যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানে ধাপে ধাপে একটি সমঝোতার পথ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার সুযোগ দেবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই দেশের আলোচকেরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানি, আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে হরমুজ প্রণালি এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা।
একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, অচলাবস্থা কাটানোর সম্ভাব্য পথ হতে পারে ধাপে ধাপে একটি ব্যবস্থা নেওয়া। এর প্রথম ধাপে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে। এর পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
তবে আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হলো—দুই পক্ষই আগে নিজেদের হাতে থাকা চাপ প্রয়োগের উপায় ছেড়ে দিতে চাইছে না। ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ, আর তেহরানের হাতে রয়েছে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব। ফলে দৃশ্যমান বিনিময় ছাড়া কোনো পক্ষই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দুর্বল করতে আগ্রহী নয়।
এর আগে জুনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও জুলাইয়ে তা ভেঙে যায়। ফলে এবার শুধু একটি চুক্তির কাঠামো তৈরি করাই নয়, দুই পক্ষের দেওয়া ছাড়গুলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মার্কিন আলোচক ডেনিস রস নির্বাচনের আগে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাকে সীমিত বলে মনে করছেন। তার মতে, নির্বাচনের আগে দুই পক্ষেরই সমঝোতায় পৌঁছানোর কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।
হরমুজ ইস্যুতে ইরান কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রগুলোর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের ট্রানজিট ফি আদায়ের দাবি মূল চুক্তির বাইরে আলাদা সংযুক্তিতে রাখার বিষয়ে তেহরান নমনীয় হতে পারে। কারণ এই মুহূর্তে অবরোধ প্রত্যাহার করানোই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রানজিট ফি দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর অর্থ অবশ্য হরমুজের ওপর নিজেদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে ইরান সরে যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, তেহরান প্রণালিটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। ফলে অর্থ বা ট্রানজিট ফি নিয়ে আপসের সুযোগ থাকলেও হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
এদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। সম্প্রতি ইরানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা। ট্রাম্পও সতর্ক করেছেন, চুক্তি না হলে ইরানের অর্থনীতি আরও সংকটে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ইরান আলোচনার পাশাপাশি নতুন করে সংঘাতের প্রস্তুতিও রাখছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক শক্তির হুমকি ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করছে। তার মতে, কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা কম হলেও তেহরান আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করছে না।
হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে উপসাগরীয় নেতারা হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেও জোর দিচ্ছেন।
আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতবি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তার মতে, ইরান হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের পরবর্তী পরিকল্পনা এখনো পরিষ্কার নয়।
এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরান মার্কিন সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেওয়া হলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদলকে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এদিকে হরমুজ নিয়ে আলোচনার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও। প্রণালিটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে খবর প্রকাশের পর তেলের বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল, যদিও ওই দিনের বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতও প্রভাব ফেলেছে।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের আলোচনায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—হরমুজ দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রত্যাহারকে কীভাবে একই সমঝোতার কাঠামোয় আনা যায়। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়ে গেছে এবং আলোচনার ফলাফল নির্ভর করছে উভয় পক্ষ কতটা বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array