দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ একসময় বিশ্বের অন্যতম বড় আফিম উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অবৈধ আফিম উৎপাদন হতো এই অঞ্চলে। তবে সরকারি দমন অভিযানসহ নানা কারণে পরবর্তী সময়ে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আবারও বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে নতুন করে বাড়ছে পপি চাষ ও আফিম উৎপাদন। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) বলছে, বর্তমানে মিয়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিচিত অবৈধ আফিমের উৎস।
দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শান রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি পপি চাষ হচ্ছে। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মিয়ানমারে পপি চাষের জমির পরিমাণ ১৭ শতাংশ বেড়ে এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আফগানিস্তানে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
মিয়ানমারে আফিমের উৎপাদন বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের আরেক বড় আফিম উৎপাদক আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর পপি চাষ নিষিদ্ধ করে।
এর ফলে বৈশ্বিক আফিম সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের কৃষকেরা এখন পপি চাষ করে আগের তুলনায় বেশি দাম পাচ্ছেন। ইউএনওডিসির কর্মকর্তাদের মতে, এর সঙ্গে দেশটির ব্যাপক দারিদ্র্যের সম্পর্কও রয়েছে।
গৃহযুদ্ধে আরও জটিল মিয়ানমার
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে শুরু হওয়া সংঘাত আফিম চাষের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকের কাছে পপি চাষ তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে। অন্য ফসলের তুলনায় আফিম থেকে বেশি আয় হওয়ায় দারিদ্র্যপীড়িত কৃষকদের একটি অংশ আবারও এই চাষে ফিরছেন।
ভারতের সীমান্তেও বাড়ছে উদ্বেগ
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের চিন রাজ্যেও পপি চাষ বাড়ছে। এই রাজ্যের সীমান্ত রয়েছে ভারতের মণিপুর ও মিজোরামের সঙ্গে। ফলে মিয়ানমারে আফিম উৎপাদন বৃদ্ধির প্রভাব প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতের সাবেক মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং একসময় পরিস্থিতিকে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের ভারতের দিকে সরে আসা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
থাইল্যান্ডেও বাড়ছে মাদক পাচার
মিয়ানমারে আফিম উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন থাইল্যান্ডও। মাদক পাচারকারীরা দেশটির তুলনামূলক উন্নত সড়কব্যবস্থা ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করছে বলে জানা গেছে।
সীমান্তবর্তী কয়েকটি থাই শহরে গত পাঁচ বছরে মাদক ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আফিমের সরবরাহ বাড়াও এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত আগস্টে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাংককে বৈঠক করেন। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের নেতাদের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। বৈঠকে মাদক সমস্যা মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিকল্প ফসলের দিকে কৃষকদের ফেরানোর চেষ্টা
মিয়ানমারে পপি চাষ কমাতে বিকল্প অর্থকরী ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। থাই বিশেষজ্ঞরা ইউএনওডিসির সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছেন।
শান রাজ্যের রাজধানী তাউংগির আশপাশের এলাকায় কৃষকদের কফিসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসল চাষে সহায়তা করছে ইউএনওডিসি। তবে বড় পরিসরে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জান্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
মিয়ানমারের জান্তা সরকার আফিম ব্যবসা দমনে কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আফিম ব্যবসা থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সীমান্তবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ জান্তা সরকার ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভক্ত। কোনো কোনো গোষ্ঠী জান্তার মিত্র, আবার অনেকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ফলে পপি চাষ বন্ধে কার্যকর অভিযান চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দারিদ্র্যই বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা বা অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে আফিম চাষ বন্ধ করা কঠিন। কারণ দারিদ্র্যপীড়িত কৃষকদের কাছে এটি তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস।
থাইল্যান্ডে পপি চাষ বন্ধ করতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল। তবে সে সময় দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছিল। মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন—একদিকে গৃহযুদ্ধ, অন্যদিকে ব্যাপক দারিদ্র্য ও দুর্বল অর্থনীতি।
ফলে একসময় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এর আফিম অর্থনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এর প্রভাব শুধু মিয়ানমারেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক মাদকবাজারেও পড়তে পারে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array