কয়েক বছর আগেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত ছিল শ্রীলঙ্কা। জ্বালানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একপর্যায়ে ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয় দেশটি।
সেই সংকট কাটিয়ে এখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটি। আর এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বামপন্থি নেতা ও প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকে।
দেউলিয়াত্বের পথে যেভাবে গিয়েছিল দেশটি
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ, ২০১৯ সালের বড় ধরনের করছাড় এবং করোনা মহামারির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে মহামারির ধাক্কায় বৈদেশিক মুদ্রা আয় ব্যাপকভাবে কমে যায়।
এর মধ্যে কৃষিতে হঠাৎ রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে গেলে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ আমদানিতে দেখা দেয় তীব্র সংকট।
মূল্যস্ফীতি একপর্যায়ে ৭০ শতাংশের ওপরে উঠে যায়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং জ্বালানির জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো মানুষের দুর্ভোগ দেশটির অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
গণআন্দোলনে বদলে যায় রাজনীতি
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক গণআন্দোলন, যা ‘আরাগলায়া’ নামে পরিচিত। বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এরপর রনিল বিক্রমাসিংহে দায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন। তবে কর বৃদ্ধি ও ব্যয় সংকোচনের মতো কঠোর পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)।
ক্ষমতায় এসে বাস্তববাদী অর্থনীতি
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পান এনপিপির নেতা অনুরা কুমারা দিশানায়েকে। পরে তার জোট পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করে।
বামপন্থি ও মার্কসবাদী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শুরুতে তার সরকার নিয়ে বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে দিশানায়েকে আইএমএফের কর্মসূচি বাতিল না করে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। পাশাপাশি নিজের সরকারের সংস্কার কর্মসূচিও বাস্তবায়ন শুরু করেন।
কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার এবং দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে কিছু করছাড়ও দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিতে ফিরছে স্বস্তি
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে এখন বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের মার্চের শেষে দেশটির সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
রাজস্ব আদায়েও রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কা ২ হাজার ৫৫৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন রুপি রাজস্ব সংগ্রহ করে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি
অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হলেও শ্রীলঙ্কার সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব বাড়ানো ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কারণে জনগণের ওপর কর এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ রয়েছে। দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যের সমস্যাও পুরোপুরি দূর হয়নি।
এ ছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানির দাম, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পর্যটন খাতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব দেশটির অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
তবু কয়েক বছর আগের দেউলিয়া অবস্থা থেকে বর্তমান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড এবং ঋণ পুনর্গঠনের অগ্রগতি দেখাচ্ছে—শ্রীলঙ্কা ধীরে ধীরে সংকটের গভীর খাদ থেকে বেরিয়ে আসছে।
বামপন্থি রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও দিশানায়েকে যে বাস্তববাদী অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করছেন, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহের বিষয়। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক আদর্শের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সংস্কারও একটি সংকটাপন্ন দেশকে পুনরুদ্ধারের পথে নিতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array