করা এই ঝুঁকিগুলোর চক্র ভাঙা। জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে বহুমুখী চাপ একসময় সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা তাই কেবল ভবিষ্যৎ ঝুঁকির পূর্বাভাস নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান দুর্বলতাগুলোকে দ্রুত মোকাবিলার একটি জরুরি সংকেত।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array